Saturday, August 1, 2020

আলমারি

নানারকমের অবাস্তব কথা বাড়িয়ে অস্বস্তিতে ফেলার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই।
বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে রোগ ঢুকে পরল বলে, আমার কাজ জানানো। জানাচ্ছি।
গতকাল জানলাম, মিয়েপোয়া মানে ছাঁচিপেঁয়াজ, সেলারি, গাজর দিয়ে বানানো ফরাসি ফ্লেভার-বেস। তার আগের দিন জানলাম কালো মহাকাশের পরদার আড়ালে চোদ্দ বিলিয়ান বছর আগেকার বিগ-ব্যাঙ্গের মাইক্রো-ওয়েভ রেডিয়েশান গিজগিজ করছে, খালি চোখে দেখা যায় না। আমরা নাকি নিজেদের কনশাসনেসের অতিগোলকের মধ্যে আবদ্ধ, প্রতিটা কন্সেন্ট্রিক গোলক এক-একটি সময়সীমা। 

আজ দুইদিন হল কাজের মাসি আসা শুরু করেছে। অফার করেছিলাম আমার বাড়িতেই এই দুর্দিনে থেকে যেতে, কিন্তু বর ইনফিডেলিটির সন্দেহে পেটাবে বলে সে থাকেনি। পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরে যাওয়া শ্রেয় মনে করেছে। 

চোখে জল এসে গেছিল ওর হাতে বানানো হাঁসের ডিমের ঝাল, মুড়ি দিয়ে খেয়ে। দেশ বাড়ির কথা মনে পড়ছিল। 


এই অব্দি পড়েছিলাম টেক্সটটা, মাকে জিজ্ঞেস করলে বলত, কদিনই-বা বাঁচব, অনেক পুরনো বন্ধু। স্ত্রী-বিয়োগের পর এত বছর একা আছে, আমাদের বয়েসে এত কিছু তো ছিলনা, তাই বেসিক যোগাযোগই মানুষকে জীবনবিমুখ হতে দেয়না। আমি মনে মনে এই দুই ষাটোর্ধের প্লেটোনিক আড্ডাকে এখন সমর্থন করি। কারণ বিবাহ এক অত্যন্ত প্রব্লেমাটিক ইন্সটিটিউশান এবং এই কনট্যেক্সটে মা এবং বাবার সোশাল-কন্সট্রাক্ট একেবারেই আলাদা। অবশ্য এইসব সেইসময়কার কথা যখন মা বাবা দুজনেই কথা বলতে পারতেন। 


বছরের মাঝমাঝি থেকেই শীতের সেকেন্ড-ওয়েভের ভয়ে অবস্থাপন্নরা শহর ছেড়ে গ্রামে জমি-বাড়ি কেনা শুরু করে। সেই অজুহাতে গ্রাম-কে-গ্রাম শ্মশান হয়ে যেত, বেশিরভাগই হোম-আইসিইউ নেওয়ার মত অবস্থাপন্ন ছিলনা। বেঁচে ছিল চামার-কৈবর্তরা, অপরিসীম রোগের প্রকোপ সত্ত্বেও। হাজার হাজার বছরের জুতো-লাথি-অসম্মান, খালি পেট, রোগব্যাধি, দারিদ্র শরীরের কোশেকোশে সারভাইভালের অ্যালগরিদম তৈরি করে গ্যাছে। বাড়ির পেছনেই অকল্পনীয় দারিদ্রের মধ্যে চামারবস্তি ছিল। ওরা কেটেকুটে শুয়োরের গলা-কাঁধের মাংস আর এন্ট্রেলস দিয়ে যেত। মা সুন্দর করে মৌরীগুঁড়ো, কালোরসুন আর ঝাল মরিচ দিয়ে সসেজ বানিয়ে রোদে দিতেন। নুনের গদি ছিল দুরের জঙ্গলে। কেউ যেতনা সেখানে। গ্যাল বছরের কলেরার রোগীদের ড্রপিংস এখন নাকি সেখানের জল মাটিতে। যারা সেখানে ঘোরাফেরা করে তাঁরা নাকি সবাই মানুষ না। কেউ না কেউ তাঁদের মধ্যে ফিরে আসে গ্রামে পথ দেখাবার অজুহাতে। তারপর সেই গ্রাম আর গ্রাম থাকে না। কালো মেঘের মত রোগ পিছু নেয়। তাই তারা, নুনের মাইনাররা, তিন হপ্তার জন্যে জঙ্গল যায়, যতখানি পারে সংগ্রহ করে পশ্চিমপারের পীরবাবার আশ্রমে আরও দুহপ্তার কোয়ারেন্টাইনের জন্যে আসে, ওরা বলে পীরবাবা শ্মশানের ছাই আর জার্মানি থেকে আনা অ্যান্টিভাইরাল মেশান গুঁড়ো খাইয়ে কাবার দিকে মুখ করে এক প্রচণ্ড হুঙ্কার দেন।
মাদারচোদ আল্লা তোর মাকে চুদি এদের সবাইকে না সারালে। ইসলামের শুরু মা চুদে, শেষ মা চুদে। হিঁদুর শুরু মা চুদে, শেষ মা চুদে। গরিবের বাঁচার প্রোটকল ছিল টাকা। 


আমাদের ঘরে এক প্রকাণ্ড ঠাকুরদালান ছিল। কোন পড়ন্ত জমিদারের বাইজির বাড়ি ছিল এটা। অবস্থা ঠিক করতে, বাবা আগে গিয়ে বসবাস করা শুরু করেন। আমি যাই বাবার সাথে। বাবা সকাল হতে কম্পিউটার নিয়ে কাজে বসতেন, বেলা বাড়লে আমাকে সাথে নিয়ে মিস্ত্রীদের তদারকিতে যেতেন। মিস্ত্রীরা আমাকে খেলার জন্যে গোসাপের চামড়ার একটা ডুবকি দিয়েছিল, বাজাতে পারতাম না, কিন্তু সারাক্ষণ বাজাতাম। বাবা বলতেন আমি ঘরে ঢোকার আগে ডুবকির চাপকারি ঘরে শোনা যাবে। সন্ধ্যে হলে বাবা পাতা গলাতেন আর মদ খেতেন। তখন সেই বাড়ির রিয়েলিটি বদলে যেত। তাণ্ডব করতেন সারা বাড়ি জুড়ে, অসংলগ্ন কথা একো করত প্রতিটা দেওয়ালে। সবকটা  ঘর যদিও খোলা ছিলনা। কাবার দিকের ঘরটায় খোলার আমাদের চারজনের পরিবারের দরকার ছিলনা, সবাই বারণ করেছিল। কিন্তু বাবা একদিন সন্ধেবেলা অমানুষিক শক্তিতে লাথি মেরে দরজা ভাঙ্গেন। ঘরে আর কিছু নেই, দেওয়ালের পিঠে এক দৈত্যাকার আবলুশ-মেহগনি মেশানো গথিক আলমারি। চাবি নেই, হাঁহাঁ করা খালি অন্তঃস্থল। বাবা বললেন এই ধরনের কারপেন্ট্রি দেশ থেকে অবলুপ্ত হয়েছে একশো বছর হল। আয়না প্যারিসের থেকে আনা স্ফটিকের মত। 

পরদিন ঘুম থেকে উঠে বাবা কে দেখলাম আলমারির সামনে মন্ত্রমুগ্ধের মত বসে আছেন। মুখে অপরিসীম শান্তির হাসি। আমি আমার জীবদ্দশায় এই শান্তি কোনদিন দেখিনি। অবাক হয়ে সামনে যেতে বুঝলাম তিনি অত্যন্ত নেশাগ্রস্থ, বাকশক্তি ঠিকঠাক নেই। নানারকমের শব্দ করছেন, মানে ব্যাতিত শব্দ। অতি কষ্টে বুঝলাম তিনি বলছেন মা ফোন করেছিল, আমি যেন কথা বলে নি। মাকে কলব্যাক করলাম। তাঁর বক্তব্য অত্যন্ত ডিটেলড। বাবা নাকি তাঁদের দীর্ঘ বিবাহিত জীবনের নানারকমের ভুল স্বীকার করেছেন, ক্ষমা চেয়েছেন। মা খুবই চিন্তিত বাবা নেশার মাত্রা বাড়িয়েছেন কিনা। আমি অসময় ফোন রেখে দিলাম। 


দুপুরে খাওয়ার সময় দেখলাম বাবা সম্পূর্ণ রূপে কথা বলার শক্তি হারিয়েছেন। যাই বলা হোক না কেন তিনি অঙ্গভঙ্গি করে উত্তর দিচ্ছেন, এবং তাই নিয়ে তাঁর কোন অভিযোগ নেই। 

সেই রাতে মিস্ত্রীদের সরদার এসে বললেন বাবাকে বাঁচাতে হলে আলমারির ঘরে না যেতে দিতে। 


মা তাড়াহুড়ো করে এলেন বাবার খেয়াল নিতে। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে আসেপাশের ডাক্তার ডাকলেন। কোন রোগের ব্যাখ্যা পাওয়া গেল না। বাবা দুপুরে হাঁসার মাংস দিয়ে গুছিয়ে ভাত খেলেন। সন্ধ্যে বেলা নেশা না করে গিরিজা দেবীর গান চালালেন। যতোবার মার দিকে চাইলেন, প্রেমিকের মত করে চাইলেন। আমি রাতে মামারবাড়ি  খেলতে গেলাম, রাতে লুচি, বেগুণ ভাজা, নলেন গুড়  খেয়ে ওখানেই ঘুমালাম। 


পরদিন সকালে এসে দেখলাম মার একইরকম ভাবে কথা হারিয়েছে। ভিতরে ঢুকে দেখলাম মা বাবা হাত ধরাধরি করে আলমারির ঘরে মাটিতে বসে আছে। একে অপরের চোখ মোছাচ্ছে। যেন আলমারির ভেতর থেকে অপার্থিব কোন শক্তি এসে বাবা-মায়ের থুতু দিয়ে জোড়া সংসারের কঠিন সমস্যাগুলো নিমেষেই সমাধান করছে, বদলে কথা বলার ক্ষমতা অপহরণ করে। 


এরপর বহুবছর বাবা-মার কেউ কথা বলেননি। প্রায় এক দশক। মহামারি নিজের স্বভাবমতো জঙ্গলে ফিরে গেছে। অর্থনীতি চাঙ্গা হয়েছে। মৃত্যুহার কমেছে। কিন্তু মা-বাবার সংসার আরও মজবুত হয়েছে। বেসিক মিসোজিনিস্ট অসুবিধে গুলো চলে গ্যাছে, দুজনের মধ্যে অপূর্ব টিমগেম-এর সূচনা হয়েছে যা আমি কোনদিন দেখিনি। মা এখন অসম্ভব অনুগত বাবার, বাবা নেশা এবং নানারকমের নেশা সংক্রান্ত অবিবেচনা ত্যাগ করে মানুষের মত মানুষ হয়েছেন।

  

মহামারির অনেক দিন পর বাড়ি বেচার সূত্রে আমি গ্রামে ফিরি। আলমারি এখন বহাল ঘরের মাঝামাঝি, সূর্যের আলো নিভিয়ে। দরজা খুলে দেখি এক অদ্ভুত মায়া যেন বলছে আমি আলমারির মধ্যে জীবনের নিগূড় সত্য খুঁজে পাব। আমি তদ্দিনে জীবনের নানা অধ্যায় কাটিয়ে ডিরেকশানলেসনেস এক চরম সীমায় প্রতিনিয়ত কাটাই। আলমারির ডালা খুলে ভেতরে ঢুকে বসি। কাঁপা হাতে বন্ধ করি ডালা, ভেতর থেকে। 


নিমেষে আলমারির ছাদ থেকে বৃষ্টির মত মানুষের হাড় পড়তে থাকে। খেয়াল করে দেখি, হাড়গুলি সবই উপরের চোয়াল বা নিচে চোয়ালের, কয়েকটি মাড়ি-দাঁত সুদ্ধু। কয়েকশো মানুষের জীবনের মূলধন হাওয়ায় উড়ে গেছে নিজেদের মধ্যে কথার অভাবে। আজ কোন অজানা শক্তিতে, না বলা কথা, সর্বশক্তিতে, সম্পর্কের ঘুণ পরিষ্কার করার মানসিকতা অপার্থিবভাবে সম্প্রচার করছে। পাঁক পরিষ্কার করার এক আনইন্টারপ্রিটেব্ল মেশিনারি। 


মা-বাবার মৃত্যুর পর আলমারিটাকে বাড়ি নিয়ে আসি। দুঃখের বিষয়, আমার ব্যাক্তিগত সমস্যায় সে কোনদিন কোন সাহায্য করেনি। কয়েকবার তো আমি মনে মনে প্রার্থনাও করেছিলাম যাতে আমার বাকশক্তি চলে যায়।


আজ মনে হয় মানুষ নিজেদের অপারগতাকে বড্ড বেশি করে সুপারন্যাচারাল জিনিশের উপর প্রজেক্ট করে।    


Wednesday, May 6, 2020

অ্যাস্ট্রনমিকাল অডস

হঠাৎ প্রচণ্ড মেঘগর্জনের শব্দ।

রিংপচে  দাঁড়িয়ে আছে ছাগল চড়ানোর রাস্তার শেষ প্রান্তে, এখান থেকে নিজের ঘর পর্যন্ত সারা রাতের হাঁটা পথ। কিন্তু সে কিছুতেই গাঁয়ে ফিরে যাবে না। তার মধ্যে সবাই শয়তানের ছায়া দেখতে পায়। সন্ধ্যের অন্ধকার মেশা ছাই-রঙ্গা বরফের লম্বা ফালি ফালি দাগ জঙ্গলময়। প্রবল তুষারপাতও কয়েকশো ফুটের ক্যানোপি ভেদ করে পুরোপুরি মাটিতে এসে জমা হতে পারেনি। আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে রিংপচে, অস্নাত, অভুক্ত, শীতে অসাড়। নীল মন্ত্রযান আঁকা ভারী টিউনিক থেকে শতাব্দী প্রাচীন তন্ত্রসাধনার অপ্রাকৃতিক গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পরছে। আকাশে সিঁদুরে রঙ। বেগুনী আভা।

মেয়েটির প্রথম মনে হল এয়ারক্রাফটের মধ্যে মেঘগর্জনের শব্দ শুনতে পাওয়ার কথা না। তাহলে কি লাস্ট টার্বুলেন্সের সময় কোথাও স্ট্রাকচারাল ড্যামেজ হয়েছে? ততক্ষণে পাইলটের আশ্বাসবাণী শোনা গ্যাল পিচ-কারেক্টেড স্পিকার থেকে। ডানার নিচে একটা ছোট গর্ত হয়েছে, চিন্তার কিছু নেই, সবাই অক্সিজেন মাস্ক ব্যাবহার করুন। মেয়েটির সীট ডানার সামনেই। টেনিস বলের সাইজের গর্ত তার আশেপাশের স্পেস- টাইম ডিস্টরট করে প্রবল শক্তিতে গিলে খাচ্ছে প্লেনের ভেতরকার রেফ্রিজারেটেড অক্সিজেন, সীটের পিছনে ভয়াবহ টান। জানলার ধারের দক্ষিনী মহিলাটি চিৎকার করে উঠতেই মেয়েটি গলা বাড়িয়ে দেখল বাঁদিকের ডানাটা ডাস্টবিনে মুড়িয়ে ফেলে দেওয়া ঠোঙ্গার মত দেখতে হয়ে গেছে। ছোট গর্ত তখন বল লাইটনিঙ্গের আকার ধারণ করেছে। শক্তি বেড়েছে বহুগুণ। আসন্ন মৃত্যুর মুখে দুশ ছাপ্পান্ন জন যাত্রীর সমবেত কলকাকলি, পাইলটের কথা, অ্যালার্মের শব্দ, মাইকের কানফাটানো ফিডব্যাক, অল্টিটিউড লুজ করার জন্যে কানে অসম্ভব ব্যাথা,   হঠাৎ সবকিছু ছাপিয়ে শোনা গ্যাল গাছবোমা ফাটার মত শব্দ, সীটবেল্ট খুলে ওঠার আগেই অতি অবহেলায় ডানাসহ, প্লেনের বাঁদিকের কিয়দংশ প্লাস্টিকের খেলনার মত টুকরো টুকরো হয়ে হাজার হাজার ফুট উঁচুতে পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়ল। 

ভারী তাঁবুর নিচে মেকশিফট বিছানায় ঘুমিয়ে ছেলেটি স্বপ্ন দেখছিল ফুটো প্যারাসুট নিয়ে সে অত্যন্ত সাবলীল ভাবে সমুদ্রগর্ভের দিকে ফ্রি-ফল করছে। প্রতি মুহূর্তের বর্ধিত গতিবেগের সাথে কি যেন এক অশালীন সখ্যতা, নিশ্চিত মৃত্যুর সাথেও। যদিও তাকে আজ অব্দি কক্ষনও বন্দুক চালাতে হয়নি। তার অসাধারণ ডকুমেন্টেশান স্কিলের কথা মাথায় রেখে কতৃপক্ষ তাকে রেডার যন্ত্রগুলির কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্সের কাজ দিয়েছে। কাজটির একটা বিশেষ স্ট্যাটিসটিকাল ধরন রয়েছে। যদি রেডার হঠাৎ আইডেন্টিফাই করে শত্রু এয়ারক্রাফটের আনাগোনা এবং সেটি যদি সত্য কিম্বা ফলস-অ্যালার্ম হয় তাহলে সেই পরিসংখ্যান অ্যাক্সেপটেব্ল, কিন্তু যদি সত্যিই অ্যাটাক হয় এবং রেডার যেটি যাচাই না করতে পারে সেটির ফল হয় ভয়াবহ। মৃত্যু ঘনিয়ে আসে, মেরে নিয়ে যায় কাতারে কাতারে। কদিন আগে ছেলেটি লক্ষ্য করেছিল, এক সপ্তাহ ধরে যদি প্রতিদিনের রেডারগুলির ট্রু-পজিটিভ/পসিটিভ আর ফলস-নেগেটিভের/নেগেটিভের অনুপাত নেওয়া যায়, এবং ইন্টারভালে প্লট করা যায়, তাহলে সেটি টেস্টিং এর পাওয়ারের তুলনায় অনেক কন্সিস্টেন্স স্কোর দিতে পারছে। তার এই আপাত আবিষ্কারের কথা কেউ বিশ্বাস করবেনা, এবং সে জানায়ওনি কাউকে। প্রতিদিন পঙ্গপালের ঝাঁকের মত ফাইটার প্লেন আসে, বোমা ফ্যালে নানা প্রান্তে, মেশিনগানের গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেয়। রোজ মৃত্যুর হিসেব করা হয় শেষ রাতে, ক্ষয়ক্ষতির হিসেব করা হয়। সেই মিটিঙে ছেলেটির রেডার মেশিন যাচাই করার ইম্পেকেব্ল রেকর্ডের রোজ প্রশংসা করা হয়। রোজ শবদেহ বয়ে নিয়ে যেতে হয়, সে ফিরে এসে মন দেয় গ্রাফ পেপারে। রেডারের অ্যাকিউরেসি মাপে আর ভাবে এই দৈত্যাকার অসঙ্গত প্যাটার্নলেস ইউনিভারসে বেঁচে থাকার অ্যাস্ট্রনমিকাল অডসের কথা। তখনই এক প্রচণ্ড শব্দে সে সংজ্ঞা হারায়। 

সব শব্দ থেমে গেছিল কয়েক মুহূর্তের জন্যে প্লেন থেকে ছিটকে পড়ার পর, শূন্য দিয়ে নক্ষত্রবেগে নিচে পড়ার সময়কার ঊর্ধ্বমুখী শৈত্যপ্রবাহে হুঁশ ফিরল মেয়েটির। চোখদুটো যেন মুখ থেকে ফেটে বেরিয়ে আসতে চায়। সম্বিত ফিরতে মেয়েটি ভাবল, বাঁচার আশা নেই। সীটশুদ্ধ বেল্ট লাগানো অবস্থায় চেয়ারে বসে বসেই সে মাইলখানেক নিচের আণবিক পাহার, জঙ্গল ঘর বাড়ির দিকে ধেয়ে চলেছে। মেয়েটি প্লেনে উঠে নতুন শহরে রিলোকেট করতে করতেই ভাবছিল যদি প্রাক্তন সম্পর্কটাকে একটু বোঝাবুঝি করে ঠিক করে নেওয়া যেত, যদি সে শেষ বেলায় এত ঝগড়া না করত তাহলে হয়ত সব ঠিক হয়ে যেত, প্রেমিকের মিসোজিনিস্টিক সমস্যা গুলোকে ছোট করে দেখে যদি সামগ্রিক বিগার পিকচার টা দেখত তাহলে ম্যাডেনিং ঝগড়া, ছাড়াছাড়ি, শহর ছেড়ে পালান কিছুই দরকার পরতনা। তারপরেই নিজের দুর্বলতার উপর অসম্ভব রাগ হয়েছিল তার। মনে হয়েছিল অনেক অনেক সস্তার হুইস্কি খেয়ে সারারাত বমি করলে হয়ত এই ওভারহয়েল্মিং দুঃখ কিছুটা কমবে। 
যদিও শূন্য দিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ধেয়ে যেতে যেতে তার এইসব কিছুই মনে আসেনি। 

রিংপচে দুটো স্বপ্ন প্রায়েই দেখত। একটায় সে সত্যিকারের দুঃখ, রোগব্যাধি, দারিদ্র, জরা জয় করে এক ইউটপিয়া তৈরি করেছে। অন্যটি হল সে এক পাহাড়ের গুহায় অন্ধকারের সাথে মিশে যাচ্ছে, শত চেষ্টা সত্ত্বেও সে পেছন ফিরে গুহা থেকে পালাতে পারছেনা। বেগুনী আভার দিকে হেঁটে যেতে যেতে তার মনে হল আজ হেস্তনেস্ত হবে। আজ এস্পার নয় ওস্পার। মৃত্যু বা নতুন কিছু।

পাহাড় ফাঁক হয়ে এক অজানা পৃথিবী দেখা যাচ্ছিল। রিংপচের আশপাশ দিয়ে দলেদলে রেড পাণ্ডা নিঃশব্দে সেই দুনিয়ার দিকে চলে যাচ্ছিল। নতুন পৃথিবীর অস্পর্শিত, অচেনা, গাছপালা, মাঠ, নদী, পাহাড়, পশুপাখি, রূপ, রস, গন্ধ, বর্ণ এক অবর্ণনীয় আনন্দে ভরিয়ে তুলল রিংপচেকে। 
সে অস্ফুটে বলে উঠল, 
"বে-ইয়ুল! সাংরি-লা!"
তিরিশ ফুট গাছগাছালি ভেদ করে অক্ষত অবস্থায় মেয়েটি মাটিতে পৌঁছে, অপ্রকৃতিস্থতা, অসম্ভব হাতপা কাঁপা আর অ্যাড্রিনালিন রাসের অগ্নুৎপাত কাটিয়ে সামনে তাকিয়ে দেখল এক সম্পূর্ণ অচেনা সভ্যতা তার চোখের সামনে। ছেলেটি সারা শরীরে ব্যান্ডেজ নিয়ে হেলিকপ্টারের খোলা দরজা দিয়ে একটি মাত্র অক্ষত চোখ দিয়ে তাকিয়ে দেখল তারা পার্ল হারবার থেকে নক্ষত্রবেগে পালাচ্ছে, এমন এক সভ্যতার দিকে যা সে বহুদিন হল ভুলেই গ্যাছে।