(১)
কলিং বেলের শব্দে মুহূর্তের মধ্যে দরজা খুলেই মা জিজ্ঞেস করল, 'কি হল বলত মেয়েটার?'
বাবা নক্ষত্রবেগে জুতো মোজা খুলতে খুলতে বলল, 'সাস্পেক্টেড ইলোপ। সেজদি কান্নাকাটি করে অজ্ঞান হয়ে গ্যাছে।'
দাদা তখন স্কুলে, আমার ইররেগুলার পিরিয়ড চলছিল বলে স্কুল যাইনি। হাঁ করে দেখলাম বাবা একটা চুরুট ধরিয়ে বলল, 'জলধর কে ফোন করে দিয়েছি, ও দুদিন বাড়ি পাহারা দেবে।'
এই জলধর আমার বাবার পিওন, মাঝে মাঝে বাড়ির কাজ করে দিত। বাবার সুব্যাবহার আর উপরি মাইনের জন্যে। পরিবারেরই অংশ হয়ে গেছিল। নদীয়ার গ্রাম থেকে আমাদের জন্যে থোড়টা, পেঁপেটা, ধেনো চিংড়ীটা এনে দিত। বাবা রেলের সিভিলবাবু, অফিস মেট্রোভবনে, সন্ধেবেলা ডেকারস লেনে চিত্তদার দোকানে দু ঘণ্টা আড্ডা মেরে ফেরার মানুষটি দুপুর তিনটেয় বাড়িতে, আমি ঘটনার গ্র্যাভিটিটা বোঝার চেষ্টা করতে করতেই, মা শাড়ি পড়ে এলো। মা বলত চিত্তদা খাবারে আফিম মেশায়, নাহলে এত আঠা কিসের?!(২)
কুড়ি মিনিটের মধ্যে আমরা ট্যাক্সিতে, দাদাকে সাউথ পয়েন্ট স্কুল থেকে উঠিয়ে সোজা দেশপ্রিয় পার্ক। সেজপিসির বাড়ি।
বাড়িতে তখন প্যান্ডিমনিয়াম।
বড়পিসি বাল বিধবা, উচ্চশিক্ষিত কিন্তু গোঁড়া ব্রাহ্মণ। হিটলারের মত মেজাজ।
সেজপিসেমশাই আর তার পরিবারের বাকি ছেলেরা বৈঠকখানায় চায়ের কাপের পাহাড় আর চুরুট, সিগারেটের ধোঁয়ায় ঘর অন্ধকার করে দিয়েছে।
বড়রা কর্তব্যপরায়ণ হয়ে পুলিশে খবর দিয়েছে, থানার লোক এসে ছবি নিয়ে গ্যাছে।
সবাই এই আলোচনাই করছে যে ছেলেটিকে পেলে কি কি রকম বিচিত্র পদ্ধতিতে শাস্তি দেওয়া যায় আর কার কত রকম পলিটিকাল কানেকশান আছে।
বাড়ির বউরা হিস্টেরিকালি ক্রন্দনরত সেজপিসিকে যত্নআত্তি করার চেষ্টা করছে।
ছুঁড়িরা মুখ টিপে হাসছে, আর কেউ এলেই গম্ভীর হয়ে বলছে, আহারে দেবযানী কতই না কষ্ট পাচ্ছে এখন।
আর, আমরা বাচ্চারা অনেকদিন বাদে, স্কুল-আফিস-নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির ব্যাস্ততা কাটিয়ে সব দাদাদিদিরা একসাথে হয়ে পরমানন্দে ক্যালব্যালানির অলিম্পিক লাগিয়ে দিয়েছি।
আমার মায়ের শ্বশুরবাড়ির দিক, তিনি ভীষণ ব্যাস্ততায় কার কি লাগবে তার ফেসিলিটেটর হয়ে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছেন, দাদারা কি-খাব কি-খাব করছে, আমি বারান্দা দিয়ে দেখলাম ছোটপিসির গাড়ি বাড়ির লাগোয়া ফুটপাতে এসে দাঁড়াল।
(৩)
ছোটপিসি জাঁদরেল মহিলা, ইকনমিক্সের টিচার, এসেই ঘোষণা করল, 'বাচ্চাগুলোকে বিকেলবেলা কিছু খেতে দিসনি? তোরা ক্যামন মানুষ?' বলেই আমাদের লাইন করে নিয়ে গিয়ে চিকেনরোলএর হরিরলুট চলল। শেষ বিকেলে থানার বড়বাবু এসে বললেন,
- 'দেখুন এরা তো অ্যাডাল্ট, আমাদের বিশেষ এক্তিয়ার নেই স্বেচ্ছায় পালিয়ে গেলে।'
বাড়িতে চাপা গর্জন উঠল।
- 'ভদ্রবাড়িতে মেয়ে পালায়?! হ্যাঁ?! জানেন আমাদের কত লোকে চেনে? আমার ছোটোছেলে সলিলদার সাথে সুর করে বোম্বাই তে, এইতো সেদিন শ্যামল (মিত্র, গায়ক) আর দিনেন (দাস, সিপিএমের হুব্বা জননেতা, ইন্টেলেকচুয়াল) এসে চা খেয়ে গ্যাল!'
মা-বাবারা তখন হয়ত বোঝেননি, পার্টির প্রথম দিনগুলতে এঁরা বেশিরভাগ-ই ছিলেন অত্যন্ত গরিব, এবং পার্টির কালচারালের সাথে হেড ব্যুরোর সদ্ভাব ছিলনা একেবারেই।
বড়পিসি ধমকে উঠে বললেন, 'আপনার মেয়ে পালিয়ে গেলে?!'
বড়বাবু ঢোঁক গিলে বললেন, 'দেখুন, আমি রুটিন কাজগুলো সেরে রাখি, আপনারা যখন জানতেনই যে এরকম ঘটার প্রপেন্সিটি আছে তো প্রিকশাস হতে পারতেন, এখন দুজনে পালিয়ে গেলে আমাদের হাত-পা বাঁধা।'
- 'ভদ্রবাড়িতে মেয়ে পালায়?! হ্যাঁ?! জানেন আমাদের কত লোকে চেনে? আমার ছোটোছেলে সলিলদার সাথে সুর করে বোম্বাই তে, এইতো সেদিন শ্যামল (মিত্র, গায়ক) আর দিনেন (দাস, সিপিএমের হুব্বা জননেতা, ইন্টেলেকচুয়াল) এসে চা খেয়ে গ্যাল!'
মা-বাবারা তখন হয়ত বোঝেননি, পার্টির প্রথম দিনগুলতে এঁরা বেশিরভাগ-ই ছিলেন অত্যন্ত গরিব, এবং পার্টির কালচারালের সাথে হেড ব্যুরোর সদ্ভাব ছিলনা একেবারেই।
বড়পিসি ধমকে উঠে বললেন, 'আপনার মেয়ে পালিয়ে গেলে?!'
বড়বাবু ঢোঁক গিলে বললেন, 'দেখুন, আমি রুটিন কাজগুলো সেরে রাখি, আপনারা যখন জানতেনই যে এরকম ঘটার প্রপেন্সিটি আছে তো প্রিকশাস হতে পারতেন, এখন দুজনে পালিয়ে গেলে আমাদের হাত-পা বাঁধা।'
ইতিমধ্যে বাড়ির সামনে একটি বড় অস্টিন গাড়ি এসে দাঁড়াল। ভেতর থেকে নামলেন জিনস শার্ট পরিহিত শ্বশুর, ছিমছাম শাড়ি পরা শাশুড়ি আর দেবযানী ও তার দেবকুমার।
বাড়ির ছেলেরা তড়বড় করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গাজোয়ারির প্রসঙ্গ উত্থাপন করার আগের মুহূর্তে শ্বশুরমশাই আত্মপরিচয় দিতে শুরু করলেন, তিনি জানতেন চিন-যুদ্ধ অপেক্ষা করে আছে ওখানে তার জন্যে।
দেবকুমারের সাথে আলাপ স্কুলের সামনেই, একটু একটু করে অনেকদিন ধরে, দেবকুমার তখন পরা শেষ করে ওয়েল করপরেশানে চাকরিতে ঢুকেছে। নেহাতই কোন কারণ ছিল না পালাবার, শুধুমাত্র পেরেন্টাল ইগো অ্যাভএড করা ছাড়া।
বাড়ির ছেলেরা তড়বড় করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গাজোয়ারির প্রসঙ্গ উত্থাপন করার আগের মুহূর্তে শ্বশুরমশাই আত্মপরিচয় দিতে শুরু করলেন, তিনি জানতেন চিন-যুদ্ধ অপেক্ষা করে আছে ওখানে তার জন্যে।
দেবকুমারের সাথে আলাপ স্কুলের সামনেই, একটু একটু করে অনেকদিন ধরে, দেবকুমার তখন পরা শেষ করে ওয়েল করপরেশানে চাকরিতে ঢুকেছে। নেহাতই কোন কারণ ছিল না পালাবার, শুধুমাত্র পেরেন্টাল ইগো অ্যাভএড করা ছাড়া।
দেবযানী
জানত ও অঙ্ক পরীক্ষা ভাল দেয়নি। এটাও জানত যে আজ ও যেটা করতে চলেছ তাতে
পরিবারের বৃক্ষতন্তুতে অ্যাটমবম্ব পরবে। লেখাপড়ায় ব্রিলিয়ান্ট, লক্ষ্মী
ঠাকুরের মুখ কেটে বসান এইটুকুন মেয়ে টুয়েলভের বোর্ডস দিয়েই বাথরুমে গিয়ে
শাড়ি পরবে, অশোকা হলের বাইরেই গাড়িতে দেবকুমারের বাবা-মা বসে আছেন, এখান
থেকে সোজা দক্ষিণেশ্বর, তারপর মালাবদল। তারপর সন্ধেবেলা সদলবলে বাড়ি গিয়ে
মা-বাবার পায়ে ডাইভ।
(৪)
ভিড় ঠেলে বড়পিসি বেরিয়ে এলেন, এসেই বললেন,' কুটুম বাড়ি এসেছে কিছু মিষ্টি আন, এখানে আর গোল করিসনে, যা ভেতরে যা।'
বড়পিসির ওপরে কথা বলে এমন লোক সেই মুহূর্তে আমাদের পরিবারে কেউ বেঁছে ছিলনা। তিনি মুখ লুকিয়ে বললেন, 'ছেমড়ি পালিয়ে বে করেছে, বেশ করেছে, আমার মত অ্যাট-বছরে বে হবার থেকে অনেক ভাল।'
দেখলাম, পরিবারের অনেক মহিলার মুখে একটা অন্যরকম আলো। যেই আলোটার নাম 'হুরররররে...!'
বাবা এতক্ষণ কথা বলেননি, বললেন, 'তাহলে বিয়েবাড়িটা...'
- 'হ্যাঁ হ্যাঁ! সেই নিয়েই তো কথা বলার! একটু যদি চা হত...'
গোটা তিরিশেক লোক চুপচাপ সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গ্যাল। শুরু হল চায়ের ঝর্না আর দেখা গ্যাল চুরুটের মেঘ।
No comments:
Post a Comment