Sunday, November 5, 2017

বিয়েবাড়ি

(১)
কলিং বেলের শব্দে মুহূর্তের মধ্যে দরজা খুলেই মা জিজ্ঞেস করল, 'কি হল বলত মেয়েটার?' 
বাবা নক্ষত্রবেগে জুতো মোজা খুলতে খুলতে বলল, 'সাস্পেক্টেড ইলোপ। সেজদি কান্নাকাটি করে অজ্ঞান হয়ে গ্যাছে।'
দাদা তখন স্কুলে, আমার ইররেগুলার পিরিয়ড চলছিল বলে স্কুল যাইনি। হাঁ করে দেখলাম বাবা একটা চুরুট ধরিয়ে বলল, 'জলধর কে ফোন করে দিয়েছি, ও দুদিন বাড়ি পাহারা দেবে।'
এই জলধর আমার বাবার পিওন, মাঝে মাঝে বাড়ির কাজ করে দিত। বাবার সুব্যাবহার আর উপরি মাইনের জন্যে। পরিবারেরই অংশ হয়ে গেছিল। নদীয়ার গ্রাম থেকে আমাদের জন্যে থোড়টা, পেঁপেটা, ধেনো চিংড়ীটা এনে দিত। বাবা রেলের সিভিলবাবু, অফিস মেট্রোভবনে, সন্ধেবেলা ডেকারস লেনে চিত্তদার দোকানে দু ঘণ্টা আড্ডা মেরে ফেরার মানুষটি দুপুর তিনটেয় বাড়িতে, আমি ঘটনার গ্র্যাভিটিটা বোঝার চেষ্টা করতে করতেই, মা শাড়ি পড়ে এলো। মা বলত চিত্তদা খাবারে আফিম মেশায়, নাহলে এত আঠা কিসের?!

                                                                                (২) 
কুড়ি মিনিটের মধ্যে আমরা ট্যাক্সিতে, দাদাকে সাউথ পয়েন্ট স্কুল থেকে উঠিয়ে সোজা দেশপ্রিয় পার্ক। সেজপিসির বাড়ি।
বাড়িতে তখন প্যান্ডিমনিয়াম।
বড়পিসি বাল বিধবা, উচ্চশিক্ষিত কিন্তু গোঁড়া ব্রাহ্মণ। হিটলারের মত মেজাজ।
সেজপিসেমশাই আর তার পরিবারের বাকি ছেলেরা বৈঠকখানায় চায়ের কাপের পাহাড় আর
চুরুট, সিগারেটের ধোঁয়ায় ঘর অন্ধকার করে দিয়েছে।
বড়রা কর্তব্যপরায়ণ হয়ে পুলিশে খবর দিয়েছে, থানার লোক এসে ছবি নিয়ে গ্যাছে।
সবাই এই আলোচনাই করছে যে ছেলেটিকে পেলে কি কি রকম বিচিত্র পদ্ধতিতে শাস্তি দেওয়া যায় আর কার কত রকম পলিটিকাল কানেকশান আছে।
বাড়ির বউরা হিস্টেরিকালি ক্রন্দনরত সেজপিসিকে যত্নআত্তি করার চেষ্টা করছে।
ছুঁড়িরা মুখ টিপে হাসছে, আর কেউ এলেই গম্ভীর হয়ে বলছে, আহারে দেবযানী কতই না কষ্ট পাচ্ছে এখন।
আর, আমরা বাচ্চারা অনেকদিন বাদে, স্কুল-আফিস-নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির ব্যাস্ততা কাটিয়ে সব দাদাদিদিরা একসাথে হয়ে পরমানন্দে ক্যালব্যালানির অলিম্পিক লাগিয়ে দিয়েছি।
আমার মায়ের শ্বশুরবাড়ির দিক, তিনি ভীষণ ব্যাস্ততায় কার কি লাগবে তার ফেসিলিটেটর হয়ে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছেন, দাদারা কি-খাব কি-খাব করছে, আমি বারান্দা দিয়ে দেখলাম ছোটপিসির গাড়ি বাড়ির লাগোয়া ফুটপাতে এসে দাঁড়াল। 

                                                                                  

(৩) 
ছোটপিসি জাঁদরেল মহিলা, ইকনমিক্সের টিচার, এসেই ঘোষণা করল, 'বাচ্চাগুলোকে বিকেলবেলা কিছু খেতে দিসনি? তোরা ক্যামন মানুষ?' বলেই আমাদের লাইন করে নিয়ে গিয়ে চিকেনরোলএর হরিরলুট চলল। শেষ বিকেলে থানার বড়বাবু এসে বললেন, 
- 'দেখুন এরা তো অ্যাডাল্ট, আমাদের বিশেষ এক্তিয়ার নেই স্বেচ্ছায় পালিয়ে গেলে।'
বাড়িতে চাপা গর্জন উঠল। 
- 'ভদ্রবাড়িতে মেয়ে পালায়?! হ্যাঁ?! জানেন আমাদের কত লোকে চেনে? আমার ছোটোছেলে সলিলদার সাথে সুর করে বোম্বাই তে, এইতো সেদিন শ্যামল (মিত্র, গায়ক) আর দিনেন (দাস, সিপিএমের হুব্বা জননেতা, ইন্টেলেকচুয়াল) এসে চা খেয়ে গ্যাল!' 
মা-বাবারা তখন হয়ত বোঝেননি, পার্টির প্রথম দিনগুলতে এঁরা বেশিরভাগ-ই ছিলেন অত্যন্ত গরিব, এবং পার্টির কালচারালের সাথে হেড ব্যুরোর সদ্ভাব ছিলনা একেবারেই। 
বড়পিসি ধমকে উঠে বললেন, 'আপনার মেয়ে পালিয়ে গেলে?!'
বড়বাবু ঢোঁক গিলে বললেন, 'দেখুন, আমি রুটিন কাজগুলো সেরে রাখি, আপনারা যখন জানতেনই যে এরকম ঘটার প্রপেন্সিটি আছে তো প্রিকশাস হতে পারতেন, এখন দুজনে পালিয়ে গেলে আমাদের হাত-পা বাঁধা।'
ইতিমধ্যে বাড়ির সামনে একটি বড় অস্টিন গাড়ি এসে দাঁড়াল। ভেতর থেকে নামলেন জিনস শার্ট পরিহিত শ্বশুর, ছিমছাম শাড়ি পরা শাশুড়ি আর দেবযানী ও তার দেবকুমার। 
বাড়ির ছেলেরা তড়বড় করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গাজোয়ারির প্রসঙ্গ উত্থাপন করার আগের মুহূর্তে শ্বশুরমশাই আত্মপরিচয় দিতে শুরু করলেন, তিনি জানতেন চিন-যুদ্ধ অপেক্ষা করে আছে ওখানে তার জন্যে।
দেবকুমারের সাথে আলাপ স্কুলের সামনেই, একটু একটু করে অনেকদিন ধরে, দেবকুমার তখন পরা শেষ করে ওয়েল করপরেশানে চাকরিতে ঢুকেছে। নেহাতই কোন কারণ ছিল না পালাবার, শুধুমাত্র পেরেন্টাল ইগো অ্যাভএড করা ছাড়া।
দেবযানী জানত ও অঙ্ক পরীক্ষা ভাল দেয়নি। এটাও জানত যে আজ ও যেটা করতে চলেছ তাতে পরিবারের বৃক্ষতন্তুতে অ্যাটমবম্ব পরবে। লেখাপড়ায় ব্রিলিয়ান্ট, লক্ষ্মী ঠাকুরের মুখ কেটে বসান এইটুকুন মেয়ে টুয়েলভের বোর্ডস দিয়েই বাথরুমে গিয়ে শাড়ি পরবে, অশোকা হলের বাইরেই গাড়িতে দেবকুমারের বাবা-মা বসে আছেন, এখান থেকে সোজা দক্ষিণেশ্বর, তারপর মালাবদল। তারপর সন্ধেবেলা সদলবলে বাড়ি গিয়ে মা-বাবার পায়ে ডাইভ। 

(৪)
ভিড় ঠেলে বড়পিসি বেরিয়ে এলেন, এসেই বললেন,' কুটুম বাড়ি এসেছে কিছু মিষ্টি আন, এখানে আর গোল করিসনে, যা ভেতরে যা।'
বড়পিসির ওপরে কথা বলে এমন লোক সেই মুহূর্তে আমাদের পরিবারে কেউ বেঁছে ছিলনা। তিনি মুখ লুকিয়ে বললেন, 'ছেমড়ি পালিয়ে বে করেছে, বেশ করেছে, আমার মত অ্যাট-বছরে বে হবার থেকে অনেক ভাল।'
দেখলাম, পরিবারের অনেক মহিলার মুখে একটা অন্যরকম আলো। যেই আলোটার নাম 'হুরররররে...!'
বাবা এতক্ষণ কথা বলেননি, বললেন, 'তাহলে বিয়েবাড়িটা...'
- 'হ্যাঁ হ্যাঁ! সেই নিয়েই তো কথা বলার! একটু যদি চা হত...'
গোটা তিরিশেক লোক চুপচাপ সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গ্যাল। শুরু হল চায়ের ঝর্না আর দেখা গ্যাল চুরুটের মেঘ।

Tuesday, August 22, 2017

হেয়ার ড্রায়ার

বৃহস্পতিবার সন্ধেয় অফিস পাড়ার ডিমারটে এত ভীড় হওয়ার কথা ছিল না। ভেতরে ঢুকে বুঝলাম স্পেশাল সেল চলছে খাদ্যদ্রব্যের।
জুলাইয়ের হাল্কা বৃষ্টিতে ঠাণ্ডা ভাব সত্ত্বেও আমার সাউথ বম্বের কন্সুমারিস্ট বলিউডি টিনেজারের মত জামার উপর শার্ট পড়ে আশার কোন কারণ ছিল না। কিন্তু আমার উদ্দেশ্যই অন্য আজ।
আজ - আমি শিকারে এসেছি।
মাসকাবারি বাজারের সাথে আমি আজ চুরি করব।
ধরা পরার কোন প্রশ্নই নেই কারণ
ডিমারটের টেকনোলজির দৌড় কদ্দুর সেটা আমার গত মাসেই রিসার্চ করা হয়ে গ্যাছে। ছোট জিনিসের বারকোড ঘসে দেব। বড় জিনিস বাজারের সিল করা ব্যাগে শিল্পীর দক্ষতায় ঢোকাব। নতুন জুতো ট্যাগ ছিঁড়ে পড়ে নেব।
এনিমি-লাইন্সের পারে কোন ধুরন্ধর-ই একা যায়না। আজকের মিশানে আমার তিন কমরেড আমার সাথে। অনুব্রত, ইঞ্জিনিয়ারিঙের সহপাঠী, ফেসবুকের চারহাজারি ফটোগ্রাফি পেজের মালিক, সাউথ পয়েন্টের বেয়াড়া রাম ঠ্যাঙ্গানে ছেলেদের মধ্যে নামকরা। শিবাঙ্গি, আগ্রার আধ-বানিয়া আধ-পাঞ্জাবি, তীক্ষ্ণ-বুদ্ধি, ম্যানিক ডিপ্রেশিভ আর দিল্লী-ইউপির দূরপাল্লার ট্রাকড্রাইভারের মত অ্যালকোহল টলারেন্স। আর মহুল, ইঞ্জিনিয়ারিঙের জুনিয়র, অপূর্ব সুন্দরী, খুবই প্রশংসিত নৃত্যশিল্পী আর দিবারাত্র ইমোস্যানালি আন্সটেবল।  
সকলেই অফিস থেকে ফিরে একসাথে জড়ো হয়ে কয়েকটা ভডকা সটস নিয়ে নিজদের মধ্যবিত্ত ইনহিবিশান কাটিয়েছি। আমি আর মহুল একটা আখাম্বা আইফেল টাওয়ারের মত বড় জয়েন্ট ফুঁকে স্থান-কাল-পাত্র জ্ঞান টা হারিয়েছি। তারপর বৃষ্টি কাটিয়ে অটো নিয়ে হিঞ্জেওারি এসেছি শুধুমাত্র মাসকাবারি করতে নয়। নিজেদের ডিসগাস্টিংলি বোরিং, অপ্রাপ্তি ও অপ্রাচুর্য সম্পন্ন মিডিওকার জীবনে একটু অ্যাডভেঞ্চার আনতে। অ্যাটলিস্ট, আমার অজুহাত তাই ছিল, বাকিদের আমি জিজ্ঞেস করিনি তাদের অধঃপতনের কারণ সম্পর্কে।
ডিমারটে ঢুকেই সবাই অচেনা মত করে এনিমি টেরেনে ছড়িয়ে পরলাম।
প্রত্যেকের কিছু নিজস্বতা ছিল চুরির।

শিবাঙ্গি, অসংখ্য জামাকাপড়ের লেয়ার পড়ে ঢুকে পড়ত বাথ, সানিটাইজেশান আর কস্মেটিক্স সেকশানে। প্রত্যেকের প্রয়োজন ও সাজুস্য অনুসারে সাবান, লোশান, শ্যাম্পু, লুফা, সেভিং কিট, হেয়ার রিমুভিং ইউটিলিটি, মেকাপ্স, তোয়ালে এমনকি রাজকাপুর বাথরোব অব্দি সে চুরি করেছে অনায়াসে।

অনুব্রত, একটু ভারি চেহারার, বেশি জিনিস তুলতে পারতনা, তাই সে স্পেলালাইজ করত ছোট আর দামি জিনিসে, একবার সে আমাদের কমইউনাল সংসারের জন্যে বিভিন্ন ফ্লেভারের কুড়ি টা স্যুপের প্যাকেট, ডজন খানেক কনডমের প্যাকেট আর সাত টা পেনড্রাইভ এনেছিল।
একমাত্র মহুল ছিল আনপ্রেডিক্টেবল।  ছোটবেলায় জেইল্ড অ্যাব্রডে দেখেছিলাম ড্রাগ-স্মাগলারেরা নিজেদের শরীরে গুপ্ত স্কিন-পকেট তৈরি করে আমরা ভাবতাম মহুলও বোধহয় অমনিই। আমাদের মধ্যে একমাত্র ওই ধরা পরেছিল, ব্যাঙ্গালরে, কারণ অত্যন্ত বেশি জিনিস জামাকাপড়ে লুকিয়ে, হাপুস-নয়নে, হাত-পা ছুঁড়ে ফোনে বয়ফ্রেন্ডের সাথে ঝগড়া করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়ে। ক্ষতিপূরণ দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে আনায় তার বন্ধুরা। এখন অবশ্য ব্যাঙ্গালর আর সেই বয়ফ্রেন্ড দুজনকেই কাটিয়ে পুনেতে চাকরি করছে। একা একা থাকে, শহরের মধ্যে থেরাপিস্ট দেখিয়ে আসে প্রতি শুক্রবার আর এসেই বলে, 'দ্বইপা মদ ঢালো'।
এরা প্রত্যেকেই নিজেদের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত চোরাগোপ্তা কাউন্টার অ্যাটাক চালায় বলেই আমি ডিফেন্সিভ লাইনে একা দাঁড়িয়ে থাকি, প্রত্যেককে সাবধান করি কারুর কোন অসাবধানতা কোন মলকর্মীর সন্দেহের কারণ ঘটছে কিনা, কোন জিনিসটা তোলা সহজ আর প্রয়োজনীয় আর শেষবধি, সবার জন্যে নজরে-না-পরা, নাম-না-জানা খাবারের উপকরণ, স্কেচবুক, রোলার স্কেটিং স্যু, ওডিকলোন, দামি ডিও, আণুবীক্ষণিক মদের বোতল ইত্যাদি তুলি।

প্রথম আধ ঘণ্টাই খুব ক্রুসিয়াল। ওই সময়েই বোঝা যায়, ভিড়ে আজ সুবিধা হবে কিনা, কর্মীরা রিলাকট্যান্ট কিনা, কোন অংশ র‍্যাক থেকে জিনিস নিশ্চিহ্ন করে লুকিয়ে ফেলতে সেফ। আজ দেখলাম ডিমারটে আর সপ্তমীর দিন এগদালিয়ার মধ্যে বিশেষ তফাত নেই। ক্রিস্টমাস! 

ইলেক্ট্রনিক্সের র‍্যাকের সামনে ঘুরঘুর করছিলাম। দেখলাম একটি মেয়ে, আমাদেরই বয়েসি, একদৃষ্টে হেয়ার ড্রায়ারের দিকে তাকিয়ে আছে। আমার তৎপরতাকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিয়ে দেখলাম নিমেষের মধ্যে বাক্স খুলে চার্জার টিকে লাইটের স্পিডে ঢোলা পাজামার মধ্যে অদৃশ্য করে দিল।  
হঠাৎ মনে পরল, একে আমি আগেই দেখেছি। হিঞ্জেওারির অফিস পাড়ার আরবানাইযেশানের সাথেই এখানকার পাহাড়, জঙ্গল কেটে আকাশছোঁয়া রেসিডেন্সিয়াল টাওয়ার্স বানান শুরু হয় আর্লি টুথাউসান্ড থেকে। সেরকমই পাহাড় কেটে বানান তিনটে ৩৪-তলা টাওয়ার্সের একটিতে আমরা যেখানে ২৪ তলায় থাকি মেয়েটিও তারই তিন তলায় থাকে। সম্ভবত মালায়ালি। স্কুটি চেপে অফিস যেতে প্রায়েই দেখা যায়, গম্ভীর চাহনি।
আরও একবার দেখেছিলাম, আমরা সদলবলে সেদিন টাওয়ারের সামনের উঠনে বারবিকিউ করছিলাম, উত্তাল মদ, অজস্র ম্যারিনেটেড পাখী। উঠান পেরিয়ে মুলা নদীর বাঁক, তারপরেই মুলসির ঘন জঙ্গল আর অজস্র ছোটবড় হিলক্স।

রাত হলেই
হিঞ্জেওারির মানুষ জেগে ওঠে,এদিক অদিকে হাঁটতে বেরতে দেখা যায়, চতুর্দিকে চা-পোহা-বড়াপাও-এর টপ্রি, আমাদের, যাদের বলে ইয়ং আইটি প্রফেশানালস। ভীতু সাবধানী এক জেনারেশানের হাতে বড় হয়ে, ঘর-বার ছেড়ে, বিভিন্ন শহরে, বেকার না থাকার জন্যে শিক্ষা, ক্রিয়েটিভিটি আর সামাজিক দায়বদ্ধতা এড়িয়ে মাঝারি মাইনের চাকরি নিয়ে, প্রতি পদে পদে কন্স্যুমারিসম , মদ্যপ সাইকেডেলিয়া আর বর্ডারলাইন পারসোনালিটির মধ্যে নক্ষত্রবেগে চক্রাকারে ঘুরছি এই শহর গুলোতে, যেগুলি আপাদমস্তক শপিং মল। বড় দোকান, ছোট দোকান, মাঝরি দোকান, ফুটের দোকান আর সর্বোপরি খাবারের দোকান। যেখানে শপিং করে ফেরার পথে আমরা ডাবল চিজ, বেকন, বীফ প্যাটি বার্গার আর ক্রাফট বিয়ার খেতে পারি। এবং প্রতিনিয়ত আমরা বাড়ছি। নোংরার স্তূপে ভয়ঙ্কর ব্যাটেরিয়ার মত।
সেই রাত্রে এই মেয়েটির দলবল আমাদের কাণ্ডকারখানা দেখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েছিল। ইউকুলেলের শব্দে, সে জিজ্ঞেস করেছিল কি ভাষা? আমরা জানিয়েছিলাম উত্তর বাংলার ডাইলেক্ট। কয়েকজনকে আমাদের মধ্যের ওভার-ফ্রেন্ডলি ছেলেরা ডেকেছিল, তারা আসেনি। 


মল থেকে বেরিয়ে অটোয় আমরা সেদিনকার চুরির হিসেব মেটাতে ব্যাস্ত হলে আমার নজর গেল তার উপর। পোশাক আশাকে মনে হয় সদ্য ঘুম থেকে উঠেছে, ঢোলা আলিবাবা আর শ্যাবি টপ, হলটার নেক ব্রা। মনে হয়, নাইট শিফট করে।
আমি ভাবলাম, সেদিনকার কথা যেদিন সৌম্য নোটিস করে বলেছিল, মেয়েটা আমার খটমট নাম পরার চেষ্টা করছে লিফটে, গলার আই-কার্ড দেখে।

খটমট বলেই হয়ত সময় লাগছিল।
বলতে ভুলে গেছি, হেয়ার ড্রায়ারটা আমি উঠিয়ে নিয়েছি, যেটির
চার্জারটি তার কাছে। রোবটদের অনুভূতিই তো বিপ্লব, যেখানে গাছ কেটে দিকচক্রবাল বানান হয় সেখানে প্রেমই তো আমার যুদ্ধ, মাই রেভলিউশান। 








 

Tuesday, June 20, 2017

কোই আতা হ্যায়

আপ্পা চোখ গোলগোল করে একগাল হেসে বলল 'বম্বাই কা বারীশ দেখনেকো মিলেগা স্যারজী, অচ্ছে অচ্ছে লোোগ সায়ার বন জাতে হ্যাঁয়। '
কিছুক্ষণ তাকিয়ে বললাম, 'আপ্পা আজ ভি?'
আপ্পা গাড়ির ওয়াইপার চালিয়ে ওয়াকারের দিকে টার্ন নিয়ে বলল, 'হাপ্তে মে একবার গুল্লে লেতে হ্যাঁয়, আজ মৌসম জী বড়িয়া থা।'
ফোনের স্ক্রিনে দেখলাম এগারোটা মিসড কল। কয়েকটা বাবা-মার, বেশিরভাগ গুলো রাইয়ের। আজ প্রায় বিশদিন হতে চলল আমাদের লং-ডিস্টান্স প্রেমের শেষ হয়েছে। ভরা বর্ষাশেষের প্রবল বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পরও কয়েক পশলার রেস থেকে যাওয়ার মত কথা হয় এখনো আমাদের। মোস্টলীী ঝগড়াই। কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি। কান্নাকাটি, পুরনো কথা, একই কথা। প্রেসিডেন্সির হ্যাপেনিং লাইফ রাইকে আর মহারাস্ট্রর পাহার, জঙ্গল, পুনে- বম্বে, সমুদ্র-বস্তি-নাইটলাইফ, ডেটা-অ্যানালিসিসের চাকরি, অনিশ্চয়তা আর বছর পঁচিশের ইনসিকিওরিটিস আমাকে গিলে নিয়েছে। 
আমি এমনিতেই ভীষণ বৃষ্টি ভালবাসি। সকাল-বিকেল হাঁ করে বৃষ্টি দেখি। 
এমনিতেই শুক্রবার, তার উপর উথাল পাতাল বৃষ্টি, আজ উল্লাট পার্টি হবে ২২ তলায়। নতুন বং এসেছে সিনে একটা। আমার স্পিকারটা এখনো শিবাঙ্গি-দের বাড়িতেই।
মুম্বাই তে এক সপ্তাহের ডেপুটেশান। এইটা সেই সময় যখন আমার টেলেভিশানের স্ট্রাগলার বন্ধুরা ক্ষান্তি দিয়ে এমবিএ করে নিচ্ছে। বিশাল বম্বে শহরে একটাও বন্ধু নেই।
হিঞ্জেওয়াড়ির পাহাড়, জঙ্গল, হাইরাইজ, অফিস-চত্বর কাঁপিয়ে যখন বৃষ্টি নামল তখন প্রায় শেষ দুপুর। অপিস যাইনি, সোমবার থেকে মুম্বাই হিরানান্দানি তে রিপোর্ট করতে হবে। তার-ই প্রস্তুতি। 
গাড়ি এক্সপ্রেস-ওয়েতে ঢোোকার মুখে দেখলাম, মুলসির জঙ্গলের দিক থেকে দৈত্যাকার ঈগল মেঘটা আরও পূর্বদিকে সরে যাচ্ছে। বৃষ্টি নিয়ে যাচ্ছি বম্বেতে। বৃষ্টি, উদাসীনতা আর একরাশ মন খারাপ। 

সন্ধে সাড়ে ছটায় জানা গ্যাল, লোনাভালার আগে এক্সপ্রেসওয়েতে ধ্বস নেমে রাস্তা বন্ধ।
- "স্যারজী, আর্মি আতে আতে তো টাইম লাগেঙ্গা। ওল্ড রুট লেলু?"
- "কুছ ভি কারো, কিস্কো অচ্ছা লগতা হাঁয় ফ্রাইডে কো ট্রাফিক মে টাইমপাস করনা!"

আপ্পা খান্দালা মেনল্যান্ডের দিকে গাড়ি ঘোরাতেই সঙ্কোচ কাটিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'হাইওয়ে মে দারু মিলেগা আভি আপ্পা?'
- ''মিলেগা না স্যারজী, দারু, চারাস, কোকেন, গুল্লে, সুইয়া সাব মিলেগা, মেরা জান পহেচান হ্যাঁয়।
আপ্পা আমার অফিস ক্যাব ড্রাইভার হলেও লোকটি অশিক্ষিত নয়, ওদের বাড়ির পঞ্চাশ-ষাট টা বড়াপাও, দাবেলির টাপ্রি আর ঠেলা আছে, গ্রাজুয়েশন অব্দি পরেছে, কিভাবে জানি ব্রাউন-সুগারের নেশায় পড়ে যায়, নেশার সঙ্গে টাকা ধার এবং নয়ছয়েে জড়িয়ে পড়ে, তারপর একদিন বাড়িতে গুন্ডা আসে, কট্টরপন্থী বাবা ছেলেকে বের করে দেন। এই ধরনের মারাঠিরা ইললিটারেট হলেও ন্যায়-অন্যায়, ধর্ম-অধর্ম, নিরামিষ, ঈশ্বর বোধ প্রবল, মেয়েদের সম্মান করতে জানে, মারাঠি কোলিি-দলিত বস্তিতে আমি যা জেন্ডার ইকুয়ালিটি দেখেছি, ব্যাঙ্গালর-দিল্লীর স্ট্র্যাটস্ফিয়ার পরিবারেও তা দেখিনি। 
আপ্পা এখন একটা উবার আর আমাদের অফিসের মুম্বাই রুটের গাড়ি চালায়, বাড়িতে লুকিয়ে খেতে যায় রাতে, ধার শোধ করে আর ক্লেম করে নেশা কমিয়ে দিয়েছে। যে ঠেলাটায় ও মাঝে মাঝে বসত গোটা ঠ্যালা টা জুড়ে নব্বইয়ের দশকের হেরোইনে চুর, কথা জড়িয়ে যাওয়া সঞ্জয় দত্তর অসংখ্য ছবি। সারাদিন ফোনের লাউড স্পিকারে খলনায়কের গান বেজেই চলে। 
- 'পতা হ্যাঁয় আজ কিয়া হ্যাঁয়?'
- 'কিয়া?'
- 'আজ সঞ্জু-বাবা ছুটনেওয়ালে হ্যাঁয় ইয়ের্বাড়া সে, হাম তো আভি টাপরি বন্ধ কারকে মিলনে জায়েঙ্গে উন্সে। এক ফটো তো টাপরিকে লিয়ে মাংতা হ্যাঁয় না স্যার?' 
বলিউডের সর্বগ্রাসী প্রেস্নেস মহারাষ্ট্রে না থাকলে বোঝাই যায় না

পানভেলের কিছু আগে, বাঁদিকে পাহার আর ডানদিকে টিমটিমে বম্বের আলো ফেলে রেখে যে বারের কার-পারকিঙ্গে আমরা ঢুকলাম তার প্রাক্টিক্যালি কোন নাম/হোরডিং কিছু নেই, একটা ব্ল্যাকের খুপরি তার পাশে এলাহি দরজার এন্ট্রি। দরজা খুলতেই সিগারেট, মদের বাষ্প আর মেয়েলি পারফিউমের গন্ধ মাখা লম্বা আলোো-অন্ধকার করিডর।  করিডরের দরজায় ছাপ দিতেই দেখলাম, সারিি সারিি মদের টেবিল, সামনে তিনফুটের নাম-কা-ওয়াস্তে রেলিং, তার পেছনে স্টেজ। বারের মালিকের সাথে হাসি আদান প্রদান করে আপ্পা আমাকে কোনার টেবিলে বসাল। কনকনে ঠাণ্ডা এসি। 
তাওড়েজী ধুপ-ধুনোো হাতে ক্যাশ কাউন্টারের আইল দিয়ে সন্তর্পণে ঢুকলেন, যেন আশেপাশের সবকিছুই অসীম ক্লেদাক্ততা নিয়ে তার পবিত্র সাদা অরা ভেদ করে দেওয়ার চেষ্টা করছে। দু মিনিট ভক্তি ভরে পূজোো করলেন। তার পর সাবেক খাতা খুলে, নাকে চশমা লাগিয়ে হেড ওয়েটারকে ডাকলেন, ম্যাজিকের মত কোনার ছোট্ট স্টেজে আলো জ্বলে উঠল।
মধ্যবয়স্ক এক মারাঠি ভদ্রলোক স্টেজে উঠে লাগোয়া কী-বোর্ড, ইলেক্ট্রনিক-পারকাশান আর অক্টপ্যাড প্লেয়ার কে ইশারা করতেই সুরের ঠেকা শোনা গ্যাল, স্থূলকায়, হিমেশ-টুপি পরিহিত, কাঁধ ছাপিয়ে ছুল্কুমার গায়ক চোখ বুজে গান ধরলেন,
                                  "ধূপ মে নিকলা না করো রূপ-কি-রানী, গোরা রঙ্গ কালা না পড় যায়ে "   

ধীরে ধীরে গুমটি গ্রিন রুম থেকে চারটি নর্তকী স্টেজের গায়ে প্রণাম করে গায়কের পিছনে গদি আঁটা কার্নিশে বসল।অল্পই লোকজন ছিল বারেমালের প্রাথমিক খোঁয়াড়ি কাটিয়ে তারা তাকাল স্টেজের দিকে, কেউ কেউ একশ-দুশো টাকার নোট বাড়িয়ে দিল, অনেকে একসাথে গানের কলি ধরল। 
বারের অনেকেই রেগুলারের, কাজ শেষের স্যানেটরিয়াম, আমার অফিস ক্যাবের ড্রাইভার'ও তাই।
ওরা আসতেই অনেকের মধ্যে আঁখমিচোলি শুরু হল। আপ্পা আমার হাতে হাল্কা চাপ দিয়ে একটি এলবিডি পরা নর্তকীর দিকে চোখ দিয়ে দেখিয়ে বলল, 'স্যারজী ইয়ে হি হ্যাঁয় ও'। 

আপ্পা ভাসাভাসা একবার বলেছিল, এই ওড়িয়া নর্তকীটির প্রেমে ও পড়েছে। কোশলরাজ্য সম্বলপুরের প্রত্যন্ত্য গ্রামে মধ্য নব্বই দশকে শহুরে চাকুরীরত রাজে পট্টনায়কের সাথে বইয়ে হয়, তখন ও মাইনর। রাজে বম্বে আনে ওকে, এনে নিজের বারে নাচাতে লাগায়। রাজের পাঞ্জাবী পার্টনার ধোঁকা দিয়ে বারের মালিকানা ছিনিয়ে নিলে রাজে নেশার মাত্রা বারিয়ে ওকে মারধর করা শুরু করে। ঘরে লোক ঢোকায় সামান্য টাকার বিনিময়। তারপর কালের নিয়মে, ওর দুটি ছেলে হয়, তাদের কে সম্বলপুরেই পাঠান হল।  
রাজের নেশা আর অকর্মণ্যতার সুযোগ নিয়ে ও পালায় মুম্বাই থেকে, তখন ডান্স বারগুলি গভর্নমেন্টের ধাক্কায় সেভেন আইল্যান্ড থেকে ক্রমশও শহরতলির দিকে চরিয়ে যাচ্ছে। পুনেতে মলে কাজ আর টাকার অভাবে নাচ চালিয়ে যায়। 

বারের লক্ষ্মী হলও নর্তকীরা, মালিকরা বুকের খুন দিয়ে তাদের বাঁচায় এমনি একটা ধারনা এদের। এই বারেও রাজে হানা দিলে, পুলিশ কাস্টমার আর বাউন্সারদের শাসানি তে পালিয়ে বাঁচে, রাস্তাঘাটে অতর্কিতে ধেয়ে আসে প্রায়েই, আপ্পা দুবার বাঁচিয়েছে। দুবার রাস্তার অত্যুৎসাহিিরা। 

আপ্পার ইশারায় একটি ডিজেনারেট টাইপের লোক আমার সীটের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, 'হ্যাশ, কোকেন?'
 হ্যাশ শুনে লোভ হল, বম্বেতে যদিও ভাল হ্যাশ সহজে পাওয়া যায় না। গেলাম পেছনে পেছনে। আপ্পা উদগ্রীব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে, ভেতরে তখন
'মেরে লচকে কমর, তুনে পহেলি নজর যব নজর সে মিলাই মজা আ গয়া'

বাইরে এসে দাম রফা করে সিগারেট বের করতে যাচ্ছি ঠিক তখনইএলবিডি কান্নাভেজা চোখে ছিটকে বেরিয়ে এলো, পেছনে আপ্পা, হাতে আধখাওয়া কিংফিশার স্ট্রং। 
- 'পাঁচশ কা নোট ভেজা কিউ মাদারচোোদ? পতা নেহি পইসা আভি ভি বহুত দেনা হ্যাঁয় তুঝে? '
- 'কুছ ভি বল, কুছ ভি কর, মুঝসে শাদি কারকে নাসিক চললে?'
- 'কিত্নি বার বোোলা হ্যাঁয় তুঝে? মেরে দোো বচ্চে হ্যাঁয়।'
- 'হাঁ তো বুলা লেঙ্গে না উনহে , আম্মি সে থোড়া পইসা লেকে টাপ্রি খোল লেঙ্গে।'
- 'টাপ্রি সে কিয়া চলেগা হামারা? কিয়া হর টাইম নশেরি মাফিক বাত কারতা হ্যাঁয়?'
-'আরে হোটেল ভি তো খোোলেঙ্গে, বানিয়া আইসে তো নহি হ্যাঁয় না?'
ঠিক তখনই একটি লোক পেছন থেকে এসে আপ্পা কে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিল।
আপ্পা ধুলোো ঝেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, 'দেখ রাজে তেরা টাইম আভি খতমতুনে ইস্কা দিল দুখায়া হ্যাঁয়।'
রাজে ওর দিকে ছুটে আসতেই বলিউডি কায়দায় একটা টাস্কিি মেরে ঘুরিয়ে বিয়ারের বোতল তা মারল মেডালা অব্লাঙ্গাটার উপরে, রাজে মাটিতে, বিয়ারের ফ্যানা, কানের পেছনে রক্ত
-' চল রেশমি, আইয়ে স্যারজী। মুঝে মাফ করনা।
-'লেকিন মেরা নাম রেশমি নহি হ্যাঁয়!' পেছনে দৌড়াচ্ছি। আরও পেছনে বারের গহ্বর থেকে কারা যেন চেঁচাচ্ছে। 
-'কুছ ভি হোো।'

এরপর মনে আছে আমরা তিনজন গাড়িতে, অঝরধারায় বৃষ্টি। নক্ষত্রবেগে গাড়ি চলছে সায়ন হয়ে চেম্বুর। আমাকে নামিয়ে গাড়ি জমা দিয়ে ওরা সরকারি বাস ধরে যাবে পুনেতেই, আম্মির হাতেপায়ে ধরে টাকা নিয়ে ফেরার হবে এক বছর।  চারদিক শান্ত হয়ে এলে সংসার। গাড়ির রেডিও তে বাজছিল,

'ধীরে ধীরে মচল অ্যায় দিল--বেকরার
কোই আতা হ্যায় 
ইয়ু তড়পকে না তড়পা মুঝে বার বার,
কোই আতা হ্যায়... ' 



Sunday, March 5, 2017

দণ্ড বায়স

ইলেকট্রিকের তারের ডিসচার্জে আহত হয়ে তিনতলার উপর থেকে একটা কাক প্যারাট্রুপারের  মত আরকিমিডিয়ান স্পাইরাল হয়ে নিচে পরছিল।
ঠিক তখনি কোলনিয়াল নাইজেরিয়ার বোরনো রাজপরিবারের শেষ জীবন্ত সদস্য বোকো হারামের সাথে হাত মিলিয়ে অ্যাসল্ট রাইফেল তুলে টার্গেট প্র্যাক্টিস করতে গ্যালো।
 ঠিক তারপরেই  ভুটান-চিন সীমান্তের লায়া গ্রামে একটি মেয়ে ঝরনা থেকে ট্রাউট ধরতে গিয়ে দেখল ঝরনার জলের ধারার ঠিক পেছনেই গুরু পদ্মসম্ভবের আদিম বে-উল। জীবনের শেষ দিনগুলিতে পদ্মসম্ভব বলে গেছিলেন, পৃথিবীতে যতই বানভাসি, গ্লোবাল ওয়ারর্মিং, অগ্নুৎপাত, ভূমিকম্প হক না কেন, পবিত্র মনের মানুষদের জন্যে তিনি হিন্দুকুশ থেকে হিমালয়ের পূর্বকোণ অবদি তিনি সদাই সুখের স্বর্গরাজ্য এই বে-উল গুলি বানিয়ে গ্যাছেন।
ঝরনা পার করার সময়েই, মধ্য ইয়োরোপের একটি দেশ নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করে।
আর সূর্যেের আলো গ্রিনিচ মানমন্দির টপকানোর আগেই পেঙ্গুইনরা নিজেদের মধ্যে ঠিক করে এবার তারা আমেরিকান মিলিওনেয়ার দের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে নামবে।
তাদের ওয়ার-স্ট্রাটেজি গুলি কোন প্রাইভেট বডি স্পন্সর করার ভাবনাচিন্তা শুরু করার আগেই, মৌলবাদী, অথারিটেরিয়ান ভারত-সরকার গরিব প্রান্তিক আদিবাসীদের মেরে তাড়ানোর জন্যে উর্দি পরা রোবট বাহিনী নামিয়েছিল।
রোবটদের জন্যে পেট্রোল এর জোগানে টান পরার আগেই, উত্তর পূর্বের  আদিম জঙ্গল থেকে শিকড়হীন গাছেদের দল বেরিয়ে এসেছিল। তাদের বহুদিনের ইচ্ছা, আজ তারা শহর মেরে খাবে।
ঠিক যখন সারা পৃথিবী ওলট পালট হয়ে যাচ্ছিল, তখন আমার পাশের বাড়ির ছেলেটি বারান্দা থেকে রাস্তার উপর পরে থাকা কাকের ডেড বডি টার দিকে তাকিয়ে ভাবছিল, একে কবর দেওয়া উচিত না চিতেয় তোলা,
ঠিক তখন আলসের পাশ থেকে কর্কশ গলায় কে যেন বলে উঠলো,
- "আহারে কতই বা বয়েস হবে!"
ছেলেটি মুখ তুলে তাকিয়ে দেখল, একটা কাক, ঠোঁট টা জেট ব্ল্যাক, তার ডানায় একটি পেন্সিল আর তার অবয়ব অবিকল বাবার আলমারি তে রাখা কোন এক বাংলা কবিতার বইয়ের একটা পারটিকুলার কাকের  ছবির মত।
- "তুমি কি কাক?"
- "হ্যাঁ কিন্তু আমি দাঁড়-কাক, মধ্যকলকাতার রেস্পেক্টে বেশ এগজটিক।"
কাক কি করে বাংলা বলে এটা মাথায় আসার আগেই, কাকটি নিজেই বলল, "আসলে বেশ একশ বছর আগে এক বাঙ্গালি কবি আমায় ছুঁড়ে ছুঁড়ে মুড়ি খাওয়াতেন আর নিজের মনেই কথা বলতেন, সেই থেকে শিখে গেছি।" সে বলেই চলল, " কাকেদের তো আর চিতে বা কবর হয়না, কাকেদের সমাধি মানে ডিকম্পসিসান। মাটি আমাদের নিলে তবেই মোক্ষলাভ।"
ছেলেটি বাবার সাথে একটা কিউবান সিনেমায় দেখেছিল বাবামা যুুদ্ধে মারা যাওয়ার পর অনাথ বাচ্চারা কিভাবে সারা দেশ ঘুরে বেরায়। সেই খেয়াল থেকেই জিজ্ঞেস করল, "এর ছানা দের কিি হবে?"
- " আরে যাহ! সে ব্যাবস্থা কি আর আমি করে রাখিনি? দুটো ছানা আছে। তার মধ্যে একটি তো একেবারে শুয়োরের বাচ্চা, প্লাস্টিক ছাড়া কিছু খায়না। বাপ টা তো আগের মাসের পূর্ণিমায় মরল অখাদ্য কুখাদ্য খেয়ে!
তোমাদের বাড়ির পিছনের কাঁঠাল গাছে এক হোমোসেক্সচুয়াল দম্পতি থাকে, তারা বলেছে ওদের অ্যাডপ্ট করবে। দুটি ছেলে কাক তো আর ডিম দেবেনা।"
- "কেন হবে না?"
- "কারণ ব্যাপারটা আরেকটু কম্পলিকেটেেড, কেউ কেউ হয় যারা ছেলেরা-ছেলেরা বা মেয়েরা মেয়েরাই একসাথে বাঁচতে চায়, তাদের কাছে ডিম পারার ব্যাপার টা একটু ঘোরাল হয়ে যায়, কিন্তু জান, আমাদের পাখিদের জগতে তারাই অনাথ ছানাদের আশ্রয় দেয়, আমি শুনেছি আজকাল মানুষদের মধ্যেও আজকাল এরকম শুরু হয়েছে। কিন্তু সবাই নাকি তাদের দুচ্ছাই করে? ইহা কি সত্য?"
- " আমি তো জানিনা? বাবা কে জিজ্ঞেস করে বলব?"
- "সে যখন করবে কর, বাবাকে এটাও বলে দিও যে দণ্ডবায়স বলেছে কে কার সাথে থাকবে সেটা সম্পূর্ণ তাদের ব্যাপার, তোমার বাবারা জ্যান তাতে নাক গলিয়ে সময় নষ্ট না করেন। আমিও আর সময় নষ্ট করবও না, আমাকে এখুনি তিব্বত যেতে হবে।"

এই বলে প্রকাণ্ড ডানা ঝাপটিয়ে কাকটি সেখান থেকে মেলট্রেনের স্পিডে উড়ে চোখের সামনে থেকে হারিয়ে গ্যাল, হাওয়ার ধাক্কায় হরলিকসের গ্লাস টা তিনতলা থেকে ছিটকে পড়ে যাওয়ার পর ছেলেটি তাকিয়ে দেখল যেখানে কাকটি বসেছিল সেখানে একটা পেন্সিল পরে আছে।

Saturday, August 6, 2016

সন্দীপ সান্যাল আর মেরা নাম জোকার

বাড়ীর পেছনের পুকুরটাকে পাড়ার লোকে হলদির পুকুর বলত। কয়েক পুরুষ আগে বিয়ের দিন গায়ে হলুদ নিয়ে এক বাগদি মেয়ে কলসি বেঁধে ডুব দিয়েছিল।
গাঁয় জাতপাত তেমন একটা প্রকট ছিল না, যদিও হিঁদু-মুসলমানের স্নানের ঘাট আলাদা ছিল। হিঁদুদের মধ্যে পিদিমের নিভু নিভু শিখার মত কানাকানিও ছিল। গাঁয়ের মাটি বড়ই দরদী ছিল, একটু যত্ন নিলে আভাগের কুকুরের মত ল্যাংল্যাং করে ফসলের বন্যা বইয়ে দিত।
হরিপদ নিজের মেধা ও চেষ্টায় কলকাতা থেকে ডাক্তারি শিখে গাঁয়ে ফিরে এল হিপক্রাটিক ওথ আর চরমপন্থি স্বদেশী মনভাব নিয়ে। গোপনে গোপনে আশেপাশের মহকুমার বিপ্লবী কার্যকলাপের সাথে পাঁকাল মাছের মত জড়িয়ে ছিলেন। ধরাটি কক্ষন পরেন নাই। বছর দুই বাদে দেশ স্বাধীন হল। এদ্দিন বেশ ছিল জীবন বোমা, গুলি, লিফলেট আর বায়কেমিকের বাক্স নিয়ে। স্বপ্ন পুরনের ছলছল ছোখের খোঁয়ারি কাটল বুড়িগঙ্গার ওপারের গ্রামে হঠাৎ এক সন্ধেয় আর্তনাদের শব্দে। গ্রামে ঘরকে ঘর তখন আগুনে পুড়ছে। মেয়েরা ছাওয়াল-মাইয়া কোলে জলে ঝাঁপিয়ে পরছে প্রাণ আর ইজ্জতের ভয়ে। তারা হিঁদু কি মুসলিম জানা যায় নি। তদ্দিনে নোয়াখালী হয়ে গিয়েছে।
হরিপদর ঘরে বড় দাদা তারাপদ চাষের কাজ করতেন। মাটির বড্ড কাছে বাস ছিল তার, মাটি কেটেই শরীর বানান। আর ছিল এক বালবিধবা পিসি, যিনি নাকি এমনি আফিং খেতেন যে সাপেও তার কাছে ঘেঁষত না।
জমিজমা কিছু রেখে, প্রায় পুরোটাই বিক্রিবাটা করে অন্ধের মত তিনজনে অনির্দিষ্টের পথে যাত্রা করলেন কলকাতার দিকে।

(২)

কলকাতায় এসে দু নম্বর হরিপাল দত্ত লেনে, হেদোর পুকুরের পাশে ভাড়াবাড়িতে ওঠা হল। ভাগদখলের জমি নেব না এমন জার্মান গোঁ।
তারাপদ দিনের চাষির ভাত হজম হত না কলকাতার আবহাওয়ায়। ম্যালেরিয়া, মাছি, গাড়ি ঘোড়া, কয়লার ধোঁওয়া, মারামারি, খুব জখম তার ভাললাগেনি। তিনি তাঁর উপযুক্ত কোন কাজকর্ম পাননি, তিনি ভাইয়েরই সংসার দেখতেন, বাজার থেকে কলাটা মুলোটা কিনে আনতেন। সকাল বেলা একপেট খেয়ে সেই যে বেরিয়ে যেতেন ফিরতেন ততক্ষনে কলকাতা রাতের অন্ধকারে স্তব্ধ হয়ে গ্যাছে।
হরিপদ তদ্দিনে এখানে বিবেকানন্দ রোডে ডাক্তারি জমিয়ে ফেলেছেন, আড্ডায় কেউ যদি বলে ' ইয়ে আজাদি ঝুঠা হ্যাঁয়' তাহলে তাকে জুতো মারতে উঠতেন। তিনি নিঃসন্তান ছিলেন, সেই অপ্রাপ্তি থেকেই হয়ত ইঞ্জিন ছাপ ব্রাণ্ডির বোতলে জীবনটা দিয়ে দেন।
বিধবা পিসি তদ্দিনে কাশিবাসি হয়েছেন। স্বেচ্ছায়। কিছুটা হয়ত ব্যাক্তিগত স্বাধীনতার খোঁজে। বালবিধবা হলেও অবলা নারী ছিলেন না। মৌলবির কাছে গচ্ছিত রাখা জমি-জমার, পান সুপারির, কাতলা মিরগেলের হিসেব নিতে একা একাই ট্রেনে পূর্ববঙ্গে যেতেন। মসজিদের উপকণ্ঠে বসে, তসবি আর কণ্ঠি নিয়ে মৌলবির সাথে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা রামায়ন, মহাভারত আর সুফিয়ানা নিয়ে আড্ডা দিতেন। তিনি সেই স্থলেই মারা যান, হরিপদরা তাঁর দেহান্তির ব্যাবস্থা করতে যেতে পারেনি কারন সেই মুহূর্তে আইন মেনে পূর্ববঙ্গ যাওয়া সহজ ছিল না।
তারাপদ ইতিমধ্যে কলেজ স্ট্রিটের এক পাইস হোটেল বার্মিজ মালকিনের প্রেমে পরেন এবং তাকেই হিঁদু মতে বিয়ে করে ঘরে আনেন। তার ঝোপ ঝাপড়া, চাঁদা, সরপুঁটি, ক্যাতার রুটি, বিলের আলো, অষ্ট প্রহর আর আজান ভুলতে কলকাতার লক্ষকোটি মানুষের ভিড়ে হঠাৎ যুগ্ম চন্দ্র-সূর্যোদয়  তাকে বিশেষ ভাবে সাহায্য করেছিল।

(৩)

কালের নিয়মে তারাপদর তিন ছেলে হয়। বড় ছেলে সমীর একদিন মাঠে ফুটবল খেলতে গিয়ে দেখল কর্নারের শট টা বাং মাছের মত কেদরিয়ে বার পোস্টের নিচে লেগে গোলে ঢুকল। সেই থেকে ইস্টবেংগলে ট্রায়াল, তারপরে চব্বিশে মালাইচাকি ঘুরে মাঠ থেকে হেরে বিদায় নিয়ে মেজ ভাইয়ের সাথে জুড়ে গেলেন।
মেজ ভাই দীলিপ সান্যাল রেলের ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। বদলির চাকরি। পুজোয় খড়গপুর, নববর্ষে কোচবিহার। তখন হিমালয়ের ফুটহিলসের প্রত্যন্ত জায়গা গুলতে ট্র্যাক বসান হচ্ছে, সে সেখানকার সিভিল বাবু।
তখন ওখানে ম্যালেরিয়ায় গ্রাম শ্মশান হয়ে যাচ্ছে, শীর্ষেন্দু এরকমই কোন জায়গা নিয়েই হয়ত লিখেছিলেন যে রাস্তাঘাটে যারা হাঁটে তারা সবাই নাকি মানুষ না। ছোট ভাই সন্দীপ ঘুরে বেড়াতে অস্বীকার করে, সে স্কটিশে ভর্তি হয় ফিলসফি নিয়ে।
সারারাত না ঘুমিয়ে দিনের পর দিন অসুরের মত খাটতে পারত। পড়াশোনায় অস্বাভাবিক ভাল হওয়া সত্ত্বেও ক্লিনিকাল লেভেলের ডিপ্রেসান তাকে তাড়া করে বেড়াত। একদিন বড়দার মুখে জানতে পারে যে তাঁর মায়ের দিকের অনেকেই নাকি মাথা খারাপ, সে ভাবতে শুরু করে যে তারও একদিন স্কিজোফ্রেনিয়া হয়ে যাবে। সারারাত জেগে হস্টেলের ঘর বিড়ির ধোঁয়ায় অন্ধকার করে দিত। বন্ধুদের আড্ডায় তার নিজের লেখা একটা ছোটোগল্প শুনে সলীল চৌধুরি বলেছিলেন 'তুই যে ভীষণ এগজিস্টেনসিয়াল ক্রাইসিসে ভুগে চলেছিস।'
সেই গল্পটাই বন্ধুরা হয়ত আর কাউকে বলেছিল, তারা বলেছিল আরো কাউকে। বম্বের কোন রাইটারকে পাকা লেখা না করিয়েই গল্পটি বেচে দ্যান সন্দীপ। সে তখন বন্ধুদের সাথে গ্রামে যাওয়ার জন্য মুখিয়ে রয়েছে। হাতে টাকা এলে ভালই হয়। পরে হাল্কা চালে বলেছিল, 'মেরা নাম জোকার ভাল হল নি রে।'
সন্দীপ সান্যালের বডি টা পাওয়া যায়নি। নকশালদের মধ্যের গুণ্ডারা সম্ভবত মেরে নদীর চরে পুঁতে দিয়েছিল।