Tuesday, October 2, 2018

কভেন

রোহনের দাদু যেদিন মারা যায়, সেদিন দিদিমা সারারাত একফোঁটাও কাঁদেনি। সারারাত বৃষ্টি মাথায়, নতুন থানে, গোল গোল চোখ করে পুকুরপাড়ের নিম গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে 'মার্গারেটের' সাথে কথা বলেছিল। ওদের বস্তিতে সচ্ছল গৃহস্থ কেউ মারা গেলে রাজকীয় দাওয়াত বসে, ব্যান্ডপার্টি ভাড়া করে দেহ নিয়ে পরমানন্দে প্রসেশান বেরোয়, পাপের জীবন শেষ হওয়ার দিন।
আগেরদিন রাতে জব্বর খাওয়া হয়েছিল। ভোররাতে জলতেষ্টা পেতে উঠে দেখে, দিদিমা স্টোভ জ্বালিয়ে উঠোনে বসে চা করছে, পাশে আরামকেদারায় দাদু বসে আছে, ঠিক তেমনটা দেখতে যেমনটা কিনা তার প্রথম স্মৃতি দাদুকে নিয়ে। কালো উনুনের মত রং, লম্বা জুলফি, হাতে ক্যাপ্সটান সিগারেট, খালি গায়ে লুঙ্গি পরে, ঠিক যেন দশ বছর আগের দাদু। মুখখানা কিরকম ঘষা কাঁচের মত, চারিদিকে কড়া চাঁদের আলো। দিদিমা বলেছিল, চেনা তাদের যে মানুষটে চোখ ফেলে দেখে, তার মনে ধরা সেই লোকটির প্রথম আনন্দের ছবিটেই দেখতে পায়।
দিদিমা দুঃখী ফোকলা হাসি নিয়ে কতই সে গল্প, দাদু মলিন মত, চোখ দিয়ে কথা বলে। দিদিমা বলেছিল, মাজার জোর ছিল বলে এলেন উনি, নাহলে মার্গারেটের বাবাও আনাতে পারতেন না। আহা গো, সদাশিব মানুষ ছিল।
সেদিন থেকে রোহন বুঝেছিল, দিদিমার জগতটা আর পাঁচজনের থেকে আলাদা এবং তার সাথে সাথে, হয়ত তারও।

কয়েক সপ্তাহ আগে বিলের থেকে গোসাপ এসে হাঁস খেয়ে যেত বলে দিদিমা ভোররাতে উঠে বাঁশ পিটিয়ে দুটো গোসাপ মেরেছিল। একাই। এই বয়েসেও।
তারপর মৃতদেহগুলিকে ঘরের দাওয়ায় রেখে সে কি কান্না। রোহন শান্ত হয়ে পাশে বসেছিল। তারপরে গরম জলে গা মুছিয়ে পুকুরপাড়ের নিম গাছের তলায় রেখে এলেন। পরের দিন বিকেলে খেলে ফেরার সময় রোহন মিন্স দুটি নীল গোসাপ দেখেছিল। সরসর করে ঝোপ পেরিয়ে বিলে নেমে যাচ্ছে। দুরে দিদা দাঁড়িয়ে। বাটি তে বাসি ভাত।

দিদিমারা পাঁচ বোন ছিলেন, থাকতেন সুন্দরবনের নামহীন এক প্রত্যন্ত গ্রামে, পাথরপারায় এসে শুঁটকি করার কাজ করতেন সবাই মিলে। দাদুর বাড়ি ডাঙ্গায় গিয়ে আরও চল্লিশ মাইল পরে, ডায়মন্ড হারবর থেকে ঠিকে জাহাজে মাল নিয়ে কলকাতায় নামাতেন। কি করে জানি দেখা হয়ে গ্যাল। যদি জাহাজই ডুববে তাহলে চরে এসে দিদিমা শুঁটকিই বা করে কেন আর যদি জাহাজই না ডুবল তাহলে কিই বা আর হল?
দিদিমার কাছে গ্রাম থেকে আনা অনেকরকম দেবদেবীর পুতুল ছিল, শঙ্কর মাছের লেজ, অনেক রকম সামুদ্রিক পাথর, বিভিন্ন রকম গন্ধওয়ালা হাবিজাবি ওষুধের শিশি, শকুনের একগোছা পালক। দিদিমা কালো কাঠের বাক্স করে খাটের তলায় রাখতেন। সেইঘরে একটাও যীশু ছিলনা। দিদিমা চার্চেও যেতেন দু মাসে একবার। তখনই, যখন  গ্রামে কোন পারিবারিক অনুষ্ঠান হত।

মা যতদিন বেঁচে ছিলেন, তিনিও বেশ অনেকখানি পাগলি ছিলেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাছের সাথে কথা বলতেন। দিদিমা আর মা দুইয়ে মিলে মাসে একদিন পাশের গ্রামে যেতেন, বাড়িতে জানাতেন কোনও আত্মীয়ের বাড়ি যান। কে বা কারা রোহনের বাবা আর দাদু অত পাত্তা দিতেন না। বরং এই সুযোগে তারা পাড়ার কাকুদের জুটিয়ে বোতল খুলতেন। ঝামিরা ঘটকপুকুর থেকে চর্বিওয়ালা শুয়োরের মাংস এনে ঝাল করে কষাতো।
রোহন জানত আত্মীয়ের বাড়িটা অজুহাত মাত্র।
আসলে তার মা-দিদিমার মত আর কেউ কেউ আছে, যারা জল বাঁকাতে পারে, মরা জাগাতে পারে, পশুপাখির মন বুঝতে পারে, বৃষ্টি হলে কতক্ষণ হবে বলতে পারে, মার্গারেটের মত দেড়শ বছর আগে বিলের ধারে যারা ফোরট বানিয়ে থাকত তাদের সাথে কথা বলতে পারে, নিম গাছের মধ্যে যে দরজাটা দিয়ে সেই উল্টো দুনিয়াটায় যেতে হয় তারা জানে। তারা বনবিবি দেখেছে। মা-দিদিমা তাদের কাছেই যান। সুখদুঃখের গল্প করতে।
রোহন এখন বড়ো হয়ে এটাও বুঝে গ্যাছে যে মা-দিদিমা এইসব পারলেও তার নিজের জগতটা আর পাঁচজনের থেকে আলাদা না।
সে নিজে এই ক্ষমতা গুলি জন্মায়নি।