Saturday, September 27, 2014

বিস্কিটস অল অ্যারাউন্ড!


(১)


আজকাল কিছু কিছু মানুষ দেখা যাচ্ছে যারা গ্র্যানচেষ্টার মেডোর সরলরৈখিক, একটানা, মোনোটোনাস পাখির ডাকের মত নিস্পন্দ জীবন কিছুতেই মেনে নিতে পারেনা। বাংলা চার্জ করার মত তাদের জীবনে হঠাৎ হঠাৎ ইমপালসের প্রয়োজন হয়।হঠাৎ রাগ, অভিমান - ধাঁ-ধাঁ করে রাগ বেড়ে গিয়ে সীলিং ফ্যান ছুঁয়ে, গ্যাস চিমনীর আউটলেট আর রেন-পাইপ হয়ে ব্রাউনিয়ান মোশানে ঊর্ধ্বগামী সেই এক্সপ্রেসান শহরের আকাশে অজস্র লাল, শাদা, গরীব, গোবেচারা, বিরক্ত, বদমেজাজি, ফ্যাকাসে, রোগজীর্ণ, ব্রাইট ইয়েলো আর আরও স্ক্যাটারড, রঙিন  নানা শব্দের সাথে মিশে প্রকৃতি কে বাধ্য করায় বৃষ্টি নামাতে। কনডেনসেশান আর কি। তখনই সেই রাগ নিমেষে হয় অদৃশ্য। তীব্র হয় আদর। তীক্ষ্ণ হয় অভিমান। সাইন ওয়েভের মত একবার জড়দ্গব আর একবার ভয়ানক ইম্যোশানালী অ্যাকটিভ ট্রিগারড উইথ সাডন ইমপালস, এরকম মানুষের মেইন বিপত্তি টা এখানেই যে এরা ধীরে ধীরে হাই আর লো, আউটবারস্ট আর ডীপ্রেশানের এই চক্রাকার আবর্তে বন্দি হয়ে সারাজীবন ইমপালস হাঙরী হয়েই কাটিয়ে দেয়।
"এই সময় টা বড় ভাঙ্গাচোরার। মানুষ বুঝেই উঠছে না যে কোনদিকে যাবে। নিও-কন্স্যুমারিস্যম না ট্রেডিশানাল ভ্যালুস। এই সময় ভাল সাহিত্য, গান, কবিতা, সিনেমা হয় না। হতে পারে না। মানুষ দুটো সময় পোঁদ ফাটিয়ে লেখে : (১) যখন ধ্বংসের মুখোমুখি হয়। (২) যখন সুসময় বিরাজ করে। আর্ট ফর দ্য সেক অফ আর্ট। এছাড়া হয় না। তাই এইসময় টা যাই লেখ না কেন তার মূল্য ৫ বছর পর আর থাকবে না। তাই, পড়। শুধুই পড় এখন।" 
দ্যাটস হোয়াট মাই ফাদার টেলস মি।
সে যাই হোক। আমার মনে হয় পৃথিবীর যত বয়স বাড়বে, ভাবনার জগতে যত ডাইলিউশান আসবে, প্রযুক্তি যত উন্নত হবে, জীবন যত ক্যাপিটালিস্ট মনভাবাপন্নতায় আচ্ছন্ন আর ইচ্ছের ডাইরেকশান যত মেটিরিয়ালিস্টিক হবে মানুষ তত এই বাই-পোলারিটির গোলোকধাঁধায় চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে মেশিন হয়ে যেতে থাকবে, যার দুটো মাত্র স্টেট। অন আর অফ। 


(২)

যখন এইসব আলবাল চিন্তা আমার মাথায় ঘুরছিল তখন আমি মিছিল-ফেরত যাদবপুর রেল-কলোনীতে গোবিন্দ দার চায়ের দোকানে কজন বন্ধুর সাথে। মিছিল তো না, মহামিছিল। কেউ বলছে লাখ, কেউ বলছে চল্লিশ হাজার। আমিও এক-দুবার ভেবেছিলাম যে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে এলাম কিনা। তারপর অন্যরকম কাজে ব্যাস্ত হয়ে পরে আর আমল দিই নি।
গোবিন্দ দার চায়ের দোকান কিন্তু বহু ইতিহাসের সাক্ষী। এখানে চেয়ার গরম করে গেছেন বহু বুদ্ধিজীবী, এক্স-নকশাল, এক্স-পি.এল.টি, সিপিএম, তৃণমূল, কংগ্রেস, শিক্ষক, আঁকিয়ে, ছাত্র, লেখক, প্রেমিক, তার্কিক এবং জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বহু সাধারন চাকুরীজীবী ও বেকার। চায়ের দোকান এই দু হাজার চোদ্দ তেও সবরকম ভাবে স্যানেটোরিয়াম, থিঙ্কারস ক্লাব আর একটা সাময়িক এস্কেপ। পায়ের তলায় গুটিয়ে রাখা আছে জলে ভেজা কিছু পোষ্টার। কয়েকটা পোষ্টার যদিও আমরা মেয়ো রোড আর পার্ক স্ট্রিটের ক্রসিং এ ফেলে রেখে এসেছিলাম। যখন কলকাতার হৃদপিণ্ড স্তব্ধ হয়ে গেছিলো ছাত্র ব্যারিকেডে। ড্রাগনের মুখটা যখন রাজভবনের সামনে তখন লেজ টা এক্সাইডের বাইরে আছড়ে পড়ছে। 
বহিরাগত আমরা। পইপই করে নিজেদের কলেজের বাচ্ছাদের বলেছিলাম, ভিসি আর কলেজভিত্তিক স্লোগান আর পোষ্টার না করে অ্যান্টি-এস্ট্যাবলিশমেন্ট টাকে ফুটিয়ে তোল। প্রটেস্ট এগেন্সট দ্য সিস্টেম হুইচ ইন্সটিগেটেড দ্য পুলিস ব্রুটালিটি। যারা গুন্ডা দিয়ে ছাত্র ক্যালায় তাদের জোর গলায় ফ্যাসিস্ট বলে চিহ্নিত কর। ভিসি তো ওদেরই শত শুঁড়ওয়ালা সিস্টেমের একটা লোয়ার এন্ড। কান টেনে মাথা আনার চেয়ে ডিরেক্ট হেড-সট। তবে এই সময় টা তো আর মুক্তির দশক না। বসন্তের বজ্রনির্ঘোষও শোনা যাচ্ছে না। হাজার হাজার ছাত্র কোন সিম্বল, ব্যানার, স্বার্থ ছাড়াই যে আন্দোলনের শরীক হল, তাতে আলাদা করে তো চিন-ভিয়েতনাম থেকে বারুদ আমদানি করতে হয়না, শুধু যদি... শুধু যদি...
পৎ পৎ পৎ পৎ
পৎ পৎ পৎ পৎ
পৎ পৎ পৎ পৎ ...
(৩)


- ইঁদুর দের ইতিহাস যেমনি দারুন গৌরবান্বিত আর তেমনি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। আফ্রিকার জঙ্গলেই হোক বা বলিভিয়ার, যখনি বুনো বেড়াল বেড়ে যায় তখনি তারা জোট বেঁধে ঘুরে দাঁড়ায়। কিন্তু ইঁদুর মানেই তো আর নর্মাল ইঁদুর না। সাদা, কালো, নেংটি, ধেড়ে, ধেনো, বাদামী, মেটে সব রকম ইদুরের নিজস্বতা আছে। সমশ্রেণীভুক্ত মানেই সারসার জলপাই জামা পড়া স্ট্রেট-ফেস সেনাবাহিনী তো নয়। সাদা ইঁদুর যদি কাঠ গুঁড়োয় গড়াগড়ি খেতে ভালবাসে তাহলে ধেনো ইঁদুর রোজ রাজে ধানক্ষেতের ধারে নিজের গর্তে শুয়ে পিঙ্ক ফ্লয়েড শোনে। তাই তারা যদি একসাথে মিলে কোন একদিন বেড়াল খাবে বলে ঠিক করে তাহলে তাদের এই সুপারফিসিয়াল ডিফারেন্সগুলো ওভারকাম করতে হবে। সেইজন্যেই তো কদম কদম বড়ায়ে যা... সেইজন্যেই তো লেফট রাইট লেফট... আর তার থেকেও বড় কথা তার জন্যে এক বা একাধিক ধেড়ে ইদুরকে ভ্যানগার্ডে দাঁড়াতে হবে। ম্যান্স রেইডার এমনি এমনি সবকটা ওয়াইল্ডলিং কে জড় করে বিশাল বাহিনি বানায়নি। সে তাদের রিয়ালিটি চেক দিয়েছিলো, যে এরপর যখন শীত আসবে তখন ওয়ালের ভেতরে চলে আসতে না পারলে সমূহ বিপদ।

- আরে, এটা একটা স্পন্টেনিয়াস মুভমেন্ট, এটা লিডারলেস, সবাই চেয়েছিল এটা হোক। অ্যান্ড ইটস জাস্ট হ্যাপেনিং। এতে কোন রাজনীতির গন্ধ নেই।

- শেষবার যখন এরকমটা হয়েছিল তখন এই আন্দোলন টার নামছিল ফ্রেঞ্চ রেভলিউশান। আর সেটা সম্পর্কে তো আমরা সবাই জানি। তবে হ্যাঁ, সেক্ষেত্রে সমগ্র জনগন সেটাতে সামিল ছিল আর এক্ষেত্রে শুধু ছাত্ররা। কিছু ব্যাবসায়ী, যাদের আমরা বুদ্ধিজীবি বলে চিনি তারা আর কিছু শিক্ষাবিদ ছাড়া বাকি এন্টায়ার মধ্যবয়েসি, বুড়ো বুড়ি আর বাকি এজ গ্রুপ কিন্তু এখন এবিপি আনন্দতে আটকে আছে। অ্যাটলিস্ট আশি শতাংশ।

- কি জানি বাবা। আমাদের সময় হলে তো এতক্ষণে লাশ পরে যেত কত। পোষ্টারে পোষ্টারে দেওয়াল ছেয়ে যেত।

- পোষ্টার তো পড়ছে দাদু, দেখছো না? এখনও খুবই কন্সট্রিক্টেড জায়গায়, কিন্তু পড়ছে। দেওয়াল আঁকা হচ্ছে। লেখালিখি তে ওয়েবস্পেস ভর্তি।

- এইজন্যেই এই জেনারেশানটার আলটিমেটলি কিছু হবে না। সারাদিন আন্দোলন, অবস্থান করে রাতে বাড়ি এসে ফেসবুক করলে আর কি করে হবে?

- স্যার, এই মুহূর্তে ফ্রান্স, লিবিয়া, বাংলাদেশ এই সব কটা সোসিও-পলিটিক্যাল মুভমেন্টে কিন্তু ফেসবুকের হাত কম নেই। সোস্যাল মিডিয়া একটা বড় অস্ত্র। 

- কিন্তু কাজের কাজ কি হচ্ছে? তৃণমূল সরকার তো সেই কিনেই নিল। জাজ কিনল, মেয়েটার বাবা কে কিনে মিথ্যা বলালো কামদুনি মডেলে। বিরোধীরা যত পারছে ক্যাশ করছে, যে যেভাবে পারছে এটা নিয়ে একটু ব্যাবসা করে নিচ্ছে। এইভাবে হবে কিছু?

- প্রতিটা আন্দোলনের একটা ইল্ড পয়েন্ট হয়। সেটা হচ্ছে এই যে জেনারেশানটা, মানে আমাদের কথা, আমরা যখন আপনাদের জায়গায় আসব তখন কি তৃণমূল একটাও ভোট পাবে? গণতান্ত্রিক ভাবেই সেই তো পরিবর্তন হবেই। লাশ ফেলতে গেলে অনেক কোল্যাটেরাল ড্যামেজ হয়। নিরীহ মানুষ বেশি মরে। তৃণমূল এমনিতেও যাবে। সারদাই ওদের পোঁদ টা মেরে দেবে।



(৪)

গোবিন্দদা অনেকক্ষণ একটা খাস্তা বিস্কুটের কৌটো খুলতে পারছিলো না। সেটাই সবাই হাতে হাতে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চেষ্টা করছিলো খোলার। 
খুব ছোটবেলায় আমাদের একজন স্যার একটা নাটক করিয়েছিলেন, যার মূল বক্তব্য ছিল এরকম যে, একটা গ্রামের প্রান্তে একটা বাঘ গ্রামবাসীদের ওপর খুবই দাদাগিরি দেখায়, প্রতি অমাবস্যায় তাকে একটি করে জ্যান্ত মানুষ ভেট দিতে হয়, নাহলেই সে নানারকম অত্যাচার করে। জেই চেষ্টা করে বাঘ টার লাশ ফেলার সেই আর ফিরে আসেনা গ্রামে। নাটকের প্রোটাগনিস্ট চলে বাঘ মারতে তার বাপ-মা, লাভ-ইন্টারেস্ট সব্বার শত বারণ উপেক্ষা করে এবং বাঘ টাকে মেরেও ফ্যালে। কিন্তু মারার পরমুহূর্তেই সে দেখল তার গায়ে ডোরা কাটা দাগ আর তার দাঁত নখে আদীম শক্তির নির্যাস। তার পর সে গুহার বাইরে বেরিয়ে এসে বজ্রহুঙ্কারে সেই প্রাচীন অভিশাপের অস্তিত্বর কথা মনে করিয়ে দেয়। মানে টা ইন্টারপ্রেট করাও বেশ সহজ। 
"মাউন্টব্যাটন সাহেব ও/তোমার সাধের ব্যাটন কার হাতে তুইল্যা দিলা গো?"

এর মধ্যে কিন্তু বিস্কুটের কৌটো টা খুলেও গ্যাছে। যে খুলেছে সে সবাইকে দারুন খুশি হয়ে বিস্কুটের হরিরলুট দিচ্ছে। কিন্তু আমার মনে হল ছেলে-বুড়ো সব্বার হাতের অল্প অল্প চাড়েই আলটিমেটলি সেই শতাব্দী প্রাচীন জট খুলেছে। সায়ন আমার হাতে দুটো নেড়ো গুঁজে দিয়ে বলল, 'ভাই, বিস্কিটস অল অ্যারাউন্ড!বিস্কিটস অল অ্যারাউন্ড!''। হোক কলরব!








Sunday, September 14, 2014

ভালুকপং

আমি গত বাইশ বছর এইভাবে কারুর নগ্ন শরীর আঁকড়ে ধরে শুয়ে থাকতে চাইনি। এর আগে যে আমি নারীশরীর-বর্জিত ছিলাম তা নয়। কিন্তু নিঃশব্দ বিস্ফোরণ এই প্রথম।

পেটের মধ্যে গজগজ করছে সস্তা হুইস্কি, আধা ঘণ্টা আগে টানা শেষ জয়েন্ট টার ধোঁওয়া টা এখন আর্কিমিডিয়ান স্পাইরাল হয়ে বন্ধ সীলিং ফ্যানটার কাছে থমকিয়ে আছে।  সেপ্টেম্বরের লিকুইফায়েড গরমেও পাখা না চালানোর দুটো কারন। এক, মোবাইলের দুর্বল স্পিকারে 'অ্যাটম হার্ট মাদার' চলছিলো, ফ্যানের যান্ত্রিক শব্দ টা এড়ানোর চেষ্টা টা নিতান্তই জাস্টিফায়েড। দুই, গাঁজা গরম কম লাগায়। ভাড়া বাড়ি টার বারান্দায় জয়েন্ট টা মারতে ভয় ভয়-ই লাগছিলো, কারন গাঁজার হাল্কা ধোঁওয়া উপরে ওঠে। আর উপরেই কাঠবাঙাল রেল কলোনি পরিবারের মেজ বউয়ের রান্নাঘর। যে ফ্ল্যাটটায় আমরা ভাড়া থাকি সেটা তাদের পাওনা ছিল। কিন্তু মেজ ছেলের হতশ্রী ব্যাবসার অবস্থা আর স্টেশানের পাশেই বাংলার ঠেক টায় ঘন ঘন যাতায়াত দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পরিবারের কর্তা ঠিক করলেন যে ভাড়া দিয়ে কয়েক টা বাড়তি টাকা বাড়ি তে এলে ভালই, তদ্দিন নাহয় সো কলড একান্নবর্তী হয়েই থাকা যাক। এইসব কথা যদিও আমি ডিরেক্টলী শুনিনি। ওপরের বাড়ির বাচ্চা মেয়েটা আমার বোনের সাথে অঙ্ক করে। শুয়ে শুয়ে বাঁ দিকের জানলা দিয়ে দেখতে পাচ্ছিলাম বিকেল টা পাংশুটে, কিন্তু আমার মনে হচ্ছিলো আমার আসে পাশের প্রাইভেট ইউনিভারস টা উত্তর থেকে দক্ষিনে গাঢ় ভারমিলিয়ান থেকে শুরু করে বেগুলি অব্দি বিভিন্ন রঙের সংমিশ্রণে এক অপরিসীম পরিপূর্ণতা পেয়েছে।

আজকাল মানুষ একধরনের চৌকো বাক্স সঙ্গে নিয়ে জন্মায়, একটা আবস্ট্রাকট থ্রিডি বডী, যার প্রতি টা প্লেন এক একটা লিমিটেশান। শরীর টা বাড়তে থাকে তাদের কিন্তু বাক্সটার আয়তন আর বাড়ে না। আর তাদের সম্পূর্ণ বাচ্চাবেলা টাই কেটে যায় এই বাক্সের মধ্যে। কেউ কেউ বড় হয় বাক্সটার মধ্যেই, ইনার ওয়ালস গুলো রঙ করে সংসার পাতে, তাদের সুখ দুঃখ হাসি কান্না সব-ই বাক্সটার মধ্যেই চাপা পরে থাকে। তারপর প্রকৃতির নিয়মে আসে সন্তান সন্ততি। নিজেদের বাক্স গুলো নিয়ে। বাক্সের মধ্যে বাক্স জিওমেট্রিক্যাল প্রগ্রেশানে বাড়তে থাকে। শহরের মধ্যে শহর জন্ম নেয়, পাড়ার মধ্যে পাড়া, পরিবারের মধ্যে পরিবার, মানুষের মধ্যে মানুষ। সেই প্রতিটা খণ্ডের মধ্যে কানেক্টিং টিউবস থাকে সেগুলো আবার কিনা বেসিক আদানপ্রদান প্রক্রিয়া টাকেও ফিলটার করে। সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক প্রকাণ্ড অটোমেটেড সিস্টেম। চোখের সামনে ভাসতে থাকে নানান ইমেজারিস।
হঠাৎ ঘোর কেটে ফিরে এলাম সেই বিছানা, আলমারি, কম্পিউটার টেবিল এর মাঝখানে ছোটো জায়গাটায়, যেখানে গত চার ঘণ্টা ধরে দুটো হুইস্কি পাঁইট, গৌরভাঙ্গা থেকে স্কোর করা অফুরন্ত গাঁজা আর সামান্য কিছু শুকনো খাবার নিয়ে আমরা সাময়িক সংসার পেতেছিলাম।রাইয়ের তীব্র নিঃশ্বাস তখন ঠাণ্ডা হয়ে আসছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম সে তন্দ্রাছন্ন। যদিও পনেরো মিনিট আগে অব্দি, "প্লিজ আরেকটা জয়েন্ট বানা, প্লিজ প্লিজ, আই রিলি ডোন্ট ওয়ান্ট টু স্লীপ অফ নাও...' বলে যাচ্ছিলো। আমি তখনও ভয়ানক স্টোন্ড।

ফ্রিজের মধ্যে গোলমরিচ আর ভিনিগার দিয়ে সামান্য চিকেন ম্যারিনেট করে রাখা আছে। রাই বলেছিল ও এসে ডাল আর চিকেন টা বানাবে। যদিও ও হাতেগোনা চার-পাঁচটা রান্নাই পারে। তবে ওকে ঐটুকু ময়দান ছেড়ে দিতে আমি ভীষণ ভালবাসি।

প্রেম না করার বেশ কিছু সুবিধা আছে, তার মধ্যে একটা হল ইনকনসিসটেন্সি। এমনি কোন একদিন আমি আর রাই 'বিফোর' সিরিজের তিনটে সিনেমা টানা দেখে উঠে নিরবাক হয়ে বসেছিলাম। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট খেয়ে ঘরে এসে 'জানিস তো..' বলে অনেক কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, রাই আচমকাই ঝাঁপিয়ে পরে আমায় চুমু খেল। তারপর টানা দশ মিনিট ধরে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের ভাষায় 'হাবড়ে চুমু খাওয়ার' পরও কোনোরকম  অস্বচ্ছতা তৈরি হয়নি। তারপর আমরা রেল লাইন ধরে হেঁটে হেঁটে সেলিমপুর অব্দি গিয়ে ওকে বাসে উঠিয়ে দিয়ে এসেছি। যদিও পুরো হাঁটা রাস্তাটাই রাই নিঃশব্দই ছিল। আমিও ঘাঁটাইনি। আবার একদিন, রাই এর রাজারহাটের বিরাট ফাঁকা ফ্ল্যাটটায় নিউ-ইয়ারের পার্টির দিন সবার থেকে আলাদা করে এনে চুমু খাওয়ার চেষ্টা করতেই রাই বিদ্যুৎগতিতে আমাকে বাধা দিল।
-ইউ আর আ ফাকিং মনস্টার!
সেদিন সারা রাত আমি দুলে বলে একটা ডিজেনারেটের সাথে বসে প্রচুর চরস আর বাংলা মদ খেয়ে শেষ রাতে নাড়ি উলটিয়ে বমি করে,পরদিন বিকেলে টলতে টলতে বাড়ি ফিরেছি।
রাই একটি বারও আমার পাশে এসে বসেনি। আমি আর রাই কে বোঝার চেষ্টাও করিনি।
আজকের দিনের অকালবোধন টা তাই ভীষণ জরুরি ছিল।

মা, কুটি আর স্যার বেড়াতে গেছে ৩ দিন হল। দু কামরার ভাড়া বাড়ি টা এখন আমার সাম্রাজ্য। মা-র রেখে যাওয়া টাকার অধিকাংশই শেষ। মেইনলি হুইস্কি আর চরস কিনে। গতমাসে শপাঁচেক ধার ছিল, গোটা চারেক বই কিনেছিলাম। সেগুলোরও খানিকটা শোধ করতে হয়েছে।

-শোন, 'স্যার' ডাক টা সাউন্ডস ভেরি উইয়ারড। কল হিম 'স্টেপ ফাদার'।
-বাজে কথা বলিস না তো। লাস্ট ৯ ঘণ্টা সোবার আছি। বাড়ি তে কোনো রান্না করা খাবার নেই। প্লিজ আয়?
-দেরি হবে কিন্তু। কিছু একটা খা ততক্ষণ।
-হোক দেরি। জাস্ট আয়।

খুব সন্তর্পণে হাতড়ে হাতড়ে সিগারেটের প্যাকেট টা খুঁজে বের করে হঠাৎ খেয়াল করলাম সন্ধে হয়ে গেছে। রাইয়ের শরীর টা প্রায় অন্ধকারে অদৃশ্য।আমার বাঁ হাতের উপর রাইয়ের ছোট্ট মাথা, খেয়াল করে দেখলাম রাই হাঁ করে ঘুমায়। যাদের রেস্পিরেটরি ট্র্যাকে ব্লকেজ থাকে তারা হাঁ করে ঘুমায়। শি শুড রিয়েলি রিডিউস স্মোকিং।

সিগারেট জ্বালাবার শব্দেই চোখ খুলে বাঁ দিকে ফিরে শুয়ে রাই বলল, 'হ্যাভ ইউ এভার বিন টু আরুনাচাল?'
আমি মা আর কুটির সাথে এই ভাড়া বারিতে উঠে আসার আগে আরও একটু দক্ষিনে একটা ছিমছাম দুতলা বাড়িতে থাকতাম। জন্ম, স্কুল, প্রথম প্রেম, চুমু, কলেজ, সিগারেট, মাইন্ড অল্টারিং কেমিক্যাল, বাবা মার বিচ্ছেদ সব-ই এ শহরেই। ভীষণ ম্যাগনেটিক কোন পদার্থও তার ইন্টেনসিটি হারায় অচিরেই। হঠাৎ মনে হল আমি এই শহর টা এই মুহূর্তে ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্যে সব রকম ভাবে প্রস্তুত।

আই ওয়াজ লেট। আমার উত্তর না পেয়ে রাই সটান উঠে এদিক ওদিকে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন স্তরের পোশাকগুলো জড় করে বাথরুমে ঢুকে গেল, আমাকে কোনোরকম ভাবে রি অ্যাক্ট করার সুযোগ না দিয়েই।

আমার  হঠাৎ মনে হল আমি উলঙ্গ হয়ে কলকাতার কোন প্রচন্ড ব্যাস্ত চারমাথার ক্রসিং-এ দাঁড়িয়ে আছি। রাস্তা দিয়ে অন্য মনস্ক ভাবে হেঁটে যেতে যেতে যে সমস্ত মুখ গুলো আমাদের চারপাশে ফিকে রঙের মত আনইম্পরট্যান্ট সাবজেক্টিভ কন্টেন্ট হয়েই থেকে যায় তারা আজ আমাকে দেখে উদ্বাহু হয়ে ভাসানের নাচ নাচছে, চিৎকার করে নানান অজানা ভাষায় আমাকে উদ্দেশ করে সম্ভবত গালি-ই দিচ্ছে। এই ভিড়ের মধ্যে থেকে এক টা বাচ্চা ছেলে এগিয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল, যার মুখের আদল হুবহু আমার ছেলেবেলাকার। তার বজ্রআলিঙ্গন আমার দম বন্ধ করিয়ে দিচ্ছে, আমার সারা শরীর ঘাম এ ভেজা, বাচ্ছাটি হোহো করে হেসেই যাচ্ছে... হাসির সব্দ...স্যার...স্যারের মত।
-দ্বৈপা!
 সম্বিত ফিরে পেয়ে দেখলাম আমি খাটে বসে আছি, ল্যাংটো, সিগারেট টা হাতেই পুড়ছে।
- ইউ শুড রিয়েলি কাম টু ভালুকপং ওয়ান্স, দ্য প্লেস আই ওয়াজ বর্ণ।
বাথরুম থেকে শাওয়ারের শব্দ। আমি আস্তে আস্তে এগিয়ে গেলাম সেই দিকেই।







Saturday, September 13, 2014

হাই-ড্রেন

সবার আগে দুটো জিনিস ক্লিয়ার করে নি।
এক, আমি ভয়ঙ্কর ভাবে প্রাদেশিক, স্বভিনিস্ট, নির্লজ্জ ভাবে ইনক্লাইন্ড টুওয়ার্ডস সেক্স এবং মানুষের প্রতি সম্মান আমার খুবই কম। 
দুই, হবে না ভাই। পোঁদ পিঁয়াজি টা হবেনা।

রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিলাম। চোখের সামনে গরু ছাগলের মত একপাল মানুষ, প্যাঁ পোঁ ঘ্যাস ঘ্যাস অটো, রিকশা, অনুচ্চারিত খিস্তি, গরম আওয়াজ (প্রশ্ন উঠতে পারে আওয়াজ কি করে গরম হয়। সেক্ষেত্রে আমি প্রশ্নকর্তার ইম্যাজিনেশান নিয়ে প্রশ্ন তুলব। তর্ক টা দীর্ঘতর হবে, অনাবশ্যক কথা বাড়বে এবং আলটিমেটলি আমাদের দুজনকেই ভয়ানক ইন্টেলেকচুয়াল মনে হবে। তাই থাক। তর্ক তোলা থাকলো। শব্দ গরম হয়, ঠাণ্ডা হয়, লাল, নীল, সবুজ, কালো, হিংসুটে, বিষাক্ত, এরকম আর অনেক কিছু হয়।), ল্যাংটো বাচ্চা, হাই-ড্রেন, ধোঁওয়া, ধুলো, দুর্গন্ধ সব মিলিয়ে একটা নর্মাল শহরের নর্মাল ছোট বড়-রাস্তার সব রকম উপাদান-ই ছিল। সিগারেট টায় গোটা ছয়েক টান দেওয়ার পর-ই আমার মনে কবিতার জন্ম হল। আসলে আমি হাই-ড্রেন টার দিকেই তাকিয়ে আলবাল ভাবছিলাম (যেটা আমার প্রিয় কাজ। অ্যাটলিস্ট বোকাবোকা লোকের সাথে হ্যাজানোর থেকে তো বেটার) এবং এটা বেসিক্যালি তার জন্যেই হল।
কারুর কারুর নদী দেখে কবিতা আসে, কারুর কারুর হাই-ড্রেন।

আমার এক বাংলার স্যার ছিলেন। মানে বেঁচে আছেন বহাল তবিয়তে কিন্তু যে পরিমান মদ্যপান তিনি প্রতিনিয়ত করে থাকেন তাতে আমি বেশ চিন্তিত। কিন্তু আশ্চর্য লাগে এটা ভেবে যে আমি যখন বিঞ্জ ড্রিঙ্কিং করি তখন আমার বিন্দু মাত্র চিন্তা হয়না। happiness is a warm gun!
যাই হোক, তিনি বলতেন, "বাবা, আমি সন্ধে বেলা ভয়ানক দামী স্কচ খেয়ে বাড়ি ফিরে, বউ বাচ্ছার সাথে মিষ্টি মিষ্টি করে তারপর পাঁঠার রগরগে ঝোল আর রুটি খেয়ে, আরো একটা পেগ আর গোল্ডফ্লেক কিংসাইজ নিয়ে বারান্দায় বসে যদি লিখি, 'এ মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না' তাহলে সেটা আমার আত্মার সাথে বেইমানি হবে।" এই রোগ টার পোশাকি নাম হল 'সখের মজদুরি'।
তবে আত্মা-ফাত্মা কিছু হয়না, টাকা হয়, নাম হয়, যশ হয়, সেক্স হয়, আরো এরকম মেটিরিয়ালিস্টিক অনেক কিছু হয়, তার সাথে আরও অনেক কিছু হয়, তার সাথে আরও অনেক কিছু। কিন্তু আত্মা হয়না। কোলকাতা শহরে তো নয়-ই।

কিন্তু তার মানে কি এই যে সবাই পোঁদ-ই মারাচ্ছে? কবিতারা কি ডাইলিউট হতে হতে আলটিমেটলি কালি আর কলম-ই হয়ে গেল?
আমার বাবা বলেন, তাগিদ টা আর নেই। তিনি তাঁর সময় তাঁর মত করে চেষ্টা করেছিলেন। তারপর সংসারের ডামাডোলে সব গোলমাল হয়ে যায়।

এবার প্রশ্ন হল তাগিদ নেই কেন?
নেই কেন?
কেন নেই?
উত্তর নেই।

টাটা।