হঠাৎ প্রচণ্ড মেঘগর্জনের শব্দ।
রিংপচে দাঁড়িয়ে আছে ছাগল চড়ানোর রাস্তার শেষ প্রান্তে, এখান থেকে নিজের ঘর পর্যন্ত সারা রাতের হাঁটা পথ। কিন্তু সে কিছুতেই গাঁয়ে ফিরে যাবে না। তার মধ্যে সবাই শয়তানের ছায়া দেখতে পায়। সন্ধ্যের অন্ধকার মেশা ছাই-রঙ্গা বরফের লম্বা ফালি ফালি দাগ জঙ্গলময়। প্রবল তুষারপাতও কয়েকশো ফুটের ক্যানোপি ভেদ করে পুরোপুরি মাটিতে এসে জমা হতে পারেনি। আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে রিংপচে, অস্নাত, অভুক্ত, শীতে অসাড়। নীল মন্ত্রযান আঁকা ভারী টিউনিক থেকে শতাব্দী প্রাচীন তন্ত্রসাধনার অপ্রাকৃতিক গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পরছে। আকাশে সিঁদুরে রঙ। বেগুনী আভা।
রিংপচে দাঁড়িয়ে আছে ছাগল চড়ানোর রাস্তার শেষ প্রান্তে, এখান থেকে নিজের ঘর পর্যন্ত সারা রাতের হাঁটা পথ। কিন্তু সে কিছুতেই গাঁয়ে ফিরে যাবে না। তার মধ্যে সবাই শয়তানের ছায়া দেখতে পায়। সন্ধ্যের অন্ধকার মেশা ছাই-রঙ্গা বরফের লম্বা ফালি ফালি দাগ জঙ্গলময়। প্রবল তুষারপাতও কয়েকশো ফুটের ক্যানোপি ভেদ করে পুরোপুরি মাটিতে এসে জমা হতে পারেনি। আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে রিংপচে, অস্নাত, অভুক্ত, শীতে অসাড়। নীল মন্ত্রযান আঁকা ভারী টিউনিক থেকে শতাব্দী প্রাচীন তন্ত্রসাধনার অপ্রাকৃতিক গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পরছে। আকাশে সিঁদুরে রঙ। বেগুনী আভা।
মেয়েটির প্রথম মনে হল এয়ারক্রাফটের মধ্যে মেঘগর্জনের শব্দ শুনতে পাওয়ার কথা না। তাহলে কি লাস্ট টার্বুলেন্সের সময় কোথাও স্ট্রাকচারাল ড্যামেজ হয়েছে? ততক্ষণে পাইলটের আশ্বাসবাণী শোনা গ্যাল পিচ-কারেক্টেড স্পিকার থেকে। ডানার নিচে একটা ছোট গর্ত হয়েছে, চিন্তার কিছু নেই, সবাই অক্সিজেন মাস্ক ব্যাবহার করুন। মেয়েটির সীট ডানার সামনেই। টেনিস বলের সাইজের গর্ত তার আশেপাশের স্পেস- টাইম ডিস্টরট করে প্রবল শক্তিতে গিলে খাচ্ছে প্লেনের ভেতরকার রেফ্রিজারেটেড অক্সিজেন, সীটের পিছনে ভয়াবহ টান। জানলার ধারের দক্ষিনী মহিলাটি চিৎকার করে উঠতেই মেয়েটি গলা বাড়িয়ে দেখল বাঁদিকের ডানাটা ডাস্টবিনে মুড়িয়ে ফেলে দেওয়া ঠোঙ্গার মত দেখতে হয়ে গেছে। ছোট গর্ত তখন বল লাইটনিঙ্গের আকার ধারণ করেছে। শক্তি বেড়েছে বহুগুণ। আসন্ন মৃত্যুর মুখে দুশ ছাপ্পান্ন জন যাত্রীর সমবেত কলকাকলি, পাইলটের কথা, অ্যালার্মের শব্দ, মাইকের কানফাটানো ফিডব্যাক, অল্টিটিউড লুজ করার জন্যে কানে অসম্ভব ব্যাথা, হঠাৎ সবকিছু ছাপিয়ে শোনা গ্যাল গাছবোমা ফাটার মত শব্দ, সীটবেল্ট খুলে ওঠার আগেই অতি অবহেলায় ডানাসহ, প্লেনের বাঁদিকের কিয়দংশ প্লাস্টিকের খেলনার মত টুকরো টুকরো হয়ে হাজার হাজার ফুট উঁচুতে পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়ল।
ভারী তাঁবুর নিচে মেকশিফট বিছানায় ঘুমিয়ে ছেলেটি স্বপ্ন দেখছিল ফুটো প্যারাসুট নিয়ে সে অত্যন্ত সাবলীল ভাবে সমুদ্রগর্ভের দিকে ফ্রি-ফল করছে। প্রতি মুহূর্তের বর্ধিত গতিবেগের সাথে কি যেন এক অশালীন সখ্যতা, নিশ্চিত মৃত্যুর সাথেও। যদিও তাকে আজ অব্দি কক্ষনও বন্দুক চালাতে হয়নি। তার অসাধারণ ডকুমেন্টেশান স্কিলের কথা মাথায় রেখে কতৃপক্ষ তাকে রেডার যন্ত্রগুলির কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্সের কাজ দিয়েছে। কাজটির একটা বিশেষ স্ট্যাটিসটিকাল ধরন রয়েছে। যদি রেডার হঠাৎ আইডেন্টিফাই করে শত্রু এয়ারক্রাফটের আনাগোনা এবং সেটি যদি সত্য কিম্বা ফলস-অ্যালার্ম হয় তাহলে সেই পরিসংখ্যান অ্যাক্সেপটেব্ল, কিন্তু যদি সত্যিই অ্যাটাক হয় এবং রেডার যেটি যাচাই না করতে পারে সেটির ফল হয় ভয়াবহ। মৃত্যু ঘনিয়ে আসে, মেরে নিয়ে যায় কাতারে কাতারে। কদিন আগে ছেলেটি লক্ষ্য করেছিল, এক সপ্তাহ ধরে যদি প্রতিদিনের রেডারগুলির ট্রু-পজিটিভ/পসিটিভ আর ফলস-নেগেটিভের/নেগেটিভের অনুপাত নেওয়া যায়, এবং ইন্টারভালে প্লট করা যায়, তাহলে সেটি টেস্টিং এর পাওয়ারের তুলনায় অনেক কন্সিস্টেন্স স্কোর দিতে পারছে। তার এই আপাত আবিষ্কারের কথা কেউ বিশ্বাস করবেনা, এবং সে জানায়ওনি কাউকে। প্রতিদিন পঙ্গপালের ঝাঁকের মত ফাইটার প্লেন আসে, বোমা ফ্যালে নানা প্রান্তে, মেশিনগানের গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেয়। রোজ মৃত্যুর হিসেব করা হয় শেষ রাতে, ক্ষয়ক্ষতির হিসেব করা হয়। সেই মিটিঙে ছেলেটির রেডার মেশিন যাচাই করার ইম্পেকেব্ল রেকর্ডের রোজ প্রশংসা করা হয়। রোজ শবদেহ বয়ে নিয়ে যেতে হয়, সে ফিরে এসে মন দেয় গ্রাফ পেপারে। রেডারের অ্যাকিউরেসি মাপে আর ভাবে এই দৈত্যাকার অসঙ্গত প্যাটার্নলেস ইউনিভারসে বেঁচে থাকার অ্যাস্ট্রনমিকাল অডসের কথা। তখনই এক প্রচণ্ড শব্দে সে সংজ্ঞা হারায়।
সব শব্দ থেমে গেছিল কয়েক মুহূর্তের জন্যে প্লেন থেকে ছিটকে পড়ার পর, শূন্য দিয়ে নক্ষত্রবেগে নিচে পড়ার সময়কার ঊর্ধ্বমুখী শৈত্যপ্রবাহে হুঁশ ফিরল মেয়েটির। চোখদুটো যেন মুখ থেকে ফেটে বেরিয়ে আসতে চায়। সম্বিত ফিরতে মেয়েটি ভাবল, বাঁচার আশা নেই। সীটশুদ্ধ বেল্ট লাগানো অবস্থায় চেয়ারে বসে বসেই সে মাইলখানেক নিচের আণবিক পাহার, জঙ্গল ঘর বাড়ির দিকে ধেয়ে চলেছে। মেয়েটি প্লেনে উঠে নতুন শহরে রিলোকেট করতে করতেই ভাবছিল যদি প্রাক্তন সম্পর্কটাকে একটু বোঝাবুঝি করে ঠিক করে নেওয়া যেত, যদি সে শেষ বেলায় এত ঝগড়া না করত তাহলে হয়ত সব ঠিক হয়ে যেত, প্রেমিকের মিসোজিনিস্টিক সমস্যা গুলোকে ছোট করে দেখে যদি সামগ্রিক বিগার পিকচার টা দেখত তাহলে ম্যাডেনিং ঝগড়া, ছাড়াছাড়ি, শহর ছেড়ে পালান কিছুই দরকার পরতনা। তারপরেই নিজের দুর্বলতার উপর অসম্ভব রাগ হয়েছিল তার। মনে হয়েছিল অনেক অনেক সস্তার হুইস্কি খেয়ে সারারাত বমি করলে হয়ত এই ওভারহয়েল্মিং দুঃখ কিছুটা কমবে।
যদিও শূন্য দিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ধেয়ে যেতে যেতে তার এইসব কিছুই মনে আসেনি।
রিংপচে দুটো স্বপ্ন প্রায়েই দেখত। একটায় সে সত্যিকারের দুঃখ, রোগব্যাধি, দারিদ্র, জরা জয় করে এক ইউটপিয়া তৈরি করেছে। অন্যটি হল সে এক পাহাড়ের গুহায় অন্ধকারের সাথে মিশে যাচ্ছে, শত চেষ্টা সত্ত্বেও সে পেছন ফিরে গুহা থেকে পালাতে পারছেনা। বেগুনী আভার দিকে হেঁটে যেতে যেতে তার মনে হল আজ হেস্তনেস্ত হবে। আজ এস্পার নয় ওস্পার। মৃত্যু বা নতুন কিছু।
পাহাড় ফাঁক হয়ে এক অজানা পৃথিবী দেখা যাচ্ছিল। রিংপচের আশপাশ দিয়ে দলেদলে রেড পাণ্ডা নিঃশব্দে সেই দুনিয়ার দিকে চলে যাচ্ছিল। নতুন পৃথিবীর অস্পর্শিত, অচেনা, গাছপালা, মাঠ, নদী, পাহাড়, পশুপাখি, রূপ, রস, গন্ধ, বর্ণ এক অবর্ণনীয় আনন্দে ভরিয়ে তুলল রিংপচেকে।
পাহাড় ফাঁক হয়ে এক অজানা পৃথিবী দেখা যাচ্ছিল। রিংপচের আশপাশ দিয়ে দলেদলে রেড পাণ্ডা নিঃশব্দে সেই দুনিয়ার দিকে চলে যাচ্ছিল। নতুন পৃথিবীর অস্পর্শিত, অচেনা, গাছপালা, মাঠ, নদী, পাহাড়, পশুপাখি, রূপ, রস, গন্ধ, বর্ণ এক অবর্ণনীয় আনন্দে ভরিয়ে তুলল রিংপচেকে।
সে অস্ফুটে বলে উঠল,
"বে-ইয়ুল! সাংরি-লা!"
তিরিশ ফুট গাছগাছালি ভেদ করে অক্ষত অবস্থায় মেয়েটি মাটিতে পৌঁছে, অপ্রকৃতিস্থতা, অসম্ভব হাতপা কাঁপা আর অ্যাড্রিনালিন রাসের অগ্নুৎপাত কাটিয়ে সামনে তাকিয়ে দেখল এক সম্পূর্ণ অচেনা সভ্যতা তার চোখের সামনে। ছেলেটি সারা শরীরে ব্যান্ডেজ নিয়ে হেলিকপ্টারের খোলা দরজা দিয়ে একটি মাত্র অক্ষত চোখ দিয়ে তাকিয়ে দেখল তারা পার্ল হারবার থেকে নক্ষত্রবেগে পালাচ্ছে, এমন এক সভ্যতার দিকে যা সে বহুদিন হল ভুলেই গ্যাছে।
No comments:
Post a Comment