নানারকমের অবাস্তব কথা বাড়িয়ে অস্বস্তিতে ফেলার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই।
বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে রোগ ঢুকে পরল বলে, আমার কাজ জানানো। জানাচ্ছি।
গতকাল জানলাম, মিয়েপোয়া মানে ছাঁচিপেঁয়াজ, সেলারি, গাজর দিয়ে বানানো ফরাসি ফ্লেভার-বেস। তার আগের দিন জানলাম কালো মহাকাশের পরদার আড়ালে চোদ্দ বিলিয়ান বছর আগেকার বিগ-ব্যাঙ্গের মাইক্রো-ওয়েভ রেডিয়েশান গিজগিজ করছে, খালি চোখে দেখা যায় না। আমরা নাকি নিজেদের কনশাসনেসের অতিগোলকের মধ্যে আবদ্ধ, প্রতিটা কন্সেন্ট্রিক গোলক এক-একটি সময়সীমা।
আজ দুইদিন হল কাজের মাসি আসা শুরু করেছে। অফার করেছিলাম আমার বাড়িতেই এই দুর্দিনে থেকে যেতে, কিন্তু বর ইনফিডেলিটির সন্দেহে পেটাবে বলে সে থাকেনি। পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরে যাওয়া শ্রেয় মনে করেছে।
চোখে জল এসে গেছিল ওর হাতে বানানো হাঁসের ডিমের ঝাল, মুড়ি দিয়ে খেয়ে। দেশ বাড়ির কথা মনে পড়ছিল।
এই অব্দি পড়েছিলাম টেক্সটটা, মাকে জিজ্ঞেস করলে বলত, কদিনই-বা বাঁচব, অনেক পুরনো বন্ধু। স্ত্রী-বিয়োগের পর এত বছর একা আছে, আমাদের বয়েসে এত কিছু তো ছিলনা, তাই বেসিক যোগাযোগই মানুষকে জীবনবিমুখ হতে দেয়না। আমি মনে মনে এই দুই ষাটোর্ধের প্লেটোনিক আড্ডাকে এখন সমর্থন করি। কারণ বিবাহ এক অত্যন্ত প্রব্লেমাটিক ইন্সটিটিউশান এবং এই কনট্যেক্সটে মা এবং বাবার সোশাল-কন্সট্রাক্ট একেবারেই আলাদা। অবশ্য এইসব সেইসময়কার কথা যখন মা বাবা দুজনেই কথা বলতে পারতেন।
বছরের মাঝমাঝি থেকেই শীতের সেকেন্ড-ওয়েভের ভয়ে অবস্থাপন্নরা শহর ছেড়ে গ্রামে জমি-বাড়ি কেনা শুরু করে। সেই অজুহাতে গ্রাম-কে-গ্রাম শ্মশান হয়ে যেত, বেশিরভাগই হোম-আইসিইউ নেওয়ার মত অবস্থাপন্ন ছিলনা। বেঁচে ছিল চামার-কৈবর্তরা, অপরিসীম রোগের প্রকোপ সত্ত্বেও। হাজার হাজার বছরের জুতো-লাথি-অসম্মান, খালি পেট, রোগব্যাধি, দারিদ্র শরীরের কোশেকোশে সারভাইভালের অ্যালগরিদম তৈরি করে গ্যাছে। বাড়ির পেছনেই অকল্পনীয় দারিদ্রের মধ্যে চামারবস্তি ছিল। ওরা কেটেকুটে শুয়োরের গলা-কাঁধের মাংস আর এন্ট্রেলস দিয়ে যেত। মা সুন্দর করে মৌরীগুঁড়ো, কালোরসুন আর ঝাল মরিচ দিয়ে সসেজ বানিয়ে রোদে দিতেন। নুনের গদি ছিল দুরের জঙ্গলে। কেউ যেতনা সেখানে। গ্যাল বছরের কলেরার রোগীদের ড্রপিংস এখন নাকি সেখানের জল মাটিতে। যারা সেখানে ঘোরাফেরা করে তাঁরা নাকি সবাই মানুষ না। কেউ না কেউ তাঁদের মধ্যে ফিরে আসে গ্রামে পথ দেখাবার অজুহাতে। তারপর সেই গ্রাম আর গ্রাম থাকে না। কালো মেঘের মত রোগ পিছু নেয়। তাই তারা, নুনের মাইনাররা, তিন হপ্তার জন্যে জঙ্গল যায়, যতখানি পারে সংগ্রহ করে পশ্চিমপারের পীরবাবার আশ্রমে আরও দুহপ্তার কোয়ারেন্টাইনের জন্যে আসে, ওরা বলে পীরবাবা শ্মশানের ছাই আর জার্মানি থেকে আনা অ্যান্টিভাইরাল মেশান গুঁড়ো খাইয়ে কাবার দিকে মুখ করে এক প্রচণ্ড হুঙ্কার দেন।
মাদারচোদ আল্লা তোর মাকে চুদি এদের সবাইকে না সারালে। ইসলামের শুরু মা চুদে, শেষ মা চুদে। হিঁদুর শুরু মা চুদে, শেষ মা চুদে। গরিবের বাঁচার প্রোটকল ছিল টাকা।
আমাদের ঘরে এক প্রকাণ্ড ঠাকুরদালান ছিল। কোন পড়ন্ত জমিদারের বাইজির বাড়ি ছিল এটা। অবস্থা ঠিক করতে, বাবা আগে গিয়ে বসবাস করা শুরু করেন। আমি যাই বাবার সাথে। বাবা সকাল হতে কম্পিউটার নিয়ে কাজে বসতেন, বেলা বাড়লে আমাকে সাথে নিয়ে মিস্ত্রীদের তদারকিতে যেতেন। মিস্ত্রীরা আমাকে খেলার জন্যে গোসাপের চামড়ার একটা ডুবকি দিয়েছিল, বাজাতে পারতাম না, কিন্তু সারাক্ষণ বাজাতাম। বাবা বলতেন আমি ঘরে ঢোকার আগে ডুবকির চাপকারি ঘরে শোনা যাবে। সন্ধ্যে হলে বাবা পাতা গলাতেন আর মদ খেতেন। তখন সেই বাড়ির রিয়েলিটি বদলে যেত। তাণ্ডব করতেন সারা বাড়ি জুড়ে, অসংলগ্ন কথা একো করত প্রতিটা দেওয়ালে। সবকটা ঘর যদিও খোলা ছিলনা। কাবার দিকের ঘরটায় খোলার আমাদের চারজনের পরিবারের দরকার ছিলনা, সবাই বারণ করেছিল। কিন্তু বাবা একদিন সন্ধেবেলা অমানুষিক শক্তিতে লাথি মেরে দরজা ভাঙ্গেন। ঘরে আর কিছু নেই, দেওয়ালের পিঠে এক দৈত্যাকার আবলুশ-মেহগনি মেশানো গথিক আলমারি। চাবি নেই, হাঁহাঁ করা খালি অন্তঃস্থল। বাবা বললেন এই ধরনের কারপেন্ট্রি দেশ থেকে অবলুপ্ত হয়েছে একশো বছর হল। আয়না প্যারিসের থেকে আনা স্ফটিকের মত।
পরদিন ঘুম থেকে উঠে বাবা কে দেখলাম আলমারির সামনে মন্ত্রমুগ্ধের মত বসে আছেন। মুখে অপরিসীম শান্তির হাসি। আমি আমার জীবদ্দশায় এই শান্তি কোনদিন দেখিনি। অবাক হয়ে সামনে যেতে বুঝলাম তিনি অত্যন্ত নেশাগ্রস্থ, বাকশক্তি ঠিকঠাক নেই। নানারকমের শব্দ করছেন, মানে ব্যাতিত শব্দ। অতি কষ্টে বুঝলাম তিনি বলছেন মা ফোন করেছিল, আমি যেন কথা বলে নি। মাকে কলব্যাক করলাম। তাঁর বক্তব্য অত্যন্ত ডিটেলড। বাবা নাকি তাঁদের দীর্ঘ বিবাহিত জীবনের নানারকমের ভুল স্বীকার করেছেন, ক্ষমা চেয়েছেন। মা খুবই চিন্তিত বাবা নেশার মাত্রা বাড়িয়েছেন কিনা। আমি অসময় ফোন রেখে দিলাম।
দুপুরে খাওয়ার সময় দেখলাম বাবা সম্পূর্ণ রূপে কথা বলার শক্তি হারিয়েছেন। যাই বলা হোক না কেন তিনি অঙ্গভঙ্গি করে উত্তর দিচ্ছেন, এবং তাই নিয়ে তাঁর কোন অভিযোগ নেই।
সেই রাতে মিস্ত্রীদের সরদার এসে বললেন বাবাকে বাঁচাতে হলে আলমারির ঘরে না যেতে দিতে।
মা তাড়াহুড়ো করে এলেন বাবার খেয়াল নিতে। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে আসেপাশের ডাক্তার ডাকলেন। কোন রোগের ব্যাখ্যা পাওয়া গেল না। বাবা দুপুরে হাঁসার মাংস দিয়ে গুছিয়ে ভাত খেলেন। সন্ধ্যে বেলা নেশা না করে গিরিজা দেবীর গান চালালেন। যতোবার মার দিকে চাইলেন, প্রেমিকের মত করে চাইলেন। আমি রাতে মামারবাড়ি খেলতে গেলাম, রাতে লুচি, বেগুণ ভাজা, নলেন গুড় খেয়ে ওখানেই ঘুমালাম।
পরদিন সকালে এসে দেখলাম মার একইরকম ভাবে কথা হারিয়েছে। ভিতরে ঢুকে দেখলাম মা বাবা হাত ধরাধরি করে আলমারির ঘরে মাটিতে বসে আছে। একে অপরের চোখ মোছাচ্ছে। যেন আলমারির ভেতর থেকে অপার্থিব কোন শক্তি এসে বাবা-মায়ের থুতু দিয়ে জোড়া সংসারের কঠিন সমস্যাগুলো নিমেষেই সমাধান করছে, বদলে কথা বলার ক্ষমতা অপহরণ করে।
এরপর বহুবছর বাবা-মার কেউ কথা বলেননি। প্রায় এক দশক। মহামারি নিজের স্বভাবমতো জঙ্গলে ফিরে গেছে। অর্থনীতি চাঙ্গা হয়েছে। মৃত্যুহার কমেছে। কিন্তু মা-বাবার সংসার আরও মজবুত হয়েছে। বেসিক মিসোজিনিস্ট অসুবিধে গুলো চলে গ্যাছে, দুজনের মধ্যে অপূর্ব টিমগেম-এর সূচনা হয়েছে যা আমি কোনদিন দেখিনি। মা এখন অসম্ভব অনুগত বাবার, বাবা নেশা এবং নানারকমের নেশা সংক্রান্ত অবিবেচনা ত্যাগ করে মানুষের মত মানুষ হয়েছেন।
মহামারির অনেক দিন পর বাড়ি বেচার সূত্রে আমি গ্রামে ফিরি। আলমারি এখন বহাল ঘরের মাঝামাঝি, সূর্যের আলো নিভিয়ে। দরজা খুলে দেখি এক অদ্ভুত মায়া যেন বলছে আমি আলমারির মধ্যে জীবনের নিগূড় সত্য খুঁজে পাব। আমি তদ্দিনে জীবনের নানা অধ্যায় কাটিয়ে ডিরেকশানলেসনেস এক চরম সীমায় প্রতিনিয়ত কাটাই। আলমারির ডালা খুলে ভেতরে ঢুকে বসি। কাঁপা হাতে বন্ধ করি ডালা, ভেতর থেকে।
নিমেষে আলমারির ছাদ থেকে বৃষ্টির মত মানুষের হাড় পড়তে থাকে। খেয়াল করে দেখি, হাড়গুলি সবই উপরের চোয়াল বা নিচে চোয়ালের, কয়েকটি মাড়ি-দাঁত সুদ্ধু। কয়েকশো মানুষের জীবনের মূলধন হাওয়ায় উড়ে গেছে নিজেদের মধ্যে কথার অভাবে। আজ কোন অজানা শক্তিতে, না বলা কথা, সর্বশক্তিতে, সম্পর্কের ঘুণ পরিষ্কার করার মানসিকতা অপার্থিবভাবে সম্প্রচার করছে। পাঁক পরিষ্কার করার এক আনইন্টারপ্রিটেব্ল মেশিনারি।
মা-বাবার মৃত্যুর পর আলমারিটাকে বাড়ি নিয়ে আসি। দুঃখের বিষয়, আমার ব্যাক্তিগত সমস্যায় সে কোনদিন কোন সাহায্য করেনি। কয়েকবার তো আমি মনে মনে প্রার্থনাও করেছিলাম যাতে আমার বাকশক্তি চলে যায়।
আজ মনে হয় মানুষ নিজেদের অপারগতাকে বড্ড বেশি করে সুপারন্যাচারাল জিনিশের উপর প্রজেক্ট করে।