আপ্পা
চোখ গোলগোল করে একগাল হেসে
বলল 'বম্বাই
কা বারীশ দেখনেকো মিলেগা
স্যারজী,
অচ্ছে অচ্ছে
লোোগ সায়ার বন জাতে হ্যাঁয়।
'
কিছুক্ষণ
তাকিয়ে বললাম,
'আপ্পা
আজ ভি?'
আপ্পা
গাড়ির ওয়াইপার চালিয়ে ওয়াকারের
দিকে টার্ন নিয়ে বলল,
'হাপ্তে
মে একবার গুল্লে লেতে হ্যাঁয়,
আজ
মৌসম জী বড়িয়া থা।'
ফোনের
স্ক্রিনে দেখলাম এগারোটা
মিসড কল। কয়েকটা বাবা-মার,
বেশিরভাগ
গুলো রাইয়ের। আজ প্রায় বিশদিন
হতে চলল আমাদের লং-ডিস্টান্স
প্রেমের শেষ হয়েছে। ভরা
বর্ষাশেষের প্রবল বৃষ্টি
থেমে যাওয়ার পরও কয়েক পশলার
রেস থেকে যাওয়ার মত কথা হয়
এখনো আমাদের। মোস্টলীী ঝগড়াই।
কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি। কান্নাকাটি,
পুরনো
কথা,
একই
কথা। প্রেসিডেন্সির হ্যাপেনিং
লাইফ রাইকে আর মহারাস্ট্রর
পাহার,
জঙ্গল,
পুনে-
বম্বে,
সমুদ্র-বস্তি-নাইটলাইফ,
ডেটা-অ্যানালিসিসের
চাকরি,
অনিশ্চয়তা
আর বছর পঁচিশের ইনসিকিওরিটিস
আমাকে গিলে নিয়েছে।
আমি
এমনিতেই ভীষণ বৃষ্টি ভালবাসি।
সকাল-বিকেল
হাঁ করে বৃষ্টি দেখি।
এমনিতেই
শুক্রবার,
তার
উপর উথাল পাতাল বৃষ্টি,
আজ
উল্লাট পার্টি হবে ২২ তলায়।
নতুন বং এসেছে সিনে একটা। আমার
স্পিকারটা এখনো শিবাঙ্গি-দের
বাড়িতেই।
মুম্বাই
তে এক সপ্তাহের ডেপুটেশান।
এইটা সেই সময় যখন আমার টেলেভিশানের
স্ট্রাগলার বন্ধুরা ক্ষান্তি
দিয়ে এমবিএ করে নিচ্ছে। বিশাল
বম্বে শহরে একটাও বন্ধু নেই।
হিঞ্জেওয়াড়ির
পাহাড়,
জঙ্গল,
হাইরাইজ,
অফিস-চত্বর
কাঁপিয়ে যখন বৃষ্টি নামল তখন
প্রায় শেষ দুপুর। অপিস যাইনি,
সোমবার
থেকে মুম্বাই হিরানান্দানি
তে রিপোর্ট করতে হবে। তার-ই
প্রস্তুতি।
গাড়ি
এক্সপ্রেস-ওয়েতে
ঢোোকার মুখে দেখলাম,
মুলসির
জঙ্গলের দিক থেকে দৈত্যাকার
ঈগল মেঘটা আরও পূর্বদিকে সরে
যাচ্ছে। বৃষ্টি নিয়ে যাচ্ছি
বম্বেতে। বৃষ্টি,
উদাসীনতা
আর একরাশ মন খারাপ।
সন্ধে
সাড়ে ছটায় জানা গ্যাল,
লোনাভালার
আগে এক্সপ্রেসওয়েতে ধ্বস
নেমে রাস্তা বন্ধ।
-
"স্যারজী,
আর্মি
আতে আতে তো টাইম লাগেঙ্গা।
ওল্ড রুট লেলু?"
-
"কুছ
ভি কারো,
কিস্কো
অচ্ছা লগতা হাঁয় ফ্রাইডে কো
ট্রাফিক মে টাইমপাস করনা!"
আপ্পা খান্দালা মেনল্যান্ডের দিকে গাড়ি ঘোরাতেই সঙ্কোচ কাটিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'হাইওয়ে মে দারু মিলেগা আভি আপ্পা?'
-
''মিলেগা
না স্যারজী,
দারু,
চারাস,
কোকেন,
গুল্লে,
সুইয়া
সাব মিলেগা,
মেরা
জান পহেচান হ্যাঁয়।'
আপ্পা
আমার অফিস ক্যাব ড্রাইভার
হলেও লোকটি অশিক্ষিত নয়,
ওদের
বাড়ির পঞ্চাশ-ষাট
টা বড়াপাও,
দাবেলির
টাপ্রি আর ঠেলা আছে,
গ্রাজুয়েশন
অব্দি পরেছে,
কিভাবে
জানি ব্রাউন-সুগারের
নেশায় পড়ে যায়,
নেশার
সঙ্গে টাকা ধার এবং নয়ছয়েে
জড়িয়ে পড়ে,
তারপর
একদিন বাড়িতে গুন্ডা আসে,
কট্টরপন্থী
বাবা ছেলেকে বের করে দেন। এই
ধরনের মারাঠিরা ইললিটারেট
হলেও ন্যায়-অন্যায়,
ধর্ম-অধর্ম,
নিরামিষ,
ঈশ্বর
বোধ প্রবল,
মেয়েদের
সম্মান করতে জানে,
মারাঠি
কোলিি-দলিত
বস্তিতে আমি যা জেন্ডার
ইকুয়ালিটি দেখেছি,
ব্যাঙ্গালর-দিল্লীর
স্ট্র্যাটস্ফিয়ার পরিবারেও
তা দেখিনি।
আপ্পা
এখন একটা উবার আর আমাদের অফিসের
মুম্বাই রুটের গাড়ি চালায়,
বাড়িতে
লুকিয়ে খেতে যায় রাতে,
ধার
শোধ করে আর ক্লেম করে নেশা
কমিয়ে দিয়েছে। যে ঠেলাটায় ও
মাঝে মাঝে বসত - গোটা
ঠ্যালা টা জুড়ে নব্বইয়ের দশকের
হেরোইনে চুর,
কথা
জড়িয়ে যাওয়া সঞ্জয় দত্তর
অসংখ্য ছবি। সারাদিন ফোনের
লাউড স্পিকারে খলনায়কের গান
বেজেই চলে।
-
'পতা
হ্যাঁয় আজ কিয়া হ্যাঁয়?'
-
'কিয়া?'
-
'আজ
সঞ্জু-বাবা
ছুটনেওয়ালে হ্যাঁয় ইয়ের্বাড়া
সে,
হাম
তো আভি টাপরি বন্ধ কারকে মিলনে
জায়েঙ্গে উন্সে। এক ফটো তো
টাপরিকে লিয়ে মাংতা হ্যাঁয়
না স্যার?'
বলিউডের
সর্বগ্রাসী প্রেস্নেস
মহারাষ্ট্রে না থাকলে বোঝাই
যায় না!
পানভেলের কিছু আগে, বাঁদিকে পাহার আর ডানদিকে টিমটিমে বম্বের আলো ফেলে রেখে যে বারের কার-পারকিঙ্গে আমরা ঢুকলাম তার প্রাক্টিক্যালি কোন নাম/হোরডিং কিছু নেই, একটা ব্ল্যাকের খুপরি তার পাশে এলাহি দরজার এন্ট্রি। দরজা খুলতেই সিগারেট, মদের বাষ্প আর মেয়েলি পারফিউমের গন্ধ মাখা লম্বা আলোো-অন্ধকার করিডর। করিডরের দরজায় ছাপ দিতেই দেখলাম, সারিি সারিি মদের টেবিল, সামনে তিনফুটের নাম-কা-ওয়াস্তে রেলিং, তার পেছনে স্টেজ। বারের মালিকের সাথে হাসি আদান প্রদান করে আপ্পা আমাকে কোনার টেবিলে বসাল। কনকনে ঠাণ্ডা এসি।
তাওড়েজী ধুপ-ধুনোো হাতে ক্যাশ কাউন্টারের আইল দিয়ে সন্তর্পণে ঢুকলেন, যেন আশেপাশের সবকিছুই অসীম ক্লেদাক্ততা নিয়ে তার পবিত্র সাদা অরা ভেদ করে দেওয়ার চেষ্টা করছে। দু মিনিট ভক্তি ভরে পূজোো করলেন। তার পর সাবেক খাতা খুলে, নাকে চশমা লাগিয়ে হেড ওয়েটারকে ডাকলেন, ম্যাজিকের মত কোনার ছোট্ট স্টেজে আলো জ্বলে উঠল।
মধ্যবয়স্ক
এক মারাঠি ভদ্রলোক স্টেজে
উঠে লাগোয়া কী-বোর্ড,
ইলেক্ট্রনিক-পারকাশান
আর অক্টপ্যাড প্লেয়ার কে ইশারা
করতেই সুরের ঠেকা শোনা গ্যাল,
স্থূলকায়,
হিমেশ-টুপি
পরিহিত,
কাঁধ
ছাপিয়ে ছুল্কুমার গায়ক চোখ
বুজে গান ধরলেন,
"ধূপ
মে নিকলা না করো রূপ-কি-রানী,
গোরা
রঙ্গ কালা না পড় যায়ে "
ধীরে
ধীরে গুমটি গ্রিন রুম থেকে
চারটি নর্তকী স্টেজের গায়ে
প্রণাম করে গায়কের পিছনে গদি
আঁটা কার্নিশে বসল।অল্পই
লোকজন ছিল বারে, মালের প্রাথমিক
খোঁয়াড়ি কাটিয়ে তারা তাকাল
স্টেজের দিকে,
কেউ
কেউ একশ-দুশো
টাকার নোট বাড়িয়ে দিল,
অনেকে
একসাথে গানের কলি ধরল।
বারের
অনেকেই রেগুলারের,
কাজ
শেষের স্যানেটরিয়াম,
আমার
অফিস ক্যাবের ড্রাইভার'ও
তাই।
ওরা
আসতেই অনেকের মধ্যে আঁখমিচোলি
শুরু হল। আপ্পা আমার হাতে
হাল্কা চাপ দিয়ে একটি এলবিডি
পরা নর্তকীর দিকে চোখ দিয়ে
দেখিয়ে বলল,
'স্যারজী
ইয়ে হি হ্যাঁয় ও'।
আপ্পা ভাসাভাসা একবার বলেছিল, এই ওড়িয়া নর্তকীটির প্রেমে ও পড়েছে। কোশলরাজ্য সম্বলপুরের প্রত্যন্ত্য গ্রামে মধ্য নব্বই দশকে শহুরে চাকুরীরত রাজে পট্টনায়কের সাথে বইয়ে হয়, তখন ও মাইনর। রাজে বম্বে আনে ওকে, এনে নিজের বারে নাচাতে লাগায়। রাজের পাঞ্জাবী পার্টনার ধোঁকা দিয়ে বারের মালিকানা ছিনিয়ে নিলে রাজে নেশার মাত্রা বারিয়ে ওকে মারধর করা শুরু করে। ঘরে লোক ঢোকায় সামান্য টাকার বিনিময়। তারপর কালের নিয়মে, ওর দুটি ছেলে হয়, তাদের কে সম্বলপুরেই পাঠান হল।
রাজের
নেশা আর অকর্মণ্যতার সুযোগ
নিয়ে ও পালায় মুম্বাই থেকে,
তখন
ডান্স বারগুলি গভর্নমেন্টের
ধাক্কায় সেভেন আইল্যান্ড
থেকে ক্রমশও শহরতলির দিকে
চরিয়ে যাচ্ছে। পুনেতে মলে
কাজ আর টাকার অভাবে নাচ চালিয়ে
যায়।
বারের
লক্ষ্মী হলও নর্তকীরা,
মালিকরা
বুকের খুন দিয়ে তাদের বাঁচায়
এমনি একটা ধারনা এদের। এই
বারেও রাজে হানা দিলে,
পুলিশ
কাস্টমার আর বাউন্সারদের
শাসানি তে পালিয়ে বাঁচে,
রাস্তাঘাটে
অতর্কিতে ধেয়ে আসে প্রায়েই,
আপ্পা
দুবার বাঁচিয়েছে। দুবার
রাস্তার অত্যুৎসাহিিরা।
আপ্পার ইশারায় একটি ডিজেনারেট টাইপের লোক আমার সীটের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, 'হ্যাশ, কোকেন?'
হ্যাশ
শুনে লোভ হল,
বম্বেতে
যদিও ভাল হ্যাশ সহজে পাওয়া
যায় না। গেলাম পেছনে পেছনে।
আপ্পা উদগ্রীব হয়ে তার দিকে
তাকিয়ে আছে,
ভেতরে
তখন,
'মেরে
লচকে কমর,
তুনে
পহেলি নজর যব নজর সে মিলাই মজা
আ গয়া'
বাইরে
এসে দাম রফা করে সিগারেট বের
করতে যাচ্ছি ঠিক তখনই, এলবিডি
কান্নাভেজা চোখে ছিটকে বেরিয়ে
এলো,
পেছনে
আপ্পা,
হাতে
আধখাওয়া কিংফিশার স্ট্রং।
-
'পাঁচশ
কা নোট ভেজা কিউ মাদারচোোদ?
পতা
নেহি পইসা আভি ভি বহুত দেনা
হ্যাঁয় তুঝে?
'
-
'কুছ
ভি বল,
কুছ
ভি কর,
মুঝসে
শাদি কারকে নাসিক চললে?'
-
'কিত্নি
বার বোোলা হ্যাঁয় তুঝে?
মেরে
দোো বচ্চে হ্যাঁয়।'
-
'হাঁ
তো বুলা লেঙ্গে না উনহে ,
আম্মি
সে থোড়া পইসা লেকে টাপ্রি
খোল লেঙ্গে।'
-
'টাপ্রি
সে কিয়া চলেগা হামারা?
কিয়া
হর টাইম নশেরি মাফিক বাত কারতা
হ্যাঁয়?'
-'আরে
হোটেল ভি তো খোোলেঙ্গে,
বানিয়া
আইসে তো নহি হ্যাঁয় না?'
ঠিক তখনই একটি লোক পেছন থেকে এসে আপ্পা কে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিল।
আপ্পা ধুলোো ঝেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, 'দেখ রাজে তেরা টাইম আভি খতম, তুনে ইস্কা দিল দুখায়া হ্যাঁয়।'
রাজে
ওর দিকে ছুটে আসতেই বলিউডি
কায়দায় একটা টাস্কিি মেরে
ঘুরিয়ে বিয়ারের বোতল তা মারল
মেডালা অব্লাঙ্গাটার উপরে,
রাজে
মাটিতে,
বিয়ারের
ফ্যানা,
কানের
পেছনে রক্ত,
-'
চল
রেশমি,
আইয়ে
স্যারজী। মুঝে মাফ করনা।'
-'লেকিন
মেরা নাম রেশমি নহি হ্যাঁয়!'
পেছনে
দৌড়াচ্ছি। আরও পেছনে বারের
গহ্বর থেকে কারা যেন চেঁচাচ্ছে।
-'কুছ
ভি হোো।'
এরপর
মনে আছে আমরা তিনজন গাড়িতে,
অঝরধারায়
বৃষ্টি। নক্ষত্রবেগে গাড়ি
চলছে সায়ন হয়ে চেম্বুর। আমাকে
নামিয়ে গাড়ি জমা দিয়ে ওরা
সরকারি বাস ধরে যাবে পুনেতেই,
আম্মির
হাতেপায়ে ধরে টাকা নিয়ে ফেরার
হবে এক বছর। চারদিক শান্ত
হয়ে এলে সংসার। গাড়ির রেডিও
তে বাজছিল,
'ধীরে
ধীরে মচল অ্যায় দিল-এ-বেকরার
কোই
আতা হ্যায়
ইয়ু
তড়পকে না তড়পা মুঝে বার বার,
কোই
আতা হ্যায়...
'