Friday, November 6, 2015

আম

- তোর পকেটে কি?
- পকেটে? আ-আমার?
- অ্যাই শুয়ার! দাঁড়া! দাঁড়া! পকেটে হাত দিবিনা...! দাঁড়া বলছি!
এক পা, এক পা করে পিছু যেতে যেতে ওসমান কুড়ি গজ যাওয়ার পর উলটোদিকে ঘুরে কাসুন্দিয়া রেললাইনের দিকে যেই স্পীডে দৌড় টা লাগাল, মন্ত্রিয়েল  অলিম্পিকের ধরতা-কর্তারা কাছে থাকলে মহাভারতের ভীষ্মের মত ফোঁস করে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন। ছিয়াত্তরের আগুণ বাজারে কলাটা-মুলোটা কিনতে গিয়ে হেগে-মুতে বড়া ভেজে ফ্যালা সাধারণ মানুষ হাঁ' করে দেখছিল কিরকম ভাবে একটা হাঁটুর বয়েশি বোমাবাজের ভয়ে নব-পাঁজার সাঙ্গোপাঙ্গরা প্রাণের ভয়ে পালাচ্ছে। আর ওদিকে চৌরাস্তার অপারে ঘোড়া-মিত্তির সাদা পাঞ্জাবীর পকেটে রিভলবার সমেত হতবাক হয়ে ভাবছে এই দুঃসাহসী খুদে গুন্ডাটাকে চিনের দালাল রা কোত্থেকে আমদানি করেছে। কাসুন্দিয়ার শ্রেষ্ঠ বখাটে আর গুন্ডাদের রীতিমতন কমিটি বসিয়ে রিক্রুট করেছেন তিনি, এই বয়েসে আর এইসব ভাল্লাগেনা, ইসোফেগাস দিয়ে অম্লস্রোতের ধারার চোটে সম্বিত ফিরতে তিনি দেখলেন বন্ধের দিনের র‍্যাম্পাট ঝারপিঠ টা আজকের মত ডিসমিস।        
আমার বাবার বড়োজেঠু  ছিলেন কাসুন্দিয়ার পোস্টমাস্টার, কর্নেল মেজাজের লোক। গর্জন করে বললেন, 'চাক্কা-বন্ধের দিন আবার ইশকুল কিসের?!'
তখন বিবেকানন্দ স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন বামনদেববাবু, যার ব্যাকরণ নব্য-আঁতেলরা পড়েননি বলে আজ এই অবস্থা।
মেজকা অম্লানবদনে বলল, 'স্যার বলেছে ছাত্রদের একটা নির্দিষ্ট বয়েস অব্দি অ্যাপলিটিকাল থাকা উচিত।'
-ওরে শালা শুয়ারের বাচ্চা, চ্যাটাং চ্যাটাং কথা!'
 বামনদেববাবু হয়ত সত্যিই বলেছিলেন, কিন্তু মেজকার ধান্দা ছিল খোয়ার মাঠে গিয়ে সারাদিন বল পেটাবার। ক্লাস এলেভেনে মোহনবাগানের ট্রায়াল দিয়েছিলেন, কিন্তু মাঝবয়েসে গিয়ে অ্যালকোহলিক হয়ে যান। মেজকার এক হাড়ে হারামজাদা বন্ধু ছিল সতে বলে, সে আমার বাবা এবং দুই কাকা, ঐ  জেনারেশানটার  সবাইকে বিড়ি ধরিয়েছিল। সতে এসেছিল বাড়িতে মেজকার সাথে ইস্কুল যাবে বলে, ঠাকুরমা দুইজনের হাতে দুটি পরিপুষ্ট আম দিয়ে বললেন, পকেটে নিয়ে যা।
গল্পের শুরু এখানেই, নস্করপাড়ার মোড়ে আসতেই মেজকা দেখল রাস্তার দুদিক থেকে প্রাচীন, ঘাঘু কংগ্রেসী ঘোড়া-মিত্তির গুন্ডা নিয়ে দোকান খোলাতে এলাকায় ঢুকছে, আর সিপিএমের ইয়ং ব্লাড নব-পাঁজা টেরিটরি আগলে বাচ্চাদের চিৎকার করে বলছে, 'ভয় পাবেন না কমরেড, বিপ্লবের পথে এরকম কাঁটাকে উপড়ে ফেলতে হয়...', এই প্যান্ডিমনিয়ামের মাঝে ওসমান পাঁঠা কাটার দোকানের সামনে মেজকার আর সতের মুখোমুখি হয়ে পড়ে, ফোলা পকেট দেখে হঠাৎ তার মনের প্যারানইয়া সে মিষ্টি গ্রীষ্মের বাতাসে দাবানলের মত ছড়িয়ে দেয়, ঘন্টাখানেকের মধ্যে পাড়ায় পাড়ায় রটে যায় অশান্ত সময়ের রবিন হুড কুণ্ডু-বাড়ির মেজছেলে।
দাদু পুরো ব্যাপারটা শুনে নব কে ডেকে পাঠালেন।
- নব, আমাদের বাড়ি মানে কি?
-কি দাদা? নব কাঁচুমাচু।
-আমাদের বাড়ি মানে ২৪ টা সিপিএমের ভোট।
-হ্যাঁ স্যার।
-গতমাসের ব্রিগেডে এবাড়ি থেকে কটা রুটি গেছিলো?
-২০০ টা স্যার।
-আমার মেজছেলেকে নিয়ে তোমরা এলাকা-এলাকা খেলছ, রাস্কেল?
দাদু হুঙ্কার দিয়ে বললেন।

আমার এখনও মনে পড়ে স্বাধীনতা দিবসের দিন নব দা পার্টি অফিসের সামনে বসে জিলিপি বিতরণ করছে, আমাকে দেখে, ডেকে বললে আর দুটো খেয়ে যা, সত্যনারায়ণের মাল, একদম টাটকা। ল্যাম্প পোস্টের গায়ে বাঁধা চোঙ্গা তখন গাইছে, 'শিল্পী সংগ্রামী পল  রবসন...'। 

Saturday, August 22, 2015

একানড়ে

পাঁচিলের দেড় ফুটের ছোট্ট গর্ত টার পাশে একটা ঘাট ছিল। যুগ যুগান্তর আগেরকার। বহু দশক হল আসেপাসের মানুষও ঘাট টার অস্তিত্ব ভুলেছে। ঘাটের পাকাই ভেঙ্গে জংলি গুল্মের বাড়বাড়ন্ত, ধুলো আর শ্যাওলায়ে সিঁড়িগুলো  রোমান রুইন্সের চেহারা নিয়েছে।
আজকে দুপুরে উদাত্ত্ব যেই জন্যে হেডস্যারের ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে সেট হল সে বাংলা ক্লাস কাটিয়ে ঘাটের উপর বসেছিল। স্কুলের পুরনো টিচার, মালী, গেটকীপার ছাড়া আর যারা ওই ঘাট টাকে চিনত তারা হল ১৯৯৩ ব্যাচের ছাত্র রা। ওদের সময়েই পাঁচিলে গর্ত টা করা হয় যাতে টুয়েলভের রা বাইরে বেরিয়ে স্কুলের পাঁচিল আর গঙ্গার মাঝে যে এক চিলতে ঘেসো জমি আর ঘাট আছে ওটার অপর দাঁড়িয়ে সিগারেট খেতে পারে।
উদাত্ত একদিন পাঁচিলের পাশের ঝোপ টা রেল-গানের মত বেঁটে ভাঙ্গা ডাল খুঁজছিল,কাঁটা ঝোপের মধ্যে থেকে হঠাৎ পাতা নড়ার শব্দ শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে একটা বিরাট গোসাপ। কিন্তু ভয়ে হাঁটু কাঁপার আগেই গোসাপ টা নিজেই দুদ্দাড় করে কাঁটা ঝোপের মধ্যে হারিয়ে গেল। উদাত্ত্ব এক মুহূর্তের জন্যে মনে হয়েছিল যে এটাকে পাথরের গারিতে জুতে নস্কর পাড়া থেকে স্কুলে আসবে, তাই সে শেষ চেষ্টা করতে গোসাপটার পালিয়ে যাওয়া রাস্তা ধরে ছুটে এক মিনিট যেতেই পাঁচিলের গর্ত টা ওর চোখে পড়ে।
তারপর থেকে বহুবারএ  ঘাটে এসেছে উদাত্ত্ব গোসাপ টাকে আর দেখতে পায়নি।
হেডস্যারের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে উদাত্ত ভাবছিল যে বাবা জেনে গেলে খুব মারবে, বা হয়ত নাও করতে পারে। বাবা কে খুব একটা ভাল বোঝে না ও। কিন্তু মা কান্নাকাটি করবেই।
পর্দার অপার থেকে তখনই হেডস্যার ঠাণ্ডা গলায় ডাকলেন, "উদাত্ত্ব, ভেতরে এস।"
হেডস্যারের বয়েস প্রায় চল্লিশ, উদাত্ত্ব কানাঘুষো শুনেছে তিনি নাকি বড়ো সরকারি চাকরি ছেড়ে কোন সিপিএমের লিডারকে ধরে ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাওড়ার এই মফঃস্বল শেষের স্কুলে চাকরি নিয়েছেন। এখানে তাঁর কোনও দূরসম্পর্কের আত্মীয় থাকে, তাদের বাড়িতেই উঠেছেন। দানেশ সেখ লেনের পেছনে জমিজমা কিনে নিজের মত করে চাষবাস শুরু করেছেন। বাবাদের সাথে পার্টি মিটিঙেও আসেন মাঝেমাঝে, উদাত্ত্বদের বাড়িতেও এসেছেন এক-দুবার। মা যতবারই জিজ্ঞেস করেছে, বুবলু পড়াশোনা করছে কিনা, তিনি শুধু উত্তর দিয়েছেন, ওকে বলুন বাইরের বই পড়তে। উঁচু ক্লাসে কেমিস্ট্রি পড়ান, আর উদাত্তের ক্লাসে অল সায়েন্স। খুব ক্রিটিকালী খাতা দেখেন।
ভেতরে আসার পর, হেডস্যার বজ্রকঠিন গলায় জিজ্ঞেস করলেন, "ক্যান গেছিলে নদীর ধারে?"
উদাত্ত্ব নিশ্চুপ হয়ে কেডস দেখছিল।
-"কি দেখলে?"
- "..."
-"বোবা হয়ে গ্যাছো ভয়ে?"
-"..."
-"দ্যাখো, সোজা কথা সোজা ভাবে বলি। অপরাধ করেছ, পানিশমেন্ট পেতেই হবে। তোমাকে চার্চের চিলেকোঠায় সন্ধে আট টা অব্দি থাকতে হবে। অন্ধকারে একা। তোমার বাবামাকে আমি ফোন করে দেব।"
উদাত্ত্ব নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। স্কুলের দুশো বছরের ইতিহাসে খুবি কম ছাত্র এই শাস্তি পেয়েছে। ইতিহাসের স্যার একদিন বলেছিলেন, চল্লিশের দশকে বেয়াড়া স্বদেশী ছাত্রদের ফাদার মিন্স চার্চের চিলেকোঠায় পাঠাতেন।
-"তোমার নামটি বড় বেখাপ্পা রকমের, বরং পদবি ব্যাবহার করা ছেড়ে দাও।"
উদাত্ত্ব মুখ তুলে তাকিয়ে বুঝতে পারছিল না  স্যার রেগে বলছেন না এমনিই।

চিলেকোঠার দরজা দিয়ে ঢুকে হেডস্যার যখন দরজায় খিল দিয়ে বেরিয়ে গেলেন তখন প্রায় সন্ধে। উদাত্ত্ব ভয় না পেলেও একটা অদ্ভুত গা ছমছমে অনুভূতি ওকে খিদে, ক্লান্তি এই ধরনের ব্যাপারগুলি থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল।
দু পা এগিয়ে একটা বসার যায়গা খুঁজতে যেতেই, জমাট অন্ধকার থেকে খোনা গলায় কে যেন ডেকে বলল, "কে তুই?"
উদাত্ত্বের তখন মোজার মধ্যে পা ঘামতে শুরু করেছে।
-"ভয় পেয়ে লাভ নেই এসেই যখন পরেছ।"
অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে ধুপধাপ শব্দ করে একটা বিচিত্র প্রাণী এগিয়ে এলো। উদাত্ত্ব তাকিয়ে দেখল সে এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। একপায়ে লাফাতে লাফাতে সে আরেক টু কাছে এগিয়ে এসে খসখসে হাত দিয়ে উদাত্ত্বর চিবুক তুলে সরীসৃপের মত সবুজ চোখ দিয়ে ভাল করে দেখে বলল, "বিশেষ সুলক্ষণ নেই। ঘর এ বেশিক্ষণ থাকা তোর ধাতে নেই।"
লাফিয়ে লাফিয়ে চিলেকোঠার কোনার গোল ক্যাচ টা খুলে দিতেই চাঁদের আলোয় উদাত্ত্ব দেখতে পেল ধুতি পাঞ্জাবি পরা একটা একপেয়ে লোক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দাড়ি চুলকাচ্ছে।
-"তোমার একটা পা নেই কেন?"
-"লম্বা গল্প।"
-"কিন্তু আমাকে তো আটটা অব্দি থাকতে হবে।"
-"ওরে শুয়ার, ভয় হাওয়ায় মিলিয়ে গেল এর মধ্যেই?"
উদাত্ত্ব দেখল গোল জানলা টা দিয়ে সেই সেদিনের গোসাপ টা একলাফে ভেতরে এলো। এসে একপেয়ের একমাত্র পায়ের সামনে গুটিয়ে শুয়ে পড়ল।
একপেয়ে বলতে শুরু করল,
"শোন  শুয়ার, আমার নাম কন্দর্পকান্তি, সেন বংশের একটা অংশের শেষ সন্তান। বাবা এই এলাকার রাজা ছিলেন। আমি সারাদিন বই নিয়ে পড়েথাকতাম। এক শ্রমণ ভিক্ষুণীর জন্যে পাগল হয়ে সংসার ছেড়েছিলাম। হেঁটে হেঁটে পাহাড় ডিঙ্গিয়ে তিব্বতে যাই। সেখানে ওদের সাবেক রসায়ন সাধনা করি। কালের নিয়মে সেই ভিক্ষুণী আর আমার এক কন্যা সন্তান হয়।  চরম উপবাস ও পরিশ্রমের কারণে প্রসবকালীন অসুস্থতায় সে মারা গেলে পর, আমি রাজ্যে এসে বাড়িতে উঠি। বিধর্মী ছিলেম বলে বাবা আলাদা ঘর আর ঘাট  বানিয়েদিলেন। সেই ঘাটেই তুই যখন  তখন ড্যাংড্যাং করে ঘুরে বেড়াস। অনেক রকম হাবিজাবি রাসায়নিক নিয়ে নাড়াঘাঁটা করতে গিয়ে একদিন ঘাটের সামনেই মরে পড়ে গেলাম। জাত গ্যাছে বলে কেউ গোরটিও দিলে নে। একপেয়ে ভুত হয়ে গঙ্গার ধারে রয়ে গেলাম বছর বছর ধরে।"
একটু থেমে একপেয়ে একটা প্রাচীন ডাবাহুঁকো বের করে ভুরুক ভুরুক করে তিন টে তান মেরে এদিকে ফিরে আবার বলল,
"তোর আগে যেসব বাঁদরবাচ্চা গুলো এসেছিল সত্তর বছর আগে তাদের বোম বানানো তো আমিই শিখিয়েছি। যতিন দাস দের আগে ছুটকোছাটকা এদিক ওদিক যা বোম ফাটত ওগুলো তো আমারই রেসিপি। যাকগে, আজকালকার বাচ্চাগুলো তাহলে ভয় টয় পায়না। ভাল ব্যাপার। তোর খিদে পেয়েছে?"
উদাত্ত্ব গল্প শুনতে শুনতে অন্যই এক জগতে চলে গেছিল।

পরের সোমবার স্কুলে ঢুকতেই হেডস্যারের মুখোমুখি।
-"উদাত্ত্ব, আর যদি কোন দিন দেখি ক্লাস বাঙ্ক করেছ তাহলে বেল্ট দিয়ে চাবকাব।"
-"স্যার আপনি কি জানেন..."
ঠোঁটে হাত রেখে কথা কেড়ে নিয়ে স্যার বললেন,
-"বাঙালিদের রক্তের মত মিশেল রক্ত ভূভারতে আর একটিও পাবেনা। ভাল থাকুন কন্দর্পকান্তি।"

উদাত্ত্ব পরে ত্রৈলোক্যনাথ পড়ে জেনেছিল একপেয়ে ভুত রা একানড়ে নামে পরিচিত। আর একদিন গঙ্গার ধারে কাঁটাঝোপে একটা নীল গোসাপ দেখেছিল সে।