বাড়ীর পেছনের পুকুরটাকে পাড়ার লোকে হলদির পুকুর বলত। কয়েক পুরুষ আগে বিয়ের দিন গায়ে হলুদ নিয়ে এক বাগদি মেয়ে কলসি বেঁধে ডুব দিয়েছিল।
গাঁয় জাতপাত তেমন একটা প্রকট ছিল না, যদিও হিঁদু-মুসলমানের স্নানের ঘাট আলাদা ছিল। হিঁদুদের মধ্যে পিদিমের নিভু নিভু শিখার মত কানাকানিও ছিল। গাঁয়ের মাটি বড়ই দরদী ছিল, একটু যত্ন নিলে আভাগের কুকুরের মত ল্যাংল্যাং করে ফসলের বন্যা বইয়ে দিত।
হরিপদ নিজের মেধা ও চেষ্টায় কলকাতা থেকে ডাক্তারি শিখে গাঁয়ে ফিরে এল হিপক্রাটিক ওথ আর চরমপন্থি স্বদেশী মনভাব নিয়ে। গোপনে গোপনে আশেপাশের মহকুমার বিপ্লবী কার্যকলাপের সাথে পাঁকাল মাছের মত জড়িয়ে ছিলেন। ধরাটি কক্ষন পরেন নাই। বছর দুই বাদে দেশ স্বাধীন হল। এদ্দিন বেশ ছিল জীবন বোমা, গুলি, লিফলেট আর বায়কেমিকের বাক্স নিয়ে। স্বপ্ন পুরনের ছলছল ছোখের খোঁয়ারি কাটল বুড়িগঙ্গার ওপারের গ্রামে হঠাৎ এক সন্ধেয় আর্তনাদের শব্দে। গ্রামে ঘরকে ঘর তখন আগুনে পুড়ছে। মেয়েরা ছাওয়াল-মাইয়া কোলে জলে ঝাঁপিয়ে পরছে প্রাণ আর ইজ্জতের ভয়ে। তারা হিঁদু কি মুসলিম জানা যায় নি। তদ্দিনে নোয়াখালী হয়ে গিয়েছে।
হরিপদর ঘরে বড় দাদা তারাপদ চাষের কাজ করতেন। মাটির বড্ড কাছে বাস ছিল তার, মাটি কেটেই শরীর বানান। আর ছিল এক বালবিধবা পিসি, যিনি নাকি এমনি আফিং খেতেন যে সাপেও তার কাছে ঘেঁষত না।
জমিজমা কিছু রেখে, প্রায় পুরোটাই বিক্রিবাটা করে অন্ধের মত তিনজনে অনির্দিষ্টের পথে যাত্রা করলেন কলকাতার দিকে।
(২)
কলকাতায় এসে দু নম্বর হরিপাল দত্ত লেনে, হেদোর পুকুরের পাশে ভাড়াবাড়িতে ওঠা হল। ভাগদখলের জমি নেব না এমন জার্মান গোঁ।
তারাপদ দিনের চাষির ভাত হজম হত না কলকাতার আবহাওয়ায়। ম্যালেরিয়া, মাছি, গাড়ি ঘোড়া, কয়লার ধোঁওয়া, মারামারি, খুব জখম তার ভাললাগেনি। তিনি তাঁর উপযুক্ত কোন কাজকর্ম পাননি, তিনি ভাইয়েরই সংসার দেখতেন, বাজার থেকে কলাটা মুলোটা কিনে আনতেন। সকাল বেলা একপেট খেয়ে সেই যে বেরিয়ে যেতেন ফিরতেন ততক্ষনে কলকাতা রাতের অন্ধকারে স্তব্ধ হয়ে গ্যাছে।
হরিপদ তদ্দিনে এখানে বিবেকানন্দ রোডে ডাক্তারি জমিয়ে ফেলেছেন, আড্ডায় কেউ যদি বলে ' ইয়ে আজাদি ঝুঠা হ্যাঁয়' তাহলে তাকে জুতো মারতে উঠতেন। তিনি নিঃসন্তান ছিলেন, সেই অপ্রাপ্তি থেকেই হয়ত ইঞ্জিন ছাপ ব্রাণ্ডির বোতলে জীবনটা দিয়ে দেন।
বিধবা পিসি তদ্দিনে কাশিবাসি হয়েছেন। স্বেচ্ছায়। কিছুটা হয়ত ব্যাক্তিগত স্বাধীনতার খোঁজে। বালবিধবা হলেও অবলা নারী ছিলেন না। মৌলবির কাছে গচ্ছিত রাখা জমি-জমার, পান সুপারির, কাতলা মিরগেলের হিসেব নিতে একা একাই ট্রেনে পূর্ববঙ্গে যেতেন। মসজিদের উপকণ্ঠে বসে, তসবি আর কণ্ঠি নিয়ে মৌলবির সাথে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা রামায়ন, মহাভারত আর সুফিয়ানা নিয়ে আড্ডা দিতেন। তিনি সেই স্থলেই মারা যান, হরিপদরা তাঁর দেহান্তির ব্যাবস্থা করতে যেতে পারেনি কারন সেই মুহূর্তে আইন মেনে পূর্ববঙ্গ যাওয়া সহজ ছিল না।
তারাপদ ইতিমধ্যে কলেজ স্ট্রিটের এক পাইস হোটেল বার্মিজ মালকিনের প্রেমে পরেন এবং তাকেই হিঁদু মতে বিয়ে করে ঘরে আনেন। তার ঝোপ ঝাপড়া, চাঁদা, সরপুঁটি, ক্যাতার রুটি, বিলের আলো, অষ্ট প্রহর আর আজান ভুলতে কলকাতার লক্ষকোটি মানুষের ভিড়ে হঠাৎ যুগ্ম চন্দ্র-সূর্যোদয় তাকে বিশেষ ভাবে সাহায্য করেছিল।
(৩)
কালের নিয়মে তারাপদর তিন ছেলে হয়। বড় ছেলে সমীর একদিন মাঠে ফুটবল খেলতে গিয়ে দেখল কর্নারের শট টা বাং মাছের মত কেদরিয়ে বার পোস্টের নিচে লেগে গোলে ঢুকল। সেই থেকে ইস্টবেংগলে ট্রায়াল, তারপরে চব্বিশে মালাইচাকি ঘুরে মাঠ থেকে হেরে বিদায় নিয়ে মেজ ভাইয়ের সাথে জুড়ে গেলেন।
মেজ ভাই দীলিপ সান্যাল রেলের ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। বদলির চাকরি। পুজোয় খড়গপুর, নববর্ষে কোচবিহার। তখন হিমালয়ের ফুটহিলসের প্রত্যন্ত জায়গা গুলতে ট্র্যাক বসান হচ্ছে, সে সেখানকার সিভিল বাবু।
তখন ওখানে ম্যালেরিয়ায় গ্রাম শ্মশান হয়ে যাচ্ছে, শীর্ষেন্দু এরকমই কোন জায়গা নিয়েই হয়ত লিখেছিলেন যে রাস্তাঘাটে যারা হাঁটে তারা সবাই নাকি মানুষ না। ছোট ভাই সন্দীপ ঘুরে বেড়াতে অস্বীকার করে, সে স্কটিশে ভর্তি হয় ফিলসফি নিয়ে।
সারারাত না ঘুমিয়ে দিনের পর দিন অসুরের মত খাটতে পারত। পড়াশোনায় অস্বাভাবিক ভাল হওয়া সত্ত্বেও ক্লিনিকাল লেভেলের ডিপ্রেসান তাকে তাড়া করে বেড়াত। একদিন বড়দার মুখে জানতে পারে যে তাঁর মায়ের দিকের অনেকেই নাকি মাথা খারাপ, সে ভাবতে শুরু করে যে তারও একদিন স্কিজোফ্রেনিয়া হয়ে যাবে। সারারাত জেগে হস্টেলের ঘর বিড়ির ধোঁয়ায় অন্ধকার করে দিত। বন্ধুদের আড্ডায় তার নিজের লেখা একটা ছোটোগল্প শুনে সলীল চৌধুরি বলেছিলেন 'তুই যে ভীষণ এগজিস্টেনসিয়াল ক্রাইসিসে ভুগে চলেছিস।'
সেই গল্পটাই বন্ধুরা হয়ত আর কাউকে বলেছিল, তারা বলেছিল আরো কাউকে। বম্বের কোন রাইটারকে পাকা লেখা না করিয়েই গল্পটি বেচে দ্যান সন্দীপ। সে তখন বন্ধুদের সাথে গ্রামে যাওয়ার জন্য মুখিয়ে রয়েছে। হাতে টাকা এলে ভালই হয়। পরে হাল্কা চালে বলেছিল, 'মেরা নাম জোকার ভাল হল নি রে।'
সন্দীপ সান্যালের বডি টা পাওয়া যায়নি। নকশালদের মধ্যের গুণ্ডারা সম্ভবত মেরে নদীর চরে পুঁতে দিয়েছিল।
গাঁয় জাতপাত তেমন একটা প্রকট ছিল না, যদিও হিঁদু-মুসলমানের স্নানের ঘাট আলাদা ছিল। হিঁদুদের মধ্যে পিদিমের নিভু নিভু শিখার মত কানাকানিও ছিল। গাঁয়ের মাটি বড়ই দরদী ছিল, একটু যত্ন নিলে আভাগের কুকুরের মত ল্যাংল্যাং করে ফসলের বন্যা বইয়ে দিত।
হরিপদ নিজের মেধা ও চেষ্টায় কলকাতা থেকে ডাক্তারি শিখে গাঁয়ে ফিরে এল হিপক্রাটিক ওথ আর চরমপন্থি স্বদেশী মনভাব নিয়ে। গোপনে গোপনে আশেপাশের মহকুমার বিপ্লবী কার্যকলাপের সাথে পাঁকাল মাছের মত জড়িয়ে ছিলেন। ধরাটি কক্ষন পরেন নাই। বছর দুই বাদে দেশ স্বাধীন হল। এদ্দিন বেশ ছিল জীবন বোমা, গুলি, লিফলেট আর বায়কেমিকের বাক্স নিয়ে। স্বপ্ন পুরনের ছলছল ছোখের খোঁয়ারি কাটল বুড়িগঙ্গার ওপারের গ্রামে হঠাৎ এক সন্ধেয় আর্তনাদের শব্দে। গ্রামে ঘরকে ঘর তখন আগুনে পুড়ছে। মেয়েরা ছাওয়াল-মাইয়া কোলে জলে ঝাঁপিয়ে পরছে প্রাণ আর ইজ্জতের ভয়ে। তারা হিঁদু কি মুসলিম জানা যায় নি। তদ্দিনে নোয়াখালী হয়ে গিয়েছে।
হরিপদর ঘরে বড় দাদা তারাপদ চাষের কাজ করতেন। মাটির বড্ড কাছে বাস ছিল তার, মাটি কেটেই শরীর বানান। আর ছিল এক বালবিধবা পিসি, যিনি নাকি এমনি আফিং খেতেন যে সাপেও তার কাছে ঘেঁষত না।
জমিজমা কিছু রেখে, প্রায় পুরোটাই বিক্রিবাটা করে অন্ধের মত তিনজনে অনির্দিষ্টের পথে যাত্রা করলেন কলকাতার দিকে।
(২)
কলকাতায় এসে দু নম্বর হরিপাল দত্ত লেনে, হেদোর পুকুরের পাশে ভাড়াবাড়িতে ওঠা হল। ভাগদখলের জমি নেব না এমন জার্মান গোঁ।
তারাপদ দিনের চাষির ভাত হজম হত না কলকাতার আবহাওয়ায়। ম্যালেরিয়া, মাছি, গাড়ি ঘোড়া, কয়লার ধোঁওয়া, মারামারি, খুব জখম তার ভাললাগেনি। তিনি তাঁর উপযুক্ত কোন কাজকর্ম পাননি, তিনি ভাইয়েরই সংসার দেখতেন, বাজার থেকে কলাটা মুলোটা কিনে আনতেন। সকাল বেলা একপেট খেয়ে সেই যে বেরিয়ে যেতেন ফিরতেন ততক্ষনে কলকাতা রাতের অন্ধকারে স্তব্ধ হয়ে গ্যাছে।
হরিপদ তদ্দিনে এখানে বিবেকানন্দ রোডে ডাক্তারি জমিয়ে ফেলেছেন, আড্ডায় কেউ যদি বলে ' ইয়ে আজাদি ঝুঠা হ্যাঁয়' তাহলে তাকে জুতো মারতে উঠতেন। তিনি নিঃসন্তান ছিলেন, সেই অপ্রাপ্তি থেকেই হয়ত ইঞ্জিন ছাপ ব্রাণ্ডির বোতলে জীবনটা দিয়ে দেন।
বিধবা পিসি তদ্দিনে কাশিবাসি হয়েছেন। স্বেচ্ছায়। কিছুটা হয়ত ব্যাক্তিগত স্বাধীনতার খোঁজে। বালবিধবা হলেও অবলা নারী ছিলেন না। মৌলবির কাছে গচ্ছিত রাখা জমি-জমার, পান সুপারির, কাতলা মিরগেলের হিসেব নিতে একা একাই ট্রেনে পূর্ববঙ্গে যেতেন। মসজিদের উপকণ্ঠে বসে, তসবি আর কণ্ঠি নিয়ে মৌলবির সাথে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা রামায়ন, মহাভারত আর সুফিয়ানা নিয়ে আড্ডা দিতেন। তিনি সেই স্থলেই মারা যান, হরিপদরা তাঁর দেহান্তির ব্যাবস্থা করতে যেতে পারেনি কারন সেই মুহূর্তে আইন মেনে পূর্ববঙ্গ যাওয়া সহজ ছিল না।
তারাপদ ইতিমধ্যে কলেজ স্ট্রিটের এক পাইস হোটেল বার্মিজ মালকিনের প্রেমে পরেন এবং তাকেই হিঁদু মতে বিয়ে করে ঘরে আনেন। তার ঝোপ ঝাপড়া, চাঁদা, সরপুঁটি, ক্যাতার রুটি, বিলের আলো, অষ্ট প্রহর আর আজান ভুলতে কলকাতার লক্ষকোটি মানুষের ভিড়ে হঠাৎ যুগ্ম চন্দ্র-সূর্যোদয় তাকে বিশেষ ভাবে সাহায্য করেছিল।
(৩)
কালের নিয়মে তারাপদর তিন ছেলে হয়। বড় ছেলে সমীর একদিন মাঠে ফুটবল খেলতে গিয়ে দেখল কর্নারের শট টা বাং মাছের মত কেদরিয়ে বার পোস্টের নিচে লেগে গোলে ঢুকল। সেই থেকে ইস্টবেংগলে ট্রায়াল, তারপরে চব্বিশে মালাইচাকি ঘুরে মাঠ থেকে হেরে বিদায় নিয়ে মেজ ভাইয়ের সাথে জুড়ে গেলেন।
মেজ ভাই দীলিপ সান্যাল রেলের ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। বদলির চাকরি। পুজোয় খড়গপুর, নববর্ষে কোচবিহার। তখন হিমালয়ের ফুটহিলসের প্রত্যন্ত জায়গা গুলতে ট্র্যাক বসান হচ্ছে, সে সেখানকার সিভিল বাবু।
তখন ওখানে ম্যালেরিয়ায় গ্রাম শ্মশান হয়ে যাচ্ছে, শীর্ষেন্দু এরকমই কোন জায়গা নিয়েই হয়ত লিখেছিলেন যে রাস্তাঘাটে যারা হাঁটে তারা সবাই নাকি মানুষ না। ছোট ভাই সন্দীপ ঘুরে বেড়াতে অস্বীকার করে, সে স্কটিশে ভর্তি হয় ফিলসফি নিয়ে।
সারারাত না ঘুমিয়ে দিনের পর দিন অসুরের মত খাটতে পারত। পড়াশোনায় অস্বাভাবিক ভাল হওয়া সত্ত্বেও ক্লিনিকাল লেভেলের ডিপ্রেসান তাকে তাড়া করে বেড়াত। একদিন বড়দার মুখে জানতে পারে যে তাঁর মায়ের দিকের অনেকেই নাকি মাথা খারাপ, সে ভাবতে শুরু করে যে তারও একদিন স্কিজোফ্রেনিয়া হয়ে যাবে। সারারাত জেগে হস্টেলের ঘর বিড়ির ধোঁয়ায় অন্ধকার করে দিত। বন্ধুদের আড্ডায় তার নিজের লেখা একটা ছোটোগল্প শুনে সলীল চৌধুরি বলেছিলেন 'তুই যে ভীষণ এগজিস্টেনসিয়াল ক্রাইসিসে ভুগে চলেছিস।'
সেই গল্পটাই বন্ধুরা হয়ত আর কাউকে বলেছিল, তারা বলেছিল আরো কাউকে। বম্বের কোন রাইটারকে পাকা লেখা না করিয়েই গল্পটি বেচে দ্যান সন্দীপ। সে তখন বন্ধুদের সাথে গ্রামে যাওয়ার জন্য মুখিয়ে রয়েছে। হাতে টাকা এলে ভালই হয়। পরে হাল্কা চালে বলেছিল, 'মেরা নাম জোকার ভাল হল নি রে।'
সন্দীপ সান্যালের বডি টা পাওয়া যায়নি। নকশালদের মধ্যের গুণ্ডারা সম্ভবত মেরে নদীর চরে পুঁতে দিয়েছিল।