Friday, December 8, 2017

লেত্তি

The Tryst of Letti
- Chaiti Nath, Jan 2017



                                                                (১)

অফসাইডে চারজন ফিল্ডার। তারমধ্যে কভারে বাঘের মত ওঁত পেতে দাঁড়িয়ে আছে সুমিত। ফরওয়ার্ড শর্ট-লেগে সুমিতের ভাই ভিকি। বাবা-মা ইন্টারকাস্ট বলে দুই ভাই কে পাগড়ি দেননি। কলকাতায় মার্চের চামড়া জালানো গরম। রক্ষে করেছেন।
আলমদের ছোটছেলে বল করবে। লুঙ্গি আর নকল অ্যাডিডাসের ছাইরঙা টিশার্ট। খালি পা। চুইং-গাম চেবাতে চেবাতে সোজা হয়ে দাঁড়াল। কোমরের নিচে অদৃশ্য হাতের কব্জি থেকে সাপের ছোবলের গতিতে ছিটকে দুশ গ্রামের প্লাস্টিক-বল স্পেস-টাইম ডিস্টরট করতে করতে ড্রপ খেলো গুড-লেংথে। আমার কানের পেছনে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম, আগের দুটো বল এত জোরে ছিল না। আগের দুটোই লেগ স্পিন ছিল, একটা ক্যাচ হতে হতে চার হয়ে গ্যাছে, আরেকটা ফ্লাইট মিস করে উইকেট-কীপারের হাতে গ্যাছে। ঠ্যাং বাড়িয়ে কভার আর সোজা সটের মাঝখানের স্পেস টা নেব ইতিমধ্যেই বল সম্পূর্ণ উল্টো দিকে ঘুরে আমার মিডল স্টাম্প ছিটকে দিয়েছে। ইসস, বোঝা উচিত ছিল। আরহান খুবই আনপ্রেডিক্টেব্ল। চারিদিকে সবার পাশবিক উল্লাস, ম্যাচ ওদের হাতের মুঠোয়। রানার্স এন্ডে সানি। যে কিনা এখনো দুধভাত পর্যায়ের। লাস্ট ম্যানের ব্যাটিং আছে। সে আউট হলেই শেষ। বাকি চার বলে বারো রান। জেতার আশা প্রায় নেই।
জগুন চিৎকার করে বললে, 'বোলা থা না, ইশকো উপার ভেজ, উসকো সেট হনে মে টাইম লাগতা হ্যাঁয়!'
কথাটা সত্যি। আমি অত্যন্ত নার্ভাস জাতীয় প্লেয়ার। আর আজ আমার মনে হচ্ছিল, লিফটের অ্যাটিক থেকে দেওয়াল ভেদ করে লেত্তি আমায় দেখছে। কেউ আমায় দেখলে আমার আরও হাঁটু কাঁপে।
লেত্তির চোখগুলো আমি কক্ষনও দেখিনি। মানে, ওর কপাল থেকে ঠোঁট অব্দি কিরকম একটা নিঝুম অন্ধকারে ঘেরা।

বয়েস চোদ্দ, পড়াশোনায় ভালই। আর পাঁচজনের মত গিটার বাজাতে, ছবি আঁকতে পারতাম।
কয়েক সপ্তাহ আগেই বার দুয়েক জন্ডিস হয়েছে, বিলিরুবিন ভীষণ বেড়ে বিছানার চাদর অব্দি হলুদ হয়ে যাচ্ছিল। শরীর এখনো দরের হয়নি। দিনের পর দিন পেঁপে আর মাগুরমাছ খেয়ে মানসিক ভাবেও অত্যন্ত দৈন্যে ভুগেছি।
মাঝখানে আবার আলমদের বড়ছেলের বিয়ে ছিল। বেলিয়াসোর থেকে তিনখানা ডাইনোসরের সাইজের দুম্বো ওদের বারান্দায় রাখা ছিল। ওদেরকেই হালাল করে, ম্যারিনেট করে বিরাট ডেকচিতে বিরিয়ানি হয়েছিল। লখনউ থেকে বাবুর্চি এসেছিল।অজস্র কাবাব আর সরের ময়ান দেওয়া লাচ্ছা পরটা। চাল-ক্ষীরের ফিরনি। মেওয়া দেওয়া সীমাই। মিঠা ভাত। আমাদের ফ্লাটের উলটোদিকেই। গন্ধে মনে হচ্ছিল এইসব না খেতে পাওয়ার থেকে মরে যাওয়াই অনেক ভাল। আলমরা আবার প্র্যাক্টিকাল জোক করেছিল আমার সাথে। বলেছিল দাওয়াত পে আইয়ে, পেপে-কা বিরিয়ানি বানায়েঙ্গে আপ কে লিয়ে!
                                                               (২)

দু মাস বিছানায় শুয়ে কিছু করার থাকত না। ছোটমামা আর তার বান্ধবী আমাকে প্রতি সপ্তাহে বই এনে দিত। তখনই জুলভারনের অমনিবাসটাও পরেছিলাম। শুরুতে অসম্ভব ভাললাগছিল। কিন্তু বাধসাধল প্যাসিফিকের কোন
এক নাম-না-জানা দ্বীপে বন-শুয়োর শিকার করে এনে আগুনের মশলা দিয়ে ঝলসে খাবার ডেস্ক্রিপ্সান পড়েই (টয়েন্টি থাউস্যান্ড লীগস আন্ডার দ্য সী)। তখন একটু শরীর সেরে আসছিল, একঘেয়ে খাবার খেয়ে খেয়ে হঠাৎ একদিন মনে হল, আর না!
মনে পরল বাবা বলেছিল, সর্বহারারাই বিপ্লব করতে পারে। আমি এখন প্রকৃত অর্থে সর্বহারা। আলমদের বিয়েবাড়িটা মিস করাটাই থ্রেশহোল্ড ছিল।

ওঠা বারণ, পা টিপে টিপে উঠলাম। শীতের রাত। ফ্রিজে নলেন গুড়ের টিন। গুছিয়ে পাউরুটি নিয়ে সোফায় বসে কম ভল্যুমে টিভি চালালাম। পোকেমনের রিপিট টেলিকাস্ট। খাবার শেষ হতেই কেবল কেটে গ্যাল। জানলায় গিয়ে বসলাম। ঠাণ্ডা হাওয়া। পাঁচতলার জানলা দিয়ে পুরো এলাকাটাই দেখা যায়। নস্করপাড়া, একটু দুরে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের গেট পেরিয়ে জংগুলে মত জায়গা, বন বাদাড় পেরিয়ে গঙ্গা, গঙ্গায় আবছা কিছু আলো কুয়াশা কেটে ভীষণ মন্থর গতিতে এদিক অদিক  করছে, কারখানার ধোঁয়ায় আকাশ শ্যাওলাটে।
আমাদের এপার্টমেন্ট টপ-ফ্লোরে , ছাদ থেকে হঠাৎ একটা শব্দে চমকে উঠলাম। একবার মনে হল কাটিয়ে দি, দেখলাম বাবা-মা অঘোরে ঘুমাচ্ছে। নিনজা মোডে কল্যাপ্সিবল খুললাম, পালকের হাতে ছাদের গেট,
সামনেই দিগন্ত বিস্তৃত ছাদ, যেখানে অসুখ হওয়ার আগে অব্দিও রোজ বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে বল পেটাই।
ছাদে উঠতেই সেই একনাগাড়ে দুমদাম শব্দ। আসছে লিফটের যন্ত্রের একফালি ঘরটা থেকে। একবার আগে একটা শকুন এসে আটকে পরেছিল এইখানে। দরজা খুলে বের করতে গেলে রাগী রাগী চোখে তাকাচ্ছিল আর ভিকি বলেই যাচ্ছিল ঠুকরে চোখ খুবলে নেবে।
দরজা খুলেই হাঁহাঁ করা অন্ধকার, আর হাই-ভোল্টেজ ইলেক্ট্রিসিটির একটানা শব্দ। লিফটের আসা যাওয়া এত রাতে হয়না বললেই চলে। হলেও এরকম দরজা ধাক্কানোর মত শব্দ হয়না। ভেতরে ঢুকে কোনরকম শব্দের কারণ খুঁজে না পেয়ে পেছন ফিরতেই হঠাৎ 'দুম' করে খুব কাছেই যেন কোন ভারী বাক্স দোতলার বারান্দা দিয়ে মাটিতে এসে পরল। হঠাৎ খুব ঠাণ্ডা লাগল। হয়ত আবার জ্বর আসছে। ভয়ে গলাটা শুকিয়ে গ্যাছে। কোনরকমে থুতু গিলে পেছন ঘুরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়েও কিছু দেখতে পেলাম না।
দরজা বন্ধ করে কোনরকমে তাড়াহুড়ো করে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় মনে হল দেওয়াল দিয়ে যেন চাপা গুমগুম শব্দ আমার পিছুপিছু নামছে, সেই সঙ্গে মিশকালো ঠাণ্ডা এক ঝলক বাতাস। অজানা এক আতঙ্কে আমি ঝড়ের বেগে সিঁড়ি দিয়ে নেমে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করতেই শব্দ পিছু নেওয়া বন্ধ হল। সারারাত ঘরের আলো জ্বালিয়ে মরার মত পড়ে থাকলাম, ভাল ঘুম এলো না।

                                                             (৩)

পরদিন দুপুরে টুমনা এলো সাপ্তাহিক স্কুলের কাজ আর সিলেবাস নিয়ে। মা ওকে গরম গরম কপির সিঙ্গারা ভেজে দিল, আমায় দিল মশলা ছাড়া অল্প তেলের চিঁড়ে ভাজা। ওকে আগের দিনের ঘটনা জানালাম সংক্ষেপে,ও হাঁ করে শুনল। বলল একদিন রাতে এসে থাকবে যদি এমনি চলতে থাকে। দুজন মিলে অবসারভ করব। টুমনা এমনিতে খুবি ডাকাবুকো, ফুটবল খ্যালে তাই লম্বা বিনুনিটা গত বছর ত্যাগ করেছে। বড় বড় চোখ।
পর পর আরো দুরাত রোজই শব্দ শুনতে পেতাম, আর কেউ পায়েনি। মা-বাবা না, খেলার বন্ধুরাও না। আমিও ঘর থেকে বেরইনি।
তৃতীয় দিন কষ্ট করে স্কুলে গেছিলাম সাজেশান আনতে। হাঁটলে পেটে লাগত।
আমাদের এক বহু বছর আগের পাস-আউট  সিনিয়ার ছিল, স্কুল ছাড়ার আগে আগে সে নাকি স্কুলের পেছনের জঙ্গলে একটা নীল গোসাপ দেখতে পেয়েছিল। তারপর তাকে ধরতে গিয়ে গঙ্গায় পড়ে যায়, সেই থেকে পাগল হয়ে স্কুলের মাঠেই পড়ে থাকে। একেবারেই ভায়লেন্ট না। বরং ছেলেদের সাথে ফুটবল খ্যালে, টিফিন ভাগ দিলে খায়। আমার সাথে ভাল করেই কথা হত তার। আমাকে একবার বলেছিল গঙ্গার তলে সে নাকি পানিমুড়া দেখেছে। যারা অভিশপ্ত জলে ডুবে মরে তারা পানির মধ্যে পানিমুড়া হয়ে থাকে, তাদের মাছের মত কানকো আর পাখনা গজায়।
বিষ্টু পাগলা আমার গল্প শুনে বলল, 'যদি ভয় না পাস তাহলে, যে তোকে শব্দ করে ডেকেছে তাকে তুইও আওয়াজ করেই সাড়া দে। '

সেদিন রাতে যেন বাঁধনহারা শব্দ, মনে হল দুনিয়া সুদ্ধু সবাই এখুনি জেগে যাবে। আসে পাশে কেউ যেন হাতুড়ি মেরে মেরে দেওয়াল ভাংছে। উঁকি মেরে দেখলাম মা-বাবা ঘুমে অচেতন, যেন ঘরের মধ্যে কুয়াশা। মন হল পৃথিবীতে এমন কিছু আছে যেগুলোর ভাগ আর কেউ নেবে না। উপলব্দি গুলো আমারই। একার। দরজা খুলে লিফটের ঘরের সামনে এলাম। দরজা যেন শব্দে ফেতে পড়তে চায়। অসম্ভব ভয়ে হাত পা হিম হয়ে যাচ্ছে। সাহসে ভর করে অত্যন্ত আস্তেআস্তে দরজায় টোকা দিলাম। হঠাৎ নৈশব্দ। প্রতিটা মিনিট কাটতে লাগল ভীষণ আস্তেআস্তে। চাঁদের আলোয় চারিদিক সাদা। প্রতি মুহূর্তে যেনও ঠাণ্ডা বেড়েই চলেছে।
হঠাৎ সবকিছু তোলপাড় করে দেখলাম কার্নিশ থেকে উল্টো হয়ে একটি সবুজ সালওয়ার পরা মেয়ে আমার দিকে দেখছে। মাথার চুল লম্বা হয়ে মাটিতে এসে ঠেকেছে। ভয় হাত-পা কাঁপছে, স্নায়বিক চাপে হয়ত অজ্ঞানই হয়ে যাব।
মেয়েটি হাওয়ায় ভেসে ভেসে শম্বুকগতিতে আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। ঠাহর করে দেখলাম লিকলিকে হাত-পা, খুবি পুরনো সালওয়ার, চোয়ালের হাড়গুলো উঁচু উঁচু, চোখ দুটো দেখা যায়না, কপালের নিচে যেন নির্নিমেষ অন্ধকার। মেয়েটি যেন ঘষা কাঁচে তৈরি।
 

                                                            (8)

যখন চোখ খুললাম তখন সকাল সাড়ে দশটা । তারপর থেকেই লেত্তি প্রায়েই গভীর রাতে ঘরে আসত, ওইরকম ভাবেই, উল্টো হয়ে জানলা দিয়ে। মাথার কাছে এসে বসত। কখনো কথার উত্তর দিত, কখনো  দিতনা।  বাংলায় কথা বলত।
বলেছিল আগে নাকি ফ্ল্যাটের পাশের খবরখানা টা আসে পাশের আধ কিলোমিটারেরও বড় রেডিয়াস ধরে ছিল। পরে মাটি ফেলে কারখানা, ফ্ল্যাট বাড়ি আর রাস্তা  হয়। আগে যখন আসে পাশে মুসলমানদের গ্রাম ছিল, সব উজাড় হয়ে যায় কলেরায়। তখন কবর খানা বাড়তে বাড়তে এদিকে ছাপিয়ে চলে আসে। হিসেব মত লেত্তির কবর আমাদের ফ্ল্যাটের লিফটের গর্তের নিচে। গ্রাউন্ড ফ্লোরেরও নিচে, বেস্মেন্টের গ্যারাজেরও নিচে। লিফটের ছোট্ট গর্তের নিচে। লেত্তি কিন্তু কলেরায় মরেনি, গ্রামের পারে, কবর পেরিয়ে বেঁটে বেঁটে গাছের জঙ্গলে আদিবাসীরা ফাঁদ পেতেছিল শজারু ধরার জন্যে, একটা নীল গোসাপ কে তাড়া করতে করতে ফাঁদে পড়ে অত্যধিক রক্তপাতের কারণে তার মৃত্যু হয়।
পরে বড় হয়ে ভেবেছি তাকে নামাজের সময় দেখা যায়নি কক্ষন। টিভির ঘরের জানলার বাইরে গোধূলির আলোয় ওকে কার্নিশে ঝুলতে দেখেছি। ও বলত ওর দুনিয়টা আমাদের মতই দেখতে, কিন্তু উল্টো। আমার কোনদিন ক্ষতি করেনি, সপ্তাহে এক দুবার আসত। ভয়টা কেটে গেছিল।
 

ক্লাস টেনের পরে আমরা সপরিবারে দিল্লী চলে যাই। দিল্লীতে কক্ষন লেত্তিকে দেখিনি। খালি নিজামুদ্দিনের দরগায় একটা ফকির আমার মাকে বলেছিল আমার মাথায় জীনের ছায়া আছে।