ডানদিকে ইউ-টার্ন নেওয়ার সময়ই পরদার ফাঁক দিয়ে চোখে পরেছিল পেট্রোল পাম্প! মানে টয়লেট। সতের বছর আগে এটি এখানে ছিলনা।
প্রায় ৬ ঘণ্টা একবারের তরেও বাস দাঁড়ায়নি। তার আগে যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেটি বিহার বর্ডার। সেখানে নামার কথা ভাবলে বুক কাঁপছিল ইন্দিরার। তারপর মনে হল ফাক ইট! গটগট করে নেমে, পেচ্ছাপ করে, এক ভাঁড় ঘন দুধের চা খেয়ে সিগারেটখোর কো-ড্রাইভারের সাথে মিনিট তিনেক আড্ডা মেরে বাসে উঠে মনে হচ্ছিল তার শরীরের ওজন অর্ধেক হয়ে গ্যাছে। কিন্তু শিলিগুড়ি আসার আগেই যে তার ডায়াবেটিস তাকে এইভাবে ডিসাপয়েন্ট করবে সেটা ভাবেনি।
মালদা থেকে ডালখোলা অব্দি রাস্তার ভয়ঙ্কর অবস্থা। এবারের বন্যায়। নাহলে গ্রিনলাইন সাড়ে আটটা বাজায় না। গত পনেরদিন ধরে ইন্টারনেট ঘেঁটে ঘেঁটে এই তথ্যটা রিভিউতে পড়ে পড়ে তারপর পরশুদিন টিকেট।
ইন্দিরার স্বামী দুবছর হল গত হয়েছেন, ইসোফেগাস ক্যান্সারে। তাঁরা চল্লিশ বছরের বেশী সময় ধরে বিবাহিত ছিলেন। দীলিপ রেলের সিভিলবাবু ছিলেন, বদলির চাকরি। দেশের বহু কোনায় সারাজীবন ধরে ঘুরে ঘুরে সংসার করেছেন। বেড়াবার নেশা শিরায় শিরায়। গত পাঁচবছর হল জীবন্মৃত দীলিপের এক্সপনেন্সিয়াল রেটে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া দেখতে দেখতে ডিপ্রেশানে বেশ কিছু অস্বাভাবিক কোপিং মেকানিজম ধরে নিয়েছিলেন। গুড়াখু, ঘুমের ওষুধ খেয়ে স্লিপ রেজিস্ট করে টাল খাওয়া, খাবারের অসম্ভব নোলা এই আর কি।
ষষ্ঠী থেকেই পেটের মধ্যে গুড়গুড়ানি হচ্ছিল। ছেলে মেয়েরা নাটি নাতনি নিয়ে বাড়ি এসেছে, সেই কদিন আর নতুন করে রিসার্চ করা হয়ে ওঠেনি। অষ্টমী তে সবাই সেজেগুজে বেরলেই তিনি লুকিয়ে টানা ট্রলিব্যাগ নিয়ে, সালওয়ার কামিজ পরে মেট্রো ধরে সোজা এসপ্ল্যানেড, বাসে উঠে মেয়েকে ফোনে মেসেজ করে জানালেন,
"Ami kodiner jonye baire jachhi. Amar khnoj nite hobe na.
Ami-i phone kore nebo tomader.
Bhalo katuk pujo."
পাঠিয়েই ফোন ফ্লাইট মোড।
জীবনে কোনদিনই চলন্ত ট্রেনে ঘুম আসেনি, বাসেও এলনা। জেগে থাকলে বেশীই পেচ্ছাপ পায়। পেট্রোল পাম্পের টয়লেটটা এতটাই নোংরা যে লোকে সেখানে কুত্তাও হাগাতে আনবেনা, সেখানে পেচ্ছাপ করে বেরিয়ে ইন্দিরার মনে হল পনের বছর আগে করা শেষ সেক্সের থেকে বেশী ভাল ক্লাইম্যাক্স।
লাল চা খেয়ে জাঙ্কশান থেকেই শেয়ার গাড়ি তে সামনের সিটে বসে সাড়ে তিন ঘণ্টায় গ্যাংটক।
এমজি মার্গে এসে মন মেজাজ ভাল হয়ে গেছিল। কতরকমের লোক সুন্দর সেজে অত্যন্ত সুন্দর ও পরিষ্কার রাস্তায় হেতে বেড়াচ্ছে, গোর্খাল্যান্ড মুভমেন্টের জন্যে আর সিকিমের সাথে মিলিট্যান্টসদের অসহযোগিতার কারণে পাহাড়ে গা ঘিনঘিনে টুরিস্ট কমই। সামনে দুটি লোক নেপালি সারেঙ্গী বাজিয়ে মিঠে গান ধরেছে, চারপাশে নানা রকম পসরা।
একটা হস্টেল ঠিক করেছিলেন সেই রাতের জন্যে, অত্যন্ত কম টাকায় বিদেশিরা সিকিম এলে ওখানে থাকে। বাঙ্কবেডের নিচের তলায় ট্রলি রেখে বললেন,
'আয়ম ফর কলকাতা, ট্রাভেলিং সোলো। আই গেস সিক্সটিন্থ টাইম ইন সিকিম। ইউ?'
ইজরায়েলী ভাঙ্গা ইংরাজিতে জানায় নাম লিয়া। তার আর্মি ভলান্তিয়ারিং শেষ হয়েছে গত মাসে, বিয়ে-প্রেম করার কাউকে পায়েনি। গ্রাফিক ডিজাইনিং পড়তে চায়। টার্ম এন্ডের টাকা নিয়ে ব্যাগ গুছিয়ে সোজা ভারতবর্ষ। দুমাস ধরে হিল্লি-দিল্লী ঘুরছে। এরপর এখান থেকে নেপাল হয়ে দেশে ফিরবে।
লিয়ার দেশের থেকে আনা কেক খেয়ে চোখ লেগে যাওয়ার পড়েও, ঠিক সকাল চারটেতে অ্যালার্মের শব্দে উঠলেন, জিনস আর পারকা গায়ে দিয়ে শীত শীত হাওয়ার মধ্যে হেঁটে সোজা বজ্র বাসস্ট্যান্ড। শেয়ার গাড়ির সামনে লিয়া আর ইন্দিরা। তিনি জানতেন না জঙ্গু যেতে পারমিট লাগে, তারপর যখন শুনলেন তখন মনে মনে ভাবলেন যা হওয়ার হবে।
লিয়া মনের আনন্দে পাহাড়ী বাচ্চা চটকাচ্ছে।
মঙ্গান পোঁছে লিয়া আর তার বন্ধুদের সাথে আরেকটা লোকাল জিপে আপার জঙ্গু। তাঁকে সিনিয়ার সিটিজেন পেয়ে খাতির, যত্নের কোন সীমাই নেই। হ্যাঁ, পাহাড়ে আসার পর থেকেই বাথরুমের সমস্যাটা মিটেছে। ড্রাইভারেরা চোখ লাল করে না। স্থানীয়দের বাথরুম অসচ্ছল হলেও পরিষ্কার। আর হাসি মুখ প্রায় সবাই। অপ্রাচুর্য আর ক্ষমাহীন প্রকৃতি হাসি বা জীবনীশক্তি ম্লান করে দেয়নি এখনো।
তাশি এইবার ভোটে দাঁড়াচ্চে সিকিম ক্রান্তিকারী পার্টির হয়ে যেখানে চামলিঙ্গ প্রায় এক দশক হারেনি। প্রত্যন্ত গ্রামে মেয়েরাই পঞ্চায়েতে দাঁড়ায়। বাড়ির তলায় মণিপুরি কিমোনো পরে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন, ইন্দিরা কে জড়িয়ে ধরলেন।
লিয়ারা ব্যাগ রেখেই ছুটতে গ্যালো চাষের জায়গা গুলোতে, এলাচের গন্ধে চারদিক মম। একটু নিচ দিয়ে প্রবল স্রোতে গর্জন করতে করতে পাহাড় কেটে এগিয়ে যাচ্ছে তিস্তা।
গরম জলে স্নান করতে করতে তিনি ভাবলেন যে ছেলে মেয়েরা কি কি রকম ভাবে টেনশান করছে, কিন্তু তার পরেই ভাবলেন সবে তো দেড় দিন হল। কাল সকালে না হয় ফোন করবেন।
জার্নির ক্লান্তি আর পালিয়ে আসার স্ট্রেস কেটেই গেছিল স্নান করে বেরিয়ে। বুকের কাছ টা একটু চিনচিন করছিল বটে।
পাশের কটেজে জার্মানরা চেট বেকারের 'আই ফল ইন লাভ টু ইজিলি' চালিয়েছে। জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলেন তিস্তার অপারের জঙ্গল টা ইমপেনেট্রেবল। কোনই আলো বা রাস্তা নেই।
তাশি এসে বলে গ্যালো কিচেনে তম্বা আর ঝাল শুয়োরের মাংস দেওয়া আছে। সবাই তাঁকে ডাকছে।
মুখ ফিরিয়ে ইন্দিরা তিস্তায় তাকিয়ে দেখলেন কলকাতার বাড়ি টা তিনি মনে করতে পারছেন না। ফোনে এক ফোঁটাও সিগনাল নেই।
কি আনন্দ!
প্রায় ৬ ঘণ্টা একবারের তরেও বাস দাঁড়ায়নি। তার আগে যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেটি বিহার বর্ডার। সেখানে নামার কথা ভাবলে বুক কাঁপছিল ইন্দিরার। তারপর মনে হল ফাক ইট! গটগট করে নেমে, পেচ্ছাপ করে, এক ভাঁড় ঘন দুধের চা খেয়ে সিগারেটখোর কো-ড্রাইভারের সাথে মিনিট তিনেক আড্ডা মেরে বাসে উঠে মনে হচ্ছিল তার শরীরের ওজন অর্ধেক হয়ে গ্যাছে। কিন্তু শিলিগুড়ি আসার আগেই যে তার ডায়াবেটিস তাকে এইভাবে ডিসাপয়েন্ট করবে সেটা ভাবেনি।
মালদা থেকে ডালখোলা অব্দি রাস্তার ভয়ঙ্কর অবস্থা। এবারের বন্যায়। নাহলে গ্রিনলাইন সাড়ে আটটা বাজায় না। গত পনেরদিন ধরে ইন্টারনেট ঘেঁটে ঘেঁটে এই তথ্যটা রিভিউতে পড়ে পড়ে তারপর পরশুদিন টিকেট।
ইন্দিরার স্বামী দুবছর হল গত হয়েছেন, ইসোফেগাস ক্যান্সারে। তাঁরা চল্লিশ বছরের বেশী সময় ধরে বিবাহিত ছিলেন। দীলিপ রেলের সিভিলবাবু ছিলেন, বদলির চাকরি। দেশের বহু কোনায় সারাজীবন ধরে ঘুরে ঘুরে সংসার করেছেন। বেড়াবার নেশা শিরায় শিরায়। গত পাঁচবছর হল জীবন্মৃত দীলিপের এক্সপনেন্সিয়াল রেটে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া দেখতে দেখতে ডিপ্রেশানে বেশ কিছু অস্বাভাবিক কোপিং মেকানিজম ধরে নিয়েছিলেন। গুড়াখু, ঘুমের ওষুধ খেয়ে স্লিপ রেজিস্ট করে টাল খাওয়া, খাবারের অসম্ভব নোলা এই আর কি।
ষষ্ঠী থেকেই পেটের মধ্যে গুড়গুড়ানি হচ্ছিল। ছেলে মেয়েরা নাটি নাতনি নিয়ে বাড়ি এসেছে, সেই কদিন আর নতুন করে রিসার্চ করা হয়ে ওঠেনি। অষ্টমী তে সবাই সেজেগুজে বেরলেই তিনি লুকিয়ে টানা ট্রলিব্যাগ নিয়ে, সালওয়ার কামিজ পরে মেট্রো ধরে সোজা এসপ্ল্যানেড, বাসে উঠে মেয়েকে ফোনে মেসেজ করে জানালেন,
"Ami kodiner jonye baire jachhi. Amar khnoj nite hobe na.
Ami-i phone kore nebo tomader.
Bhalo katuk pujo."
পাঠিয়েই ফোন ফ্লাইট মোড।
জীবনে কোনদিনই চলন্ত ট্রেনে ঘুম আসেনি, বাসেও এলনা। জেগে থাকলে বেশীই পেচ্ছাপ পায়। পেট্রোল পাম্পের টয়লেটটা এতটাই নোংরা যে লোকে সেখানে কুত্তাও হাগাতে আনবেনা, সেখানে পেচ্ছাপ করে বেরিয়ে ইন্দিরার মনে হল পনের বছর আগে করা শেষ সেক্সের থেকে বেশী ভাল ক্লাইম্যাক্স।
লাল চা খেয়ে জাঙ্কশান থেকেই শেয়ার গাড়ি তে সামনের সিটে বসে সাড়ে তিন ঘণ্টায় গ্যাংটক।
এমজি মার্গে এসে মন মেজাজ ভাল হয়ে গেছিল। কতরকমের লোক সুন্দর সেজে অত্যন্ত সুন্দর ও পরিষ্কার রাস্তায় হেতে বেড়াচ্ছে, গোর্খাল্যান্ড মুভমেন্টের জন্যে আর সিকিমের সাথে মিলিট্যান্টসদের অসহযোগিতার কারণে পাহাড়ে গা ঘিনঘিনে টুরিস্ট কমই। সামনে দুটি লোক নেপালি সারেঙ্গী বাজিয়ে মিঠে গান ধরেছে, চারপাশে নানা রকম পসরা।
একটা হস্টেল ঠিক করেছিলেন সেই রাতের জন্যে, অত্যন্ত কম টাকায় বিদেশিরা সিকিম এলে ওখানে থাকে। বাঙ্কবেডের নিচের তলায় ট্রলি রেখে বললেন,
'আয়ম ফর কলকাতা, ট্রাভেলিং সোলো। আই গেস সিক্সটিন্থ টাইম ইন সিকিম। ইউ?'
ইজরায়েলী ভাঙ্গা ইংরাজিতে জানায় নাম লিয়া। তার আর্মি ভলান্তিয়ারিং শেষ হয়েছে গত মাসে, বিয়ে-প্রেম করার কাউকে পায়েনি। গ্রাফিক ডিজাইনিং পড়তে চায়। টার্ম এন্ডের টাকা নিয়ে ব্যাগ গুছিয়ে সোজা ভারতবর্ষ। দুমাস ধরে হিল্লি-দিল্লী ঘুরছে। এরপর এখান থেকে নেপাল হয়ে দেশে ফিরবে।
লিয়ার দেশের থেকে আনা কেক খেয়ে চোখ লেগে যাওয়ার পড়েও, ঠিক সকাল চারটেতে অ্যালার্মের শব্দে উঠলেন, জিনস আর পারকা গায়ে দিয়ে শীত শীত হাওয়ার মধ্যে হেঁটে সোজা বজ্র বাসস্ট্যান্ড। শেয়ার গাড়ির সামনে লিয়া আর ইন্দিরা। তিনি জানতেন না জঙ্গু যেতে পারমিট লাগে, তারপর যখন শুনলেন তখন মনে মনে ভাবলেন যা হওয়ার হবে।
লিয়া মনের আনন্দে পাহাড়ী বাচ্চা চটকাচ্ছে।
মঙ্গান পোঁছে লিয়া আর তার বন্ধুদের সাথে আরেকটা লোকাল জিপে আপার জঙ্গু। তাঁকে সিনিয়ার সিটিজেন পেয়ে খাতির, যত্নের কোন সীমাই নেই। হ্যাঁ, পাহাড়ে আসার পর থেকেই বাথরুমের সমস্যাটা মিটেছে। ড্রাইভারেরা চোখ লাল করে না। স্থানীয়দের বাথরুম অসচ্ছল হলেও পরিষ্কার। আর হাসি মুখ প্রায় সবাই। অপ্রাচুর্য আর ক্ষমাহীন প্রকৃতি হাসি বা জীবনীশক্তি ম্লান করে দেয়নি এখনো।
তাশি এইবার ভোটে দাঁড়াচ্চে সিকিম ক্রান্তিকারী পার্টির হয়ে যেখানে চামলিঙ্গ প্রায় এক দশক হারেনি। প্রত্যন্ত গ্রামে মেয়েরাই পঞ্চায়েতে দাঁড়ায়। বাড়ির তলায় মণিপুরি কিমোনো পরে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন, ইন্দিরা কে জড়িয়ে ধরলেন।
লিয়ারা ব্যাগ রেখেই ছুটতে গ্যালো চাষের জায়গা গুলোতে, এলাচের গন্ধে চারদিক মম। একটু নিচ দিয়ে প্রবল স্রোতে গর্জন করতে করতে পাহাড় কেটে এগিয়ে যাচ্ছে তিস্তা।
গরম জলে স্নান করতে করতে তিনি ভাবলেন যে ছেলে মেয়েরা কি কি রকম ভাবে টেনশান করছে, কিন্তু তার পরেই ভাবলেন সবে তো দেড় দিন হল। কাল সকালে না হয় ফোন করবেন।
জার্নির ক্লান্তি আর পালিয়ে আসার স্ট্রেস কেটেই গেছিল স্নান করে বেরিয়ে। বুকের কাছ টা একটু চিনচিন করছিল বটে।
পাশের কটেজে জার্মানরা চেট বেকারের 'আই ফল ইন লাভ টু ইজিলি' চালিয়েছে। জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলেন তিস্তার অপারের জঙ্গল টা ইমপেনেট্রেবল। কোনই আলো বা রাস্তা নেই।
তাশি এসে বলে গ্যালো কিচেনে তম্বা আর ঝাল শুয়োরের মাংস দেওয়া আছে। সবাই তাঁকে ডাকছে।
মুখ ফিরিয়ে ইন্দিরা তিস্তায় তাকিয়ে দেখলেন কলকাতার বাড়ি টা তিনি মনে করতে পারছেন না। ফোনে এক ফোঁটাও সিগনাল নেই।
কি আনন্দ!
No comments:
Post a Comment