Saturday, August 6, 2016

সন্দীপ সান্যাল আর মেরা নাম জোকার

বাড়ীর পেছনের পুকুরটাকে পাড়ার লোকে হলদির পুকুর বলত। কয়েক পুরুষ আগে বিয়ের দিন গায়ে হলুদ নিয়ে এক বাগদি মেয়ে কলসি বেঁধে ডুব দিয়েছিল।
গাঁয় জাতপাত তেমন একটা প্রকট ছিল না, যদিও হিঁদু-মুসলমানের স্নানের ঘাট আলাদা ছিল। হিঁদুদের মধ্যে পিদিমের নিভু নিভু শিখার মত কানাকানিও ছিল। গাঁয়ের মাটি বড়ই দরদী ছিল, একটু যত্ন নিলে আভাগের কুকুরের মত ল্যাংল্যাং করে ফসলের বন্যা বইয়ে দিত।
হরিপদ নিজের মেধা ও চেষ্টায় কলকাতা থেকে ডাক্তারি শিখে গাঁয়ে ফিরে এল হিপক্রাটিক ওথ আর চরমপন্থি স্বদেশী মনভাব নিয়ে। গোপনে গোপনে আশেপাশের মহকুমার বিপ্লবী কার্যকলাপের সাথে পাঁকাল মাছের মত জড়িয়ে ছিলেন। ধরাটি কক্ষন পরেন নাই। বছর দুই বাদে দেশ স্বাধীন হল। এদ্দিন বেশ ছিল জীবন বোমা, গুলি, লিফলেট আর বায়কেমিকের বাক্স নিয়ে। স্বপ্ন পুরনের ছলছল ছোখের খোঁয়ারি কাটল বুড়িগঙ্গার ওপারের গ্রামে হঠাৎ এক সন্ধেয় আর্তনাদের শব্দে। গ্রামে ঘরকে ঘর তখন আগুনে পুড়ছে। মেয়েরা ছাওয়াল-মাইয়া কোলে জলে ঝাঁপিয়ে পরছে প্রাণ আর ইজ্জতের ভয়ে। তারা হিঁদু কি মুসলিম জানা যায় নি। তদ্দিনে নোয়াখালী হয়ে গিয়েছে।
হরিপদর ঘরে বড় দাদা তারাপদ চাষের কাজ করতেন। মাটির বড্ড কাছে বাস ছিল তার, মাটি কেটেই শরীর বানান। আর ছিল এক বালবিধবা পিসি, যিনি নাকি এমনি আফিং খেতেন যে সাপেও তার কাছে ঘেঁষত না।
জমিজমা কিছু রেখে, প্রায় পুরোটাই বিক্রিবাটা করে অন্ধের মত তিনজনে অনির্দিষ্টের পথে যাত্রা করলেন কলকাতার দিকে।

(২)

কলকাতায় এসে দু নম্বর হরিপাল দত্ত লেনে, হেদোর পুকুরের পাশে ভাড়াবাড়িতে ওঠা হল। ভাগদখলের জমি নেব না এমন জার্মান গোঁ।
তারাপদ দিনের চাষির ভাত হজম হত না কলকাতার আবহাওয়ায়। ম্যালেরিয়া, মাছি, গাড়ি ঘোড়া, কয়লার ধোঁওয়া, মারামারি, খুব জখম তার ভাললাগেনি। তিনি তাঁর উপযুক্ত কোন কাজকর্ম পাননি, তিনি ভাইয়েরই সংসার দেখতেন, বাজার থেকে কলাটা মুলোটা কিনে আনতেন। সকাল বেলা একপেট খেয়ে সেই যে বেরিয়ে যেতেন ফিরতেন ততক্ষনে কলকাতা রাতের অন্ধকারে স্তব্ধ হয়ে গ্যাছে।
হরিপদ তদ্দিনে এখানে বিবেকানন্দ রোডে ডাক্তারি জমিয়ে ফেলেছেন, আড্ডায় কেউ যদি বলে ' ইয়ে আজাদি ঝুঠা হ্যাঁয়' তাহলে তাকে জুতো মারতে উঠতেন। তিনি নিঃসন্তান ছিলেন, সেই অপ্রাপ্তি থেকেই হয়ত ইঞ্জিন ছাপ ব্রাণ্ডির বোতলে জীবনটা দিয়ে দেন।
বিধবা পিসি তদ্দিনে কাশিবাসি হয়েছেন। স্বেচ্ছায়। কিছুটা হয়ত ব্যাক্তিগত স্বাধীনতার খোঁজে। বালবিধবা হলেও অবলা নারী ছিলেন না। মৌলবির কাছে গচ্ছিত রাখা জমি-জমার, পান সুপারির, কাতলা মিরগেলের হিসেব নিতে একা একাই ট্রেনে পূর্ববঙ্গে যেতেন। মসজিদের উপকণ্ঠে বসে, তসবি আর কণ্ঠি নিয়ে মৌলবির সাথে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা রামায়ন, মহাভারত আর সুফিয়ানা নিয়ে আড্ডা দিতেন। তিনি সেই স্থলেই মারা যান, হরিপদরা তাঁর দেহান্তির ব্যাবস্থা করতে যেতে পারেনি কারন সেই মুহূর্তে আইন মেনে পূর্ববঙ্গ যাওয়া সহজ ছিল না।
তারাপদ ইতিমধ্যে কলেজ স্ট্রিটের এক পাইস হোটেল বার্মিজ মালকিনের প্রেমে পরেন এবং তাকেই হিঁদু মতে বিয়ে করে ঘরে আনেন। তার ঝোপ ঝাপড়া, চাঁদা, সরপুঁটি, ক্যাতার রুটি, বিলের আলো, অষ্ট প্রহর আর আজান ভুলতে কলকাতার লক্ষকোটি মানুষের ভিড়ে হঠাৎ যুগ্ম চন্দ্র-সূর্যোদয়  তাকে বিশেষ ভাবে সাহায্য করেছিল।

(৩)

কালের নিয়মে তারাপদর তিন ছেলে হয়। বড় ছেলে সমীর একদিন মাঠে ফুটবল খেলতে গিয়ে দেখল কর্নারের শট টা বাং মাছের মত কেদরিয়ে বার পোস্টের নিচে লেগে গোলে ঢুকল। সেই থেকে ইস্টবেংগলে ট্রায়াল, তারপরে চব্বিশে মালাইচাকি ঘুরে মাঠ থেকে হেরে বিদায় নিয়ে মেজ ভাইয়ের সাথে জুড়ে গেলেন।
মেজ ভাই দীলিপ সান্যাল রেলের ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। বদলির চাকরি। পুজোয় খড়গপুর, নববর্ষে কোচবিহার। তখন হিমালয়ের ফুটহিলসের প্রত্যন্ত জায়গা গুলতে ট্র্যাক বসান হচ্ছে, সে সেখানকার সিভিল বাবু।
তখন ওখানে ম্যালেরিয়ায় গ্রাম শ্মশান হয়ে যাচ্ছে, শীর্ষেন্দু এরকমই কোন জায়গা নিয়েই হয়ত লিখেছিলেন যে রাস্তাঘাটে যারা হাঁটে তারা সবাই নাকি মানুষ না। ছোট ভাই সন্দীপ ঘুরে বেড়াতে অস্বীকার করে, সে স্কটিশে ভর্তি হয় ফিলসফি নিয়ে।
সারারাত না ঘুমিয়ে দিনের পর দিন অসুরের মত খাটতে পারত। পড়াশোনায় অস্বাভাবিক ভাল হওয়া সত্ত্বেও ক্লিনিকাল লেভেলের ডিপ্রেসান তাকে তাড়া করে বেড়াত। একদিন বড়দার মুখে জানতে পারে যে তাঁর মায়ের দিকের অনেকেই নাকি মাথা খারাপ, সে ভাবতে শুরু করে যে তারও একদিন স্কিজোফ্রেনিয়া হয়ে যাবে। সারারাত জেগে হস্টেলের ঘর বিড়ির ধোঁয়ায় অন্ধকার করে দিত। বন্ধুদের আড্ডায় তার নিজের লেখা একটা ছোটোগল্প শুনে সলীল চৌধুরি বলেছিলেন 'তুই যে ভীষণ এগজিস্টেনসিয়াল ক্রাইসিসে ভুগে চলেছিস।'
সেই গল্পটাই বন্ধুরা হয়ত আর কাউকে বলেছিল, তারা বলেছিল আরো কাউকে। বম্বের কোন রাইটারকে পাকা লেখা না করিয়েই গল্পটি বেচে দ্যান সন্দীপ। সে তখন বন্ধুদের সাথে গ্রামে যাওয়ার জন্য মুখিয়ে রয়েছে। হাতে টাকা এলে ভালই হয়। পরে হাল্কা চালে বলেছিল, 'মেরা নাম জোকার ভাল হল নি রে।'
সন্দীপ সান্যালের বডি টা পাওয়া যায়নি। নকশালদের মধ্যের গুণ্ডারা সম্ভবত মেরে নদীর চরে পুঁতে দিয়েছিল।




Saturday, April 16, 2016

লাল-সবুজ কন্সপিরেসি

-"আরে শুয়োরের বাচ্চার দল! যত্তসব বড় বড় প্যাচাল-পারা কথা। গেলো বার বিধান-সভার আগে ঐ বুড়ো হারামজাদার বাচ্চা অগ্রদূতের মাঠে এয়েছিল ভাষণ মারাতে। কুঁইকুঁই শুনেই বুয়েছিলাম যে পার্টির শেষ অবস্থা। তার আরও কদিন বাদ থেকে শঙ্করদা বলল বলে জোনালের হয়ে দিদির পার্টি করছি। আমার বড়দা মরে যাওয়ার আগে অব্দি লাল- পার্টি করে গ্যাছে। এই দাদার বন্ধু  শঙ্করদা ।"
এই বলে পার্থদা একটা গোল্ডফ্লেক লাইটস ধরাল। পকেট থেকে ফোন বের করে খানিকক্ষণ নেড়ে চেড়ে আবার বলল, "পাড়া টা বাঙ্গালে বাঙ্গালে ছেয়ে গেল রে! ফুটবল টুর্নামেন্টে চাঁদাটা দিলে হয়।"
এখানে বলা দরকার পার্থদা নিজেও কাঠবাঙ্গাল। বাবা খুব কম বয়েসে মারা যান, তিনি ছিলেন পাড়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী আর বিত্তবান ব্যাবসায়ীর (প্রোমোটার) ড্রাইভার। মদ আর মদের পর হাতাহাতিতে তার মহাপ্রয়ান ঘটে। আগে যখন বন্দে-আলি পল্লি তে রায়টের খবর আসত, তখন হিন্দু-মুসলমান সব রকমের মানুষ এসে লাঠি-পাইপগান নিয়ে বস্তি পাহারা দিত বাবার কাছে শুনতাম। আশি দশকের শেষের দিক থেকে কিরকম যেন মাকড়শার জালে ঢেকে গেছিল, দুহাজার এগারর আসে পাশে লাল-সবুজ দ্বৈরথে বস্তি টা সারাক্ষণই চাপা উত্তেজনায় থাকত। যাইহোকপার্থদা  নিজে এদিক ওদিক অনেক ব্যাবসা-পত্র করে নিজের পায়ে দাঁড়ায়, এবং সবাই বিশ্বাস করে এতে ঠিক সময় মত ঠিক পার্টির হাত ধরার মত বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পার্থদা দিয়েছে। 
তৃণমূলের হোক বাঁ সিপিএম, কিছু অসাধারণ কমরেডস আছে, যারা যেকোনো রকম কন্সপিরেসি থিওরিতেই বিশ্বাস করে নেয়। 
"হ্যাঁ তো যেটা বলছিলাম, শঙ্করদা, শালা, সেদিন তুইও তো ছিলি, আরে যেদিন পুশ্তের দুটো নখ উড়ে গেল, মনে নেই বাঞ্চত? নেশা করে করে ঘিলু তো চটকে গ্যাছে! যাকগে, সেদিন বাচ্ছাদের সাথে বল পিটিয়ে ফিরছি, দেখি শঙ্করদা কোথার থেকে বন্দুকের গুলির মত ছুটে ফিরছে, আমাকে দেখেই বলে দেখেছিস, বুড়ো চিনের দালাল গুলো হ্যান্ডেল শেডিং করিয়ে দিয়েছে!
-মানে?!
-মানে আর কি, ভোটের মুখে যাতে মানুষ সাতটার খবর না দেখতে পায় তাই ওরা ইলেকটিরি কম্পানি তে বলে হ্যান্ডেল নামিয়ে দিয়েছে, ব্যাস, লোডশেডিং!
আমি তখন হা-করে তাকিয়ে আছি। মাথা চুদে গ্যাছে শুনে! ঠিক তখনই শঙ্করদা বলল, এতো কিছুই না, গেল সোমবার সিপিএম কি করেছে জানিস?!
-কি? (আমরা সমস্বরে)
আমার কানের কাছে মুখ টা এনে ভীষণ সিরিয়াস গলায় বলল, 'মিছিল বেরিয়েছিল আমাদের, বিরাট মিছিল। হাতিবাগান থেকে এসপ্ল্যানেড। দু হাজার লোক ছিল। কবি-সাহিত্যিক রা ছিল। সেদিন ওরা মেঘ-বোমা মেরেছিল।
-মেঘ-বোমা?
-হাঁ ভাই, আমেরিকা থেকে খবর এসেছে, ওদের কাছে এমন বোমা আছে যেটা মারলে নাকি বৃষ্টি নেমে যায়। মিছিলটার দফারফা করে দিলে ভাই!
শঙ্করদার চোখে তখন জল ছলছল করছে।"
এই অব্দি বলেপার্থদা আরেকটা সিগারেট ধরাল, আমরা হতবাক হয়ে বসে আছি।
-যাই বুঝলি? তোরা বসে ভোটের গল্প মারা, আমি চললাম টুর্নামেন্টের হাল জানতে। 




ঝড়

সকাল দশটায় প্রথম সাইরেন।
সরকারের থেকে জারি হওয়া ইন্সট্রাক্সান মত ল্যাম্পপোস্ট বাঁচিয়ে ছেলেটি এক লাফে বিহারি মিস্টির দোকান আর রোয়াক-ওয়ালা বাড়িটার মাঝখানে সেঁধিয়ে যেতেই বড়রাস্তার উপর দিয়ে একটা আধ ভাঙ্গা দেজ মেডিকালের মিনি বাস তিন বার শূন্যে ঘুরপাক খেয়ে গাল্ভানাইজড রাবারের বলের মত দুবার ভীষণ শব্দে পিচ রাস্তায় ড্রপ খেয়ে তিনকোনা পার্কটার মধ্যে রেলিং ভেঙ্গে ঢুকে গেল। চারদিকে লোহার আর ভাঙ্গা মেসিনারিসের চুরমুরি ছড়িয়ে, ভাঙ্গা কাঠ, গাছপালা, অ্যাসবেস্টাসের টুকরো, রাস্তা প্রায় জনশূন্য। ভোরের কাক ডাকার আগেই রাষ্ট্রশক্তির রাত-ডোমেরা এসে আগের দিনের ঝড়ের তাণ্ডবে ঝরে পড়া মৃতদেহ  গুলি কে হাপিশ করে দেয়। রাস্তা ধুয়ে মুছে নিশ্চিহ্ন করে দেয় মৃত্যুর নামগন্ধ। নাগরিক ক্ষয়ক্ষতিগুলোর সাথে বাঙ্গালীরা বেশ আপোষ-ই করে নিয়েছে।পড়ে থাকে ভাঙ্গাচোরা ইতিহাস, আশি-নব্বই-এর বাঙালি মধ্যবিত্ত ঘরবাড়ীর একরকমের ছাপ ছিল, ঝড়ে ক্রমাগত ভেঙ্গে পড়া আর মেরামতি চক্রাকার আবর্তে পড়ে আজ তাদের বাড়িঘর আফগানিস্তানের মত।
রোজকারের এই ঝড়, দিনে দুবার আসে, উড়িয়ে নিয়ে যায় সামনে যাই পায়। বঙ্গোপসাগরের উপকূল পেরিয়ে মাত্র দুশো কিলোমিটার গেলে এই ঝড়ের উৎসস্থল। প্রবল নিম্নচাপ, এক প্রকাণ্ড জায়গা প্রায় বাতাসহীন। দেশবিদেশের তাবৎ বিজ্ঞানীরা এর কারন জানতে পারেননি এখনও। তাই দেশ এনেছে প্রীভেন্টিভ মেজারস। ইন্সট্রাক্সান মানলে অ্যাক্সিডেন্ট এরানো যায় বটে। কিন্তু ভাঙ্গাচোরা রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, হঠাৎ থমকে যাওয়া জীবনযাত্রা, তার-ই মাঝে কাকে ঠুকরে খাচ্ছে রাতজাগা মাতালের ডেদবডি, চাকালাগানো পশরা সাজিয়ে দোকানী দের বিক্রিবাটা, অফিসের বাস, শেয়ারের গাড়ির ক্যাঁকক্যাঁক, ভয়ের ঘুন যেন চারিদিকে নাছোড় হয়ে লেগে আছেই। বাদামী রঙের ধুলো দেখা যায় উঁচু বিল্ডিং গুলোর পেছন দিয়ে, তারপরেই আর্তনাদের মত ভেসে আসে সাইরেন। রাতারাতি যেন সব বদলে যায়, নিশ্চিত মৃত্যু এড়াতে পাল পাল মানুষ দৌড়ে আশ্রয় খোঁজে যাতে ঝড়ের ডিরেক্ট ঝাপটা আড়াল করা যায়। গাড়িঘোড়া গলিঘুচি খুঁজে নিয়ে নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে ওজন বাড়িয়ে নেয় যাতে হাওয়ায় উড়ে না যায়। পুরোটাই যদিও এখনও পরীক্ষানিরীক্ষার স্তরে আছে। তাই আচমকাই ঘটে যায় অঘটন। প্রকৃতি অযাচিত ভাবে নেয় তার প্রতিশোধ। ছেলেটির চোখের সামনে যে বাসটি পাল্টি খেল সেটাও সেইরকমই একটা ঘটনা। ছোট্ট অসাবধানতা।

ঠিক যেমন সেইদিন মেয়েটির দিকে ভীষণ কড়া সাবধানতা নিয়ে পেছন ঘুরে তাকাতেই চোখে চোখ পরে যায়। মেয়েটি ভীষণ ঠাণ্ডা চোখে তাকায়, করাতচেরা ইস্পাতকঠিন চোখ। ঠিক তখনই বোধহয় ঝড় এসেছিলো। কোন কোন দিন ঝড়েরও সময়-অসময় আসে। 
স্কুলে-টিউশানে আসার সেরকম প্রয়োজন পড়েনা আজকাল আর, ইন্টারনেটেই স্কুল গুলি কিছু না কিছু ব্যাবস্থা নিয়ে নিয়েছে। পরীক্ষা দিতে আসতে হয় যদিও। আর মাঝে মধ্যে কেউ কেউ ঝড় অগ্রাঝ্য করে পড়াশোনা বাদ দিয়ে বাকি কিছুর টানে স্কুলে আসে। 
আজও তেমনি একদিন।
মায়ের বারণ, খুন্তি, চোখ-রাঙ্গানি উপেক্ষা করেও স্কুলে এসেছিল, আজ সেকেন্ডারির শেষ দিন খাতায় কলমে। এরপর হয়ত সে এবং হয়ত মেয়েটিও আরও লাখ লাখ পরিবারের মত শহর ছেড়ে পশ্চিমে চলে যাবে। কলকাতায় বড় বেশি মৃত্যুভয়। হয়ত দুটি আলাদা আলাদা শহরে, হয়ত ভিড়ের মধ্যে আর কক্ষণও সে দেখতে পাবে না : ছেঁড়া ক্যানভাসের ব্যাগ, সবুজ হেয়ার-ব্যান্ড, চুরো করে বাঁধা চুলে 'পিস-সাইন' হেয়ার-ক্লিপ, লম্বা সাদা মোজা গুটিয়ে ব্যালেরিনার বাকলের কাছে থমকে, হাঁটুর ঠিক উপরে বাদামী জরুল, খুব মন দিয়ে না দেখলে বঝা যায় না, কপালের কাছে ঘামে আটকে থাকা কয়েকটি  চুল আর ওই করাতপানা চোখ। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ-ই ফ্যাস করে দেওালের গা থেকে ছিঁড়ে নিল সৃজিত মুখার্জির নতুন ছবির পোষ্টার, তারপরেই হিহি করে পাগল-পাগল হাসি, আত্মহারা হাসি, ওই হাসি দেখলে যেন নিমেষে পৃথিবীর তিনশোটি মেজর যুদ্ধে সীজ-ফায়ার ঘোষণা করা হত, স্কুল-বাস  থেকে লুকিয়ে জানলা দিয়ে দেখছিল ছেলেটি, যতক্ষণ না বাস বালিগঞ্জ-ফাঁড়ির জ্যাম থেকে বেরয়, চোখে চোখ পরতেই সেই অদ্ভুত অজানা দুঃখ মেশানো অনুভূতি যেটি এখনও তার কাছে আনএক্সপ্লেনেবল। 
সেলিমপুরের রেল-গেটের কাছে তার এক চেনা পাগল পাতাখোর থাকে, তাকে একদিন কেক খাইয়েছিল এবং তার পরিবর্তে পাগলটি তাকে অগ্নিপুত্র-অভয়ের কমিক্স দিয়েছিলো, 'এসব এখন আর পাবিনে, ঝড়-যুদ্ধের বাজারে তো আরই না।' এখন তাকে আর অত ভয় পায় না সে। পাগলটি পর্যন্ত আজ সকালে তাকে দেখে পাড়ামাত করে চেঁচিয়ে বলেছে, 'তোর গা' দিয়ে মম করছে বাছুর-প্রেমের গন্ধ, যা বাপ, জলদি যা, আহারে কাঁদালি আমায়, যতক্ষণ না ঝড় আসে ততক্ষণ এই গন্ধ আমায় পাগল করবে রে!
গলিটা থেকে বেরতেই সে দেখল ঠিক উল্টো দিকের গাড়ি গলিতে মেয়েটি লুকিয়েছিল, সে তাকে ডেকে বললে,
'
জানতাম না আজ কেউ আসবে বলে, সকালে দেখিস নি আজ নাকি যখন তখন ঝড় আসবে, বৃষ্টিও থামবেনা শুরু হলে একবার।'
-'
না খুব তাড়াহুড়োয় বেড়িয়েছি, ওই ল্যাব-ম্যানুয়াল গুলো...'
তখন দূর থেকে টুয়েলভ-বার ব্লুজ শোনা যাচ্ছিল, সম্ভবত অর্গান। টাটকা ঝড়ের সদ্য আঘাত সংক্রান্ত কিছু অস্ফুট আর্তনাদও। দিগন্তের বাদামী ধুলোর শামিয়ানা তখন ছিল। দূর থেকে স্কুলের ঘণ্টার ঘর টা দেখা যাচ্ছিলো।













(১)

তপ্ত গ্রীষ্মের মধ্যরাত্রিী। দক্ষিনি মাতাল হাওয়া যেন স্বজন হারানোর যন্ত্রণাও ভুলিয়ে দেয়।  অন্দরমহলের দরজা সন্তর্পণে ভেজিয়ে দিয়ে মহারাজ বিশ্বেশ্বরে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি প্রৌঢ়, ক্লান্তি তাঁর নিত্যসঙ্গী।

অলিন্দের উপর কালো কাঠের হেলানো চেয়ার টায় বসলেন। এইটি তাঁর বাবার সময়কার আসবাব। তাঁদের দেশে এমন কাঠের কাজ হয়না। তাঁদের রাজধানী থেকে বহু যোজন দূরে পাহারের কোলে বৌদ্ধদের রাজ্যের সাথে একটানা পঁচিশ বছর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর গঙ্গার ধারে সন্ধিসুত্র সইসাবুদ করা হয়। ভেট হিসেবে আর অনেক কিছুর সাথে এই চেয়ারটিও এসেছিলো। মহারাজের বাবা, যিনি বন্যার জলে ভেসে আসা সাতচল্লিশটি পরিবার নিয়ে মোতিহারের এর পাড়ে রাজ্যপত্তন করেন, তিনিও মৃত্যুর আগে আগে এই চেয়ারে সারারাত বসে থাকতেন, রাতে তাঁর ঘুম আসত না। যৌবন থেকেই তাঁর ঘুম পাতলা ছিল। রাজবৈদ্য ক্ষিতিপাল বলেছিলেন, "মহারাজ, যারা দিনে ঘুমায়, রাতে জাগে, চিন্তা করে আগে আগে, তাদের আয়ু কমে যায়। আপনি-ই আমাদের মা বাপ। আপনি বরং সন্ধের পর দুধ-আফিম খেয়ে ঘুমাবেন।" শেষ বয়েসে আফিমের নেশা তাকে বিরক্ত করে দিত। কথায় কথায় খিটখিট করতেন। তারপর একদিন বিশ্বেশ্বর গুরুমশায়ের কাছে বসে ন্যায়শাস্ত্র পরছেন তখন প্রতিহারী এসে খবর দিল মহারাজ মুখে দই তুলে মারা গেছেন।
মহারাজ বিশ্বেশ্বর একবার ভাবলেন হয়ত এবার তাঁরও মৃত্যু সমাগত। তারপর ভাবলেন আহা কি শান্তিতেই না প্রজারা এখন ঘুমিয়ে আছে! মৃত্যু কি সত্যি-ই ভয়ঙ্কর? নাকি বন্ধুবৎসল?


মহারাজ নিত্যানন্দ মারা যান তিন সন্তান রেখে, বীরভদ্র, বিশ্বেশ্বর ও পার্বতী। নিত্যানন্দের বাবা ছিলেন বৈষ্ণব। ভাগীরথীর পাড়ে তাঁর আশ্রম ছিল। সুখে থাকতেন তিনি তাঁর তিন সাধনসঙ্গী আর পাঁচ সন্তান নিয়ে।
নিত্যানন্দ তখন কিশোর, তিনি দেখলেন এক গেরুয়া কাপড় পরা মুণ্ডিতমস্তক বিদেশী, গ্রামের প্রান্তে রাস্তায় পড়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। তাঁর শরীরে কোন ক্ষত নেই কিন্তু দেখেই বোঝা যায় সে রোগজীর্ণ। তিনি কাছে গিয়ে সাহায্যের চেষ্টা করতেই বিদেশী এক দিব্য হাসি হেসে তার কানেকানে ফিসফিস করে বললেন, "কলাবতীর দেশ, মোতির ফুল, ঢোল-ডগর...একটু জল...", তারপরেই সে গরল কালো রক্তবমি করতে করতে বলতে থাকলে, "যাইও বাবা...যাইও"।
আশ্রমে নিয়ে আসার পড় নিত্যানন্দের বাবা তাকে পরিক্ষা করে বললেন, "এ বড় খারাপ ধরনের কর্কট বাবা, ইনি বাঁচবেন না, আজই এনার শেষ রাত।"
শেষরাত্রে বিদেশী আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে চীৎকার করে বলল, "মুক্তি", তারপরেই তাঁর মৃত্যু হল।
পরদিন সকালে নিত্যানন্দ মা-বাপের চোখের জলে বিদায় নিয়ে  দেশ ভ্রমনে বেরলেন।

Friday, November 6, 2015

আম

- তোর পকেটে কি?
- পকেটে? আ-আমার?
- অ্যাই শুয়ার! দাঁড়া! দাঁড়া! পকেটে হাত দিবিনা...! দাঁড়া বলছি!
এক পা, এক পা করে পিছু যেতে যেতে ওসমান কুড়ি গজ যাওয়ার পর উলটোদিকে ঘুরে কাসুন্দিয়া রেললাইনের দিকে যেই স্পীডে দৌড় টা লাগাল, মন্ত্রিয়েল  অলিম্পিকের ধরতা-কর্তারা কাছে থাকলে মহাভারতের ভীষ্মের মত ফোঁস করে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন। ছিয়াত্তরের আগুণ বাজারে কলাটা-মুলোটা কিনতে গিয়ে হেগে-মুতে বড়া ভেজে ফ্যালা সাধারণ মানুষ হাঁ' করে দেখছিল কিরকম ভাবে একটা হাঁটুর বয়েশি বোমাবাজের ভয়ে নব-পাঁজার সাঙ্গোপাঙ্গরা প্রাণের ভয়ে পালাচ্ছে। আর ওদিকে চৌরাস্তার অপারে ঘোড়া-মিত্তির সাদা পাঞ্জাবীর পকেটে রিভলবার সমেত হতবাক হয়ে ভাবছে এই দুঃসাহসী খুদে গুন্ডাটাকে চিনের দালাল রা কোত্থেকে আমদানি করেছে। কাসুন্দিয়ার শ্রেষ্ঠ বখাটে আর গুন্ডাদের রীতিমতন কমিটি বসিয়ে রিক্রুট করেছেন তিনি, এই বয়েসে আর এইসব ভাল্লাগেনা, ইসোফেগাস দিয়ে অম্লস্রোতের ধারার চোটে সম্বিত ফিরতে তিনি দেখলেন বন্ধের দিনের র‍্যাম্পাট ঝারপিঠ টা আজকের মত ডিসমিস।        
আমার বাবার বড়োজেঠু  ছিলেন কাসুন্দিয়ার পোস্টমাস্টার, কর্নেল মেজাজের লোক। গর্জন করে বললেন, 'চাক্কা-বন্ধের দিন আবার ইশকুল কিসের?!'
তখন বিবেকানন্দ স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন বামনদেববাবু, যার ব্যাকরণ নব্য-আঁতেলরা পড়েননি বলে আজ এই অবস্থা।
মেজকা অম্লানবদনে বলল, 'স্যার বলেছে ছাত্রদের একটা নির্দিষ্ট বয়েস অব্দি অ্যাপলিটিকাল থাকা উচিত।'
-ওরে শালা শুয়ারের বাচ্চা, চ্যাটাং চ্যাটাং কথা!'
 বামনদেববাবু হয়ত সত্যিই বলেছিলেন, কিন্তু মেজকার ধান্দা ছিল খোয়ার মাঠে গিয়ে সারাদিন বল পেটাবার। ক্লাস এলেভেনে মোহনবাগানের ট্রায়াল দিয়েছিলেন, কিন্তু মাঝবয়েসে গিয়ে অ্যালকোহলিক হয়ে যান। মেজকার এক হাড়ে হারামজাদা বন্ধু ছিল সতে বলে, সে আমার বাবা এবং দুই কাকা, ঐ  জেনারেশানটার  সবাইকে বিড়ি ধরিয়েছিল। সতে এসেছিল বাড়িতে মেজকার সাথে ইস্কুল যাবে বলে, ঠাকুরমা দুইজনের হাতে দুটি পরিপুষ্ট আম দিয়ে বললেন, পকেটে নিয়ে যা।
গল্পের শুরু এখানেই, নস্করপাড়ার মোড়ে আসতেই মেজকা দেখল রাস্তার দুদিক থেকে প্রাচীন, ঘাঘু কংগ্রেসী ঘোড়া-মিত্তির গুন্ডা নিয়ে দোকান খোলাতে এলাকায় ঢুকছে, আর সিপিএমের ইয়ং ব্লাড নব-পাঁজা টেরিটরি আগলে বাচ্চাদের চিৎকার করে বলছে, 'ভয় পাবেন না কমরেড, বিপ্লবের পথে এরকম কাঁটাকে উপড়ে ফেলতে হয়...', এই প্যান্ডিমনিয়ামের মাঝে ওসমান পাঁঠা কাটার দোকানের সামনে মেজকার আর সতের মুখোমুখি হয়ে পড়ে, ফোলা পকেট দেখে হঠাৎ তার মনের প্যারানইয়া সে মিষ্টি গ্রীষ্মের বাতাসে দাবানলের মত ছড়িয়ে দেয়, ঘন্টাখানেকের মধ্যে পাড়ায় পাড়ায় রটে যায় অশান্ত সময়ের রবিন হুড কুণ্ডু-বাড়ির মেজছেলে।
দাদু পুরো ব্যাপারটা শুনে নব কে ডেকে পাঠালেন।
- নব, আমাদের বাড়ি মানে কি?
-কি দাদা? নব কাঁচুমাচু।
-আমাদের বাড়ি মানে ২৪ টা সিপিএমের ভোট।
-হ্যাঁ স্যার।
-গতমাসের ব্রিগেডে এবাড়ি থেকে কটা রুটি গেছিলো?
-২০০ টা স্যার।
-আমার মেজছেলেকে নিয়ে তোমরা এলাকা-এলাকা খেলছ, রাস্কেল?
দাদু হুঙ্কার দিয়ে বললেন।

আমার এখনও মনে পড়ে স্বাধীনতা দিবসের দিন নব দা পার্টি অফিসের সামনে বসে জিলিপি বিতরণ করছে, আমাকে দেখে, ডেকে বললে আর দুটো খেয়ে যা, সত্যনারায়ণের মাল, একদম টাটকা। ল্যাম্প পোস্টের গায়ে বাঁধা চোঙ্গা তখন গাইছে, 'শিল্পী সংগ্রামী পল  রবসন...'। 

Saturday, August 22, 2015

একানড়ে

পাঁচিলের দেড় ফুটের ছোট্ট গর্ত টার পাশে একটা ঘাট ছিল। যুগ যুগান্তর আগেরকার। বহু দশক হল আসেপাসের মানুষও ঘাট টার অস্তিত্ব ভুলেছে। ঘাটের পাকাই ভেঙ্গে জংলি গুল্মের বাড়বাড়ন্ত, ধুলো আর শ্যাওলায়ে সিঁড়িগুলো  রোমান রুইন্সের চেহারা নিয়েছে।
আজকে দুপুরে উদাত্ত্ব যেই জন্যে হেডস্যারের ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে সেট হল সে বাংলা ক্লাস কাটিয়ে ঘাটের উপর বসেছিল। স্কুলের পুরনো টিচার, মালী, গেটকীপার ছাড়া আর যারা ওই ঘাট টাকে চিনত তারা হল ১৯৯৩ ব্যাচের ছাত্র রা। ওদের সময়েই পাঁচিলে গর্ত টা করা হয় যাতে টুয়েলভের রা বাইরে বেরিয়ে স্কুলের পাঁচিল আর গঙ্গার মাঝে যে এক চিলতে ঘেসো জমি আর ঘাট আছে ওটার অপর দাঁড়িয়ে সিগারেট খেতে পারে।
উদাত্ত একদিন পাঁচিলের পাশের ঝোপ টা রেল-গানের মত বেঁটে ভাঙ্গা ডাল খুঁজছিল,কাঁটা ঝোপের মধ্যে থেকে হঠাৎ পাতা নড়ার শব্দ শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে একটা বিরাট গোসাপ। কিন্তু ভয়ে হাঁটু কাঁপার আগেই গোসাপ টা নিজেই দুদ্দাড় করে কাঁটা ঝোপের মধ্যে হারিয়ে গেল। উদাত্ত্ব এক মুহূর্তের জন্যে মনে হয়েছিল যে এটাকে পাথরের গারিতে জুতে নস্কর পাড়া থেকে স্কুলে আসবে, তাই সে শেষ চেষ্টা করতে গোসাপটার পালিয়ে যাওয়া রাস্তা ধরে ছুটে এক মিনিট যেতেই পাঁচিলের গর্ত টা ওর চোখে পড়ে।
তারপর থেকে বহুবারএ  ঘাটে এসেছে উদাত্ত্ব গোসাপ টাকে আর দেখতে পায়নি।
হেডস্যারের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে উদাত্ত ভাবছিল যে বাবা জেনে গেলে খুব মারবে, বা হয়ত নাও করতে পারে। বাবা কে খুব একটা ভাল বোঝে না ও। কিন্তু মা কান্নাকাটি করবেই।
পর্দার অপার থেকে তখনই হেডস্যার ঠাণ্ডা গলায় ডাকলেন, "উদাত্ত্ব, ভেতরে এস।"
হেডস্যারের বয়েস প্রায় চল্লিশ, উদাত্ত্ব কানাঘুষো শুনেছে তিনি নাকি বড়ো সরকারি চাকরি ছেড়ে কোন সিপিএমের লিডারকে ধরে ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাওড়ার এই মফঃস্বল শেষের স্কুলে চাকরি নিয়েছেন। এখানে তাঁর কোনও দূরসম্পর্কের আত্মীয় থাকে, তাদের বাড়িতেই উঠেছেন। দানেশ সেখ লেনের পেছনে জমিজমা কিনে নিজের মত করে চাষবাস শুরু করেছেন। বাবাদের সাথে পার্টি মিটিঙেও আসেন মাঝেমাঝে, উদাত্ত্বদের বাড়িতেও এসেছেন এক-দুবার। মা যতবারই জিজ্ঞেস করেছে, বুবলু পড়াশোনা করছে কিনা, তিনি শুধু উত্তর দিয়েছেন, ওকে বলুন বাইরের বই পড়তে। উঁচু ক্লাসে কেমিস্ট্রি পড়ান, আর উদাত্তের ক্লাসে অল সায়েন্স। খুব ক্রিটিকালী খাতা দেখেন।
ভেতরে আসার পর, হেডস্যার বজ্রকঠিন গলায় জিজ্ঞেস করলেন, "ক্যান গেছিলে নদীর ধারে?"
উদাত্ত্ব নিশ্চুপ হয়ে কেডস দেখছিল।
-"কি দেখলে?"
- "..."
-"বোবা হয়ে গ্যাছো ভয়ে?"
-"..."
-"দ্যাখো, সোজা কথা সোজা ভাবে বলি। অপরাধ করেছ, পানিশমেন্ট পেতেই হবে। তোমাকে চার্চের চিলেকোঠায় সন্ধে আট টা অব্দি থাকতে হবে। অন্ধকারে একা। তোমার বাবামাকে আমি ফোন করে দেব।"
উদাত্ত্ব নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। স্কুলের দুশো বছরের ইতিহাসে খুবি কম ছাত্র এই শাস্তি পেয়েছে। ইতিহাসের স্যার একদিন বলেছিলেন, চল্লিশের দশকে বেয়াড়া স্বদেশী ছাত্রদের ফাদার মিন্স চার্চের চিলেকোঠায় পাঠাতেন।
-"তোমার নামটি বড় বেখাপ্পা রকমের, বরং পদবি ব্যাবহার করা ছেড়ে দাও।"
উদাত্ত্ব মুখ তুলে তাকিয়ে বুঝতে পারছিল না  স্যার রেগে বলছেন না এমনিই।

চিলেকোঠার দরজা দিয়ে ঢুকে হেডস্যার যখন দরজায় খিল দিয়ে বেরিয়ে গেলেন তখন প্রায় সন্ধে। উদাত্ত্ব ভয় না পেলেও একটা অদ্ভুত গা ছমছমে অনুভূতি ওকে খিদে, ক্লান্তি এই ধরনের ব্যাপারগুলি থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল।
দু পা এগিয়ে একটা বসার যায়গা খুঁজতে যেতেই, জমাট অন্ধকার থেকে খোনা গলায় কে যেন ডেকে বলল, "কে তুই?"
উদাত্ত্বের তখন মোজার মধ্যে পা ঘামতে শুরু করেছে।
-"ভয় পেয়ে লাভ নেই এসেই যখন পরেছ।"
অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে ধুপধাপ শব্দ করে একটা বিচিত্র প্রাণী এগিয়ে এলো। উদাত্ত্ব তাকিয়ে দেখল সে এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। একপায়ে লাফাতে লাফাতে সে আরেক টু কাছে এগিয়ে এসে খসখসে হাত দিয়ে উদাত্ত্বর চিবুক তুলে সরীসৃপের মত সবুজ চোখ দিয়ে ভাল করে দেখে বলল, "বিশেষ সুলক্ষণ নেই। ঘর এ বেশিক্ষণ থাকা তোর ধাতে নেই।"
লাফিয়ে লাফিয়ে চিলেকোঠার কোনার গোল ক্যাচ টা খুলে দিতেই চাঁদের আলোয় উদাত্ত্ব দেখতে পেল ধুতি পাঞ্জাবি পরা একটা একপেয়ে লোক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দাড়ি চুলকাচ্ছে।
-"তোমার একটা পা নেই কেন?"
-"লম্বা গল্প।"
-"কিন্তু আমাকে তো আটটা অব্দি থাকতে হবে।"
-"ওরে শুয়ার, ভয় হাওয়ায় মিলিয়ে গেল এর মধ্যেই?"
উদাত্ত্ব দেখল গোল জানলা টা দিয়ে সেই সেদিনের গোসাপ টা একলাফে ভেতরে এলো। এসে একপেয়ের একমাত্র পায়ের সামনে গুটিয়ে শুয়ে পড়ল।
একপেয়ে বলতে শুরু করল,
"শোন  শুয়ার, আমার নাম কন্দর্পকান্তি, সেন বংশের একটা অংশের শেষ সন্তান। বাবা এই এলাকার রাজা ছিলেন। আমি সারাদিন বই নিয়ে পড়েথাকতাম। এক শ্রমণ ভিক্ষুণীর জন্যে পাগল হয়ে সংসার ছেড়েছিলাম। হেঁটে হেঁটে পাহাড় ডিঙ্গিয়ে তিব্বতে যাই। সেখানে ওদের সাবেক রসায়ন সাধনা করি। কালের নিয়মে সেই ভিক্ষুণী আর আমার এক কন্যা সন্তান হয়।  চরম উপবাস ও পরিশ্রমের কারণে প্রসবকালীন অসুস্থতায় সে মারা গেলে পর, আমি রাজ্যে এসে বাড়িতে উঠি। বিধর্মী ছিলেম বলে বাবা আলাদা ঘর আর ঘাট  বানিয়েদিলেন। সেই ঘাটেই তুই যখন  তখন ড্যাংড্যাং করে ঘুরে বেড়াস। অনেক রকম হাবিজাবি রাসায়নিক নিয়ে নাড়াঘাঁটা করতে গিয়ে একদিন ঘাটের সামনেই মরে পড়ে গেলাম। জাত গ্যাছে বলে কেউ গোরটিও দিলে নে। একপেয়ে ভুত হয়ে গঙ্গার ধারে রয়ে গেলাম বছর বছর ধরে।"
একটু থেমে একপেয়ে একটা প্রাচীন ডাবাহুঁকো বের করে ভুরুক ভুরুক করে তিন টে তান মেরে এদিকে ফিরে আবার বলল,
"তোর আগে যেসব বাঁদরবাচ্চা গুলো এসেছিল সত্তর বছর আগে তাদের বোম বানানো তো আমিই শিখিয়েছি। যতিন দাস দের আগে ছুটকোছাটকা এদিক ওদিক যা বোম ফাটত ওগুলো তো আমারই রেসিপি। যাকগে, আজকালকার বাচ্চাগুলো তাহলে ভয় টয় পায়না। ভাল ব্যাপার। তোর খিদে পেয়েছে?"
উদাত্ত্ব গল্প শুনতে শুনতে অন্যই এক জগতে চলে গেছিল।

পরের সোমবার স্কুলে ঢুকতেই হেডস্যারের মুখোমুখি।
-"উদাত্ত্ব, আর যদি কোন দিন দেখি ক্লাস বাঙ্ক করেছ তাহলে বেল্ট দিয়ে চাবকাব।"
-"স্যার আপনি কি জানেন..."
ঠোঁটে হাত রেখে কথা কেড়ে নিয়ে স্যার বললেন,
-"বাঙালিদের রক্তের মত মিশেল রক্ত ভূভারতে আর একটিও পাবেনা। ভাল থাকুন কন্দর্পকান্তি।"

উদাত্ত্ব পরে ত্রৈলোক্যনাথ পড়ে জেনেছিল একপেয়ে ভুত রা একানড়ে নামে পরিচিত। আর একদিন গঙ্গার ধারে কাঁটাঝোপে একটা নীল গোসাপ দেখেছিল সে।

Thursday, December 4, 2014

অসময়ে

বখরিদের সময়। 
দরজার  কোল্যাপ্সিবল টা টেনে মৃত্তিকা একবার ভাবল যে টুনুকে আলমদের বাড়ি থেকে ডেকে নেবে কিনা। ওদের বারান্দায় দুটো প্রকাণ্ড দুম্বো হালালের অপেক্ষায় আছে। টুনু তাদের পাতা খাওয়াতে  গেছে। ঘড়িতে একটা বাজে। আজ না হয় চান নাই করল।
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আলমদের দরজার দিকে তাকিয়ে মৃত্তিকা মনে মনে ধন্যবাদ দিল তাদের। রামরাজাতলা থেকে যৌথ পরিবার ভেঙে বেরিয়ে আসার পর ওদের পরিবার কতই না সাহায্য করেছে। বিশেষত এইরকম সময়।
গত দু বছর মেন্টেনেন্সের এর অভাবে ফ্ল্যাট এর সিড়ি, ছাদ ও অন্যান্য  কমন এরিয়াগুলো খন্দহরের রূপ  নিয়েছে। বাসিন্দা প্রায় ২৫ টি পরিবার, অধিকাংশ মুসলিম, বেলিয়াসোর, হাওড়া ময়দান থেকে উঠে আসা নিউক্লিয়ার মর্দ-জেনানা, জৈন-হাসপাতালের বিরাট ডাক্তার ও তাঁর নিরক্ষর স্ত্রী, বাংলাদেশ এর রিফিউজি...  এরা সবাই যেন প্রতিনিয়ত ছায়ার সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছে। সেগুণ কাঠের পালিশকরা হাসিমুখ দরজার পেছনে নিজেদের পার্সোনাল স্পেসে সতর্কভাবে হাসিকান্নার অভিনয় করে সমগ্র নব্বইয়ের দশক কাটিয়ে দিলে।
ফ্ল্যাটের সামনেই আন্দুল রোড। গেস্টকিন উইলিয়ামসের বন্ধ হয়ে যাওয়া বিরাট কারখানার জন্যে সমস্ত এলাকাই ধুলোমাখা বেশ কয়েকটা জেনারেশান ধরে। প্রায় দু হাজার কর্মী এখন বিকল্প জীবিকায়। রিক্সা চালানো, সব্জি বেচা, দোকানে কাজ, তেলেভাজা, চুরি, নেশা ইত্যাদি।
পাশেই দুটো হার্ডওয়েরের দোকান, বইখাতার দোকান টা তার পাশেই। সেখান থেকে দুটো পশ্চিমবঙ্গের পলিটিক্যাল ম্যাপ কিনল মৃত্তিকা। টুনুর জিওগ্রাফি হোমওয়রক তাকেই করাতে হয়। হাওড়া গার্লস থেকে ইতিহাসে এম.এ. করার সময় জিওগ্রাফি তার পাসে ছিল। হাওড়া গার্লসে নাকি কোনোএকটা সময় জীবনানান্দ প্রফেসর ছিলেন।
তারপর কারখানার গেটের সামনে থেকে বাস। দানেশসেখ লেনে নেমে ঘুপচি মতো ওষুধের দোকানটায় গিয়ে মৃত্তিকা ধীরেধীরে বলল, "দাদা, স্পাজমোপ্রক্সিভন, তিনটে।"
ওষুধের দোকানী ঝিমনো বন্ধ করে ভিতর দোকানে চলে গেল ওষুধ আনতে। একবারের জন্যেও সে  মুখ তুলে তাকাল না, কোনোরকম ডকুমেন্টস ও চাইল না। এটা মৃত্তিকার চেনা দোকান। সেইজন্যেই দুটো স্টপ বাসে এখানে আসা।
এদিক ওদিক তাকিয়ে মৃত্তিকা দেখল সামনেই একটা ফুচকাওয়ালা। ওষুধ আর খুচরো টাকা হাতে নিয়ে ক্লান্ত পায়ে সেইদিকে এগিয়ে চলল। বাড়িতে গগন প্রচণ্ড পোস্ট-উইথড্রয়াল যন্ত্রণায় ভুগছে। জিনিসপত্র ভাঙছে। কোল্ড টার্কির সময় স্পাজমোপ্রক্সিভন লাগে তার। এর আগে বার তিনেক রিহ্যাব ট্রিটমেন্ট ফেল করেছে। মৃত্তিকা তাকে বলেছে এই শেষ। এর পরও যদি সে  আবার ব্রাউন-সুগার করে তাহলে সে বাতানলে ফিরে যাবে টুনুকে নিয়ে। গ্রাম-মফস্বলের মেয়েদের এরকম জেদ কি থাকে?
প্রথম ফুচকাটা মুখে দিয়ে মৃত্তিকার মনে হল টুনুর হয়ত খিদে  পেয়েছে। তারপরেই আবার মনে হল, পরবের সময় একটা বাচ্চাকে আলমরা কিছু নিশ্চয়ই খাওয়াবে।
অসময়ে, মৃত্তিকা ঠিক সেইখানে দাঁড়িয়ে একটার পর একটা ফুচকা খেয়ে যেতে থাকল।