বৃহস্পতিবার সন্ধেয় অফিস পাড়ার ডিমারটে এত ভীড় হওয়ার কথা ছিল না। ভেতরে ঢুকে বুঝলাম স্পেশাল সেল চলছে খাদ্যদ্রব্যের।
জুলাইয়ের হাল্কা বৃষ্টিতে ঠাণ্ডা ভাব সত্ত্বেও আমার সাউথ বম্বের কন্সুমারিস্ট বলিউডি টিনেজারের মত জামার উপর শার্ট পড়ে আশার কোন কারণ ছিল না। কিন্তু আমার উদ্দেশ্যই অন্য আজ।
আজ - আমি শিকারে এসেছি।
মাসকাবারি বাজারের সাথে আমি আজ চুরি করব।
ধরা পরার কোন প্রশ্নই নেই কারণ ডিমারটের টেকনোলজির দৌড় কদ্দুর সেটা আমার গত মাসেই রিসার্চ করা হয়ে গ্যাছে। ছোট জিনিসের বারকোড ঘসে দেব। বড় জিনিস বাজারের সিল করা ব্যাগে শিল্পীর দক্ষতায় ঢোকাব। নতুন জুতো ট্যাগ ছিঁড়ে পড়ে নেব।
এনিমি-লাইন্সের পারে কোন ধুরন্ধর-ই একা যায়না। আজকের মিশানে আমার তিন কমরেড আমার সাথে। অনুব্রত, ইঞ্জিনিয়ারিঙের সহপাঠী, ফেসবুকের চারহাজারি ফটোগ্রাফি পেজের মালিক, সাউথ পয়েন্টের বেয়াড়া রাম ঠ্যাঙ্গানে ছেলেদের মধ্যে নামকরা। শিবাঙ্গি, আগ্রার আধ-বানিয়া আধ-পাঞ্জাবি, তীক্ষ্ণ-বুদ্ধি, ম্যানিক ডিপ্রেশিভ আর দিল্লী-ইউপির দূরপাল্লার ট্রাকড্রাইভারের মত অ্যালকোহল টলারেন্স। আর মহুল, ইঞ্জিনিয়ারিঙের জুনিয়র, অপূর্ব সুন্দরী, খুবই প্রশংসিত নৃত্যশিল্পী আর দিবারাত্র ইমোস্যানালি আন্সটেবল।
সকলেই অফিস থেকে ফিরে একসাথে জড়ো হয়ে কয়েকটা ভডকা সটস নিয়ে নিজদের মধ্যবিত্ত ইনহিবিশান কাটিয়েছি। আমি আর মহুল একটা আখাম্বা আইফেল টাওয়ারের মত বড় জয়েন্ট ফুঁকে স্থান-কাল-পাত্র জ্ঞান টা হারিয়েছি। তারপর বৃষ্টি কাটিয়ে অটো নিয়ে হিঞ্জেওারি এসেছি শুধুমাত্র মাসকাবারি করতে নয়। নিজেদের ডিসগাস্টিংলি বোরিং, অপ্রাপ্তি ও অপ্রাচুর্য সম্পন্ন মিডিওকার জীবনে একটু অ্যাডভেঞ্চার আনতে। অ্যাটলিস্ট, আমার অজুহাত তাই ছিল, বাকিদের আমি জিজ্ঞেস করিনি তাদের অধঃপতনের কারণ সম্পর্কে।
ডিমারটে ঢুকেই সবাই অচেনা মত করে এনিমি টেরেনে ছড়িয়ে পরলাম।
প্রত্যেকের কিছু নিজস্বতা ছিল চুরির।
শিবাঙ্গি, অসংখ্য জামাকাপড়ের লেয়ার পড়ে ঢুকে পড়ত বাথ, সানিটাইজেশান আর কস্মেটিক্স সেকশানে। প্রত্যেকের প্রয়োজন ও সাজুস্য অনুসারে সাবান, লোশান, শ্যাম্পু, লুফা, সেভিং কিট, হেয়ার রিমুভিং ইউটিলিটি, মেকাপ্স, তোয়ালে এমনকি রাজকাপুর বাথরোব অব্দি সে চুরি করেছে অনায়াসে।
অনুব্রত, একটু ভারি চেহারার, বেশি জিনিস তুলতে পারতনা, তাই সে স্পেলালাইজ করত ছোট আর দামি জিনিসে, একবার সে আমাদের কমইউনাল সংসারের জন্যে বিভিন্ন ফ্লেভারের কুড়ি টা স্যুপের প্যাকেট, ডজন খানেক কনডমের প্যাকেট আর সাত টা পেনড্রাইভ এনেছিল।
একমাত্র মহুল ছিল আনপ্রেডিক্টেবল। ছোটবেলায় জেইল্ড অ্যাব্রডে দেখেছিলাম ড্রাগ-স্মাগলারেরা নিজেদের শরীরে গুপ্ত স্কিন-পকেট তৈরি করে আমরা ভাবতাম মহুলও বোধহয় অমনিই। আমাদের মধ্যে একমাত্র ওই ধরা পরেছিল, ব্যাঙ্গালরে, কারণ অত্যন্ত বেশি জিনিস জামাকাপড়ে লুকিয়ে, হাপুস-নয়নে, হাত-পা ছুঁড়ে ফোনে বয়ফ্রেন্ডের সাথে ঝগড়া করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়ে। ক্ষতিপূরণ দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে আনায় তার বন্ধুরা। এখন অবশ্য ব্যাঙ্গালর আর সেই বয়ফ্রেন্ড দুজনকেই কাটিয়ে পুনেতে চাকরি করছে। একা একা থাকে, শহরের মধ্যে থেরাপিস্ট দেখিয়ে আসে প্রতি শুক্রবার আর এসেই বলে, 'দ্বইপা মদ ঢালো'।
এরা প্রত্যেকেই নিজেদের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত চোরাগোপ্তা কাউন্টার অ্যাটাক চালায় বলেই আমি ডিফেন্সিভ লাইনে একা দাঁড়িয়ে থাকি, প্রত্যেককে সাবধান করি কারুর কোন অসাবধানতা কোন মলকর্মীর সন্দেহের কারণ ঘটছে কিনা, কোন জিনিসটা তোলা সহজ আর প্রয়োজনীয় আর শেষবধি, সবার জন্যে নজরে-না-পরা, নাম-না-জানা খাবারের উপকরণ, স্কেচবুক, রোলার স্কেটিং স্যু, ওডিকলোন, দামি ডিও, আণুবীক্ষণিক মদের বোতল ইত্যাদি তুলি।
প্রথম আধ ঘণ্টাই খুব ক্রুসিয়াল। ওই সময়েই বোঝা যায়, ভিড়ে আজ সুবিধা হবে কিনা, কর্মীরা রিলাকট্যান্ট কিনা, কোন অংশ র্যাক থেকে জিনিস নিশ্চিহ্ন করে লুকিয়ে ফেলতে সেফ। আজ দেখলাম ডিমারটে আর সপ্তমীর দিন এগদালিয়ার মধ্যে বিশেষ তফাত নেই। ক্রিস্টমাস!
ইলেক্ট্রনিক্সের র্যাকের সামনে ঘুরঘুর করছিলাম। দেখলাম একটি মেয়ে, আমাদেরই বয়েসি, একদৃষ্টে হেয়ার ড্রায়ারের দিকে তাকিয়ে আছে। আমার তৎপরতাকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিয়ে দেখলাম নিমেষের মধ্যে বাক্স খুলে চার্জার টিকে লাইটের স্পিডে ঢোলা পাজামার মধ্যে অদৃশ্য করে দিল।
হঠাৎ মনে পরল, একে আমি আগেই দেখেছি। হিঞ্জেওারির অফিস পাড়ার আরবানাইযেশানের সাথেই এখানকার পাহাড়, জঙ্গল কেটে আকাশছোঁয়া রেসিডেন্সিয়াল টাওয়ার্স বানান শুরু হয় আর্লি টুথাউসান্ড থেকে। সেরকমই পাহাড় কেটে বানান তিনটে ৩৪-তলা টাওয়ার্সের একটিতে আমরা যেখানে ২৪ তলায় থাকি মেয়েটিও তারই তিন তলায় থাকে। সম্ভবত মালায়ালি। স্কুটি চেপে অফিস যেতে প্রায়েই দেখা যায়, গম্ভীর চাহনি।
আরও একবার দেখেছিলাম, আমরা সদলবলে সেদিন টাওয়ারের সামনের উঠনে বারবিকিউ করছিলাম, উত্তাল মদ, অজস্র ম্যারিনেটেড পাখী। উঠান পেরিয়ে মুলা নদীর বাঁক, তারপরেই মুলসির ঘন জঙ্গল আর অজস্র ছোটবড় হিলক্স।
রাত হলেই হিঞ্জেওারির মানুষ জেগে ওঠে,এদিক অদিকে হাঁটতে বেরতে দেখা যায়, চতুর্দিকে চা-পোহা-বড়াপাও-এর টপ্রি, আমাদের, যাদের বলে ইয়ং আইটি প্রফেশানালস। ভীতু সাবধানী এক জেনারেশানের হাতে বড় হয়ে, ঘর-বার ছেড়ে, বিভিন্ন শহরে, বেকার না থাকার জন্যে শিক্ষা, ক্রিয়েটিভিটি আর সামাজিক দায়বদ্ধতা এড়িয়ে মাঝারি মাইনের চাকরি নিয়ে, প্রতি পদে পদে কন্স্যুমারিসম , মদ্যপ সাইকেডেলিয়া আর বর্ডারলাইন পারসোনালিটির মধ্যে নক্ষত্রবেগে চক্রাকারে ঘুরছি এই শহর গুলোতে, যেগুলি আপাদমস্তক শপিং মল। বড় দোকান, ছোট দোকান, মাঝরি দোকান, ফুটের দোকান আর সর্বোপরি খাবারের দোকান। যেখানে শপিং করে ফেরার পথে আমরা ডাবল চিজ, বেকন, বীফ প্যাটি বার্গার আর ক্রাফট বিয়ার খেতে পারি। এবং প্রতিনিয়ত আমরা বাড়ছি। নোংরার স্তূপে ভয়ঙ্কর ব্যাটেরিয়ার মত।
সেই রাত্রে এই মেয়েটির দলবল আমাদের কাণ্ডকারখানা দেখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েছিল। ইউকুলেলের শব্দে, সে জিজ্ঞেস করেছিল কি ভাষা? আমরা জানিয়েছিলাম উত্তর বাংলার ডাইলেক্ট। কয়েকজনকে আমাদের মধ্যের ওভার-ফ্রেন্ডলি ছেলেরা ডেকেছিল, তারা আসেনি।
মল থেকে বেরিয়ে অটোয় আমরা সেদিনকার চুরির হিসেব মেটাতে ব্যাস্ত হলে আমার নজর গেল তার উপর। পোশাক আশাকে মনে হয় সদ্য ঘুম থেকে উঠেছে, ঢোলা আলিবাবা আর শ্যাবি টপ, হলটার নেক ব্রা। মনে হয়, নাইট শিফট করে।
আমি ভাবলাম, সেদিনকার কথা যেদিন সৌম্য নোটিস করে বলেছিল, মেয়েটা আমার খটমট নাম পরার চেষ্টা করছে লিফটে, গলার আই-কার্ড দেখে।
খটমট বলেই হয়ত সময় লাগছিল।
বলতে ভুলে গেছি, হেয়ার ড্রায়ারটা আমি উঠিয়ে নিয়েছি, যেটির চার্জারটি তার কাছে। রোবটদের অনুভূতিই তো বিপ্লব, যেখানে গাছ কেটে দিকচক্রবাল বানান হয় সেখানে প্রেমই তো আমার যুদ্ধ, মাই রেভলিউশান।
জুলাইয়ের হাল্কা বৃষ্টিতে ঠাণ্ডা ভাব সত্ত্বেও আমার সাউথ বম্বের কন্সুমারিস্ট বলিউডি টিনেজারের মত জামার উপর শার্ট পড়ে আশার কোন কারণ ছিল না। কিন্তু আমার উদ্দেশ্যই অন্য আজ।
আজ - আমি শিকারে এসেছি।
মাসকাবারি বাজারের সাথে আমি আজ চুরি করব।
ধরা পরার কোন প্রশ্নই নেই কারণ ডিমারটের টেকনোলজির দৌড় কদ্দুর সেটা আমার গত মাসেই রিসার্চ করা হয়ে গ্যাছে। ছোট জিনিসের বারকোড ঘসে দেব। বড় জিনিস বাজারের সিল করা ব্যাগে শিল্পীর দক্ষতায় ঢোকাব। নতুন জুতো ট্যাগ ছিঁড়ে পড়ে নেব।
এনিমি-লাইন্সের পারে কোন ধুরন্ধর-ই একা যায়না। আজকের মিশানে আমার তিন কমরেড আমার সাথে। অনুব্রত, ইঞ্জিনিয়ারিঙের সহপাঠী, ফেসবুকের চারহাজারি ফটোগ্রাফি পেজের মালিক, সাউথ পয়েন্টের বেয়াড়া রাম ঠ্যাঙ্গানে ছেলেদের মধ্যে নামকরা। শিবাঙ্গি, আগ্রার আধ-বানিয়া আধ-পাঞ্জাবি, তীক্ষ্ণ-বুদ্ধি, ম্যানিক ডিপ্রেশিভ আর দিল্লী-ইউপির দূরপাল্লার ট্রাকড্রাইভারের মত অ্যালকোহল টলারেন্স। আর মহুল, ইঞ্জিনিয়ারিঙের জুনিয়র, অপূর্ব সুন্দরী, খুবই প্রশংসিত নৃত্যশিল্পী আর দিবারাত্র ইমোস্যানালি আন্সটেবল।
সকলেই অফিস থেকে ফিরে একসাথে জড়ো হয়ে কয়েকটা ভডকা সটস নিয়ে নিজদের মধ্যবিত্ত ইনহিবিশান কাটিয়েছি। আমি আর মহুল একটা আখাম্বা আইফেল টাওয়ারের মত বড় জয়েন্ট ফুঁকে স্থান-কাল-পাত্র জ্ঞান টা হারিয়েছি। তারপর বৃষ্টি কাটিয়ে অটো নিয়ে হিঞ্জেওারি এসেছি শুধুমাত্র মাসকাবারি করতে নয়। নিজেদের ডিসগাস্টিংলি বোরিং, অপ্রাপ্তি ও অপ্রাচুর্য সম্পন্ন মিডিওকার জীবনে একটু অ্যাডভেঞ্চার আনতে। অ্যাটলিস্ট, আমার অজুহাত তাই ছিল, বাকিদের আমি জিজ্ঞেস করিনি তাদের অধঃপতনের কারণ সম্পর্কে।
ডিমারটে ঢুকেই সবাই অচেনা মত করে এনিমি টেরেনে ছড়িয়ে পরলাম।
প্রত্যেকের কিছু নিজস্বতা ছিল চুরির।
শিবাঙ্গি, অসংখ্য জামাকাপড়ের লেয়ার পড়ে ঢুকে পড়ত বাথ, সানিটাইজেশান আর কস্মেটিক্স সেকশানে। প্রত্যেকের প্রয়োজন ও সাজুস্য অনুসারে সাবান, লোশান, শ্যাম্পু, লুফা, সেভিং কিট, হেয়ার রিমুভিং ইউটিলিটি, মেকাপ্স, তোয়ালে এমনকি রাজকাপুর বাথরোব অব্দি সে চুরি করেছে অনায়াসে।
অনুব্রত, একটু ভারি চেহারার, বেশি জিনিস তুলতে পারতনা, তাই সে স্পেলালাইজ করত ছোট আর দামি জিনিসে, একবার সে আমাদের কমইউনাল সংসারের জন্যে বিভিন্ন ফ্লেভারের কুড়ি টা স্যুপের প্যাকেট, ডজন খানেক কনডমের প্যাকেট আর সাত টা পেনড্রাইভ এনেছিল।
একমাত্র মহুল ছিল আনপ্রেডিক্টেবল। ছোটবেলায় জেইল্ড অ্যাব্রডে দেখেছিলাম ড্রাগ-স্মাগলারেরা নিজেদের শরীরে গুপ্ত স্কিন-পকেট তৈরি করে আমরা ভাবতাম মহুলও বোধহয় অমনিই। আমাদের মধ্যে একমাত্র ওই ধরা পরেছিল, ব্যাঙ্গালরে, কারণ অত্যন্ত বেশি জিনিস জামাকাপড়ে লুকিয়ে, হাপুস-নয়নে, হাত-পা ছুঁড়ে ফোনে বয়ফ্রেন্ডের সাথে ঝগড়া করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়ে। ক্ষতিপূরণ দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে আনায় তার বন্ধুরা। এখন অবশ্য ব্যাঙ্গালর আর সেই বয়ফ্রেন্ড দুজনকেই কাটিয়ে পুনেতে চাকরি করছে। একা একা থাকে, শহরের মধ্যে থেরাপিস্ট দেখিয়ে আসে প্রতি শুক্রবার আর এসেই বলে, 'দ্বইপা মদ ঢালো'।
এরা প্রত্যেকেই নিজেদের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত চোরাগোপ্তা কাউন্টার অ্যাটাক চালায় বলেই আমি ডিফেন্সিভ লাইনে একা দাঁড়িয়ে থাকি, প্রত্যেককে সাবধান করি কারুর কোন অসাবধানতা কোন মলকর্মীর সন্দেহের কারণ ঘটছে কিনা, কোন জিনিসটা তোলা সহজ আর প্রয়োজনীয় আর শেষবধি, সবার জন্যে নজরে-না-পরা, নাম-না-জানা খাবারের উপকরণ, স্কেচবুক, রোলার স্কেটিং স্যু, ওডিকলোন, দামি ডিও, আণুবীক্ষণিক মদের বোতল ইত্যাদি তুলি।
প্রথম আধ ঘণ্টাই খুব ক্রুসিয়াল। ওই সময়েই বোঝা যায়, ভিড়ে আজ সুবিধা হবে কিনা, কর্মীরা রিলাকট্যান্ট কিনা, কোন অংশ র্যাক থেকে জিনিস নিশ্চিহ্ন করে লুকিয়ে ফেলতে সেফ। আজ দেখলাম ডিমারটে আর সপ্তমীর দিন এগদালিয়ার মধ্যে বিশেষ তফাত নেই। ক্রিস্টমাস!
ইলেক্ট্রনিক্সের র্যাকের সামনে ঘুরঘুর করছিলাম। দেখলাম একটি মেয়ে, আমাদেরই বয়েসি, একদৃষ্টে হেয়ার ড্রায়ারের দিকে তাকিয়ে আছে। আমার তৎপরতাকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিয়ে দেখলাম নিমেষের মধ্যে বাক্স খুলে চার্জার টিকে লাইটের স্পিডে ঢোলা পাজামার মধ্যে অদৃশ্য করে দিল।
হঠাৎ মনে পরল, একে আমি আগেই দেখেছি। হিঞ্জেওারির অফিস পাড়ার আরবানাইযেশানের সাথেই এখানকার পাহাড়, জঙ্গল কেটে আকাশছোঁয়া রেসিডেন্সিয়াল টাওয়ার্স বানান শুরু হয় আর্লি টুথাউসান্ড থেকে। সেরকমই পাহাড় কেটে বানান তিনটে ৩৪-তলা টাওয়ার্সের একটিতে আমরা যেখানে ২৪ তলায় থাকি মেয়েটিও তারই তিন তলায় থাকে। সম্ভবত মালায়ালি। স্কুটি চেপে অফিস যেতে প্রায়েই দেখা যায়, গম্ভীর চাহনি।
আরও একবার দেখেছিলাম, আমরা সদলবলে সেদিন টাওয়ারের সামনের উঠনে বারবিকিউ করছিলাম, উত্তাল মদ, অজস্র ম্যারিনেটেড পাখী। উঠান পেরিয়ে মুলা নদীর বাঁক, তারপরেই মুলসির ঘন জঙ্গল আর অজস্র ছোটবড় হিলক্স।
রাত হলেই হিঞ্জেওারির মানুষ জেগে ওঠে,এদিক অদিকে হাঁটতে বেরতে দেখা যায়, চতুর্দিকে চা-পোহা-বড়াপাও-এর টপ্রি, আমাদের, যাদের বলে ইয়ং আইটি প্রফেশানালস। ভীতু সাবধানী এক জেনারেশানের হাতে বড় হয়ে, ঘর-বার ছেড়ে, বিভিন্ন শহরে, বেকার না থাকার জন্যে শিক্ষা, ক্রিয়েটিভিটি আর সামাজিক দায়বদ্ধতা এড়িয়ে মাঝারি মাইনের চাকরি নিয়ে, প্রতি পদে পদে কন্স্যুমারিসম , মদ্যপ সাইকেডেলিয়া আর বর্ডারলাইন পারসোনালিটির মধ্যে নক্ষত্রবেগে চক্রাকারে ঘুরছি এই শহর গুলোতে, যেগুলি আপাদমস্তক শপিং মল। বড় দোকান, ছোট দোকান, মাঝরি দোকান, ফুটের দোকান আর সর্বোপরি খাবারের দোকান। যেখানে শপিং করে ফেরার পথে আমরা ডাবল চিজ, বেকন, বীফ প্যাটি বার্গার আর ক্রাফট বিয়ার খেতে পারি। এবং প্রতিনিয়ত আমরা বাড়ছি। নোংরার স্তূপে ভয়ঙ্কর ব্যাটেরিয়ার মত।
সেই রাত্রে এই মেয়েটির দলবল আমাদের কাণ্ডকারখানা দেখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েছিল। ইউকুলেলের শব্দে, সে জিজ্ঞেস করেছিল কি ভাষা? আমরা জানিয়েছিলাম উত্তর বাংলার ডাইলেক্ট। কয়েকজনকে আমাদের মধ্যের ওভার-ফ্রেন্ডলি ছেলেরা ডেকেছিল, তারা আসেনি।
মল থেকে বেরিয়ে অটোয় আমরা সেদিনকার চুরির হিসেব মেটাতে ব্যাস্ত হলে আমার নজর গেল তার উপর। পোশাক আশাকে মনে হয় সদ্য ঘুম থেকে উঠেছে, ঢোলা আলিবাবা আর শ্যাবি টপ, হলটার নেক ব্রা। মনে হয়, নাইট শিফট করে।
আমি ভাবলাম, সেদিনকার কথা যেদিন সৌম্য নোটিস করে বলেছিল, মেয়েটা আমার খটমট নাম পরার চেষ্টা করছে লিফটে, গলার আই-কার্ড দেখে।
খটমট বলেই হয়ত সময় লাগছিল।
বলতে ভুলে গেছি, হেয়ার ড্রায়ারটা আমি উঠিয়ে নিয়েছি, যেটির চার্জারটি তার কাছে। রোবটদের অনুভূতিই তো বিপ্লব, যেখানে গাছ কেটে দিকচক্রবাল বানান হয় সেখানে প্রেমই তো আমার যুদ্ধ, মাই রেভলিউশান।