সকাল দশটায় প্রথম সাইরেন।
সরকারের থেকে জারি হওয়া ইন্সট্রাক্সান মত ল্যাম্পপোস্ট বাঁচিয়ে ছেলেটি এক লাফে বিহারি মিস্টির দোকান আর রোয়াক-ওয়ালা বাড়িটার মাঝখানে সেঁধিয়ে যেতেই বড়রাস্তার উপর দিয়ে একটা আধ ভাঙ্গা দেজ মেডিকালের মিনি বাস তিন বার শূন্যে ঘুরপাক খেয়ে গাল্ভানাইজড রাবারের বলের মত দুবার ভীষণ শব্দে পিচ রাস্তায় ড্রপ খেয়ে তিনকোনা পার্কটার মধ্যে রেলিং ভেঙ্গে ঢুকে গেল। চারদিকে লোহার আর ভাঙ্গা মেসিনারিসের চুরমুরি ছড়িয়ে, ভাঙ্গা কাঠ, গাছপালা, অ্যাসবেস্টাসের টুকরো, রাস্তা প্রায় জনশূন্য। ভোরের কাক ডাকার আগেই রাষ্ট্রশক্তির রাত-ডোমেরা এসে আগের দিনের ঝড়ের তাণ্ডবে ঝরে পড়া মৃতদেহ গুলি কে হাপিশ করে দেয়। রাস্তা ধুয়ে মুছে নিশ্চিহ্ন করে দেয় মৃত্যুর নামগন্ধ। নাগরিক ক্ষয়ক্ষতিগুলোর সাথে বাঙ্গালীরা বেশ আপোষ-ই করে নিয়েছে।পড়ে থাকে ভাঙ্গাচোরা ইতিহাস, আশি-নব্বই-এর বাঙালি মধ্যবিত্ত ঘরবাড়ীর একরকমের ছাপ ছিল, ঝড়ে ক্রমাগত ভেঙ্গে পড়া আর মেরামতি চক্রাকার আবর্তে পড়ে আজ তাদের বাড়িঘর আফগানিস্তানের মত।
রোজকারের এই ঝড়, দিনে দুবার আসে, উড়িয়ে নিয়ে যায় সামনে যাই পায়। বঙ্গোপসাগরের উপকূল পেরিয়ে মাত্র দুশো কিলোমিটার গেলে এই ঝড়ের উৎসস্থল। প্রবল নিম্নচাপ, এক প্রকাণ্ড জায়গা প্রায় বাতাসহীন। দেশবিদেশের তাবৎ বিজ্ঞানীরা এর কারন জানতে পারেননি এখনও। তাই দেশ এনেছে প্রীভেন্টিভ মেজারস। ইন্সট্রাক্সান মানলে অ্যাক্সিডেন্ট এরানো যায় বটে। কিন্তু ভাঙ্গাচোরা রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, হঠাৎ থমকে যাওয়া জীবনযাত্রা, তার-ই মাঝে কাকে ঠুকরে খাচ্ছে রাতজাগা মাতালের ডেদবডি, চাকালাগানো পশরা সাজিয়ে দোকানী দের বিক্রিবাটা, অফিসের বাস, শেয়ারের গাড়ির ক্যাঁকক্যাঁক, ভয়ের ঘুন যেন চারিদিকে নাছোড় হয়ে লেগে আছেই। বাদামী রঙের ধুলো দেখা যায় উঁচু বিল্ডিং গুলোর পেছন দিয়ে, তারপরেই আর্তনাদের মত ভেসে আসে সাইরেন। রাতারাতি যেন সব বদলে যায়, নিশ্চিত মৃত্যু এড়াতে পাল পাল মানুষ দৌড়ে আশ্রয় খোঁজে যাতে ঝড়ের ডিরেক্ট ঝাপটা আড়াল করা যায়। গাড়িঘোড়া গলিঘুচি খুঁজে নিয়ে নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে ওজন বাড়িয়ে নেয় যাতে হাওয়ায় উড়ে না যায়। পুরোটাই যদিও এখনও পরীক্ষানিরীক্ষার স্তরে আছে। তাই আচমকাই ঘটে যায় অঘটন। প্রকৃতি অযাচিত ভাবে নেয় তার প্রতিশোধ। ছেলেটির চোখের সামনে যে বাসটি পাল্টি খেল সেটাও সেইরকমই একটা ঘটনা। ছোট্ট অসাবধানতা।
সরকারের থেকে জারি হওয়া ইন্সট্রাক্সান মত ল্যাম্পপোস্ট বাঁচিয়ে ছেলেটি এক লাফে বিহারি মিস্টির দোকান আর রোয়াক-ওয়ালা বাড়িটার মাঝখানে সেঁধিয়ে যেতেই বড়রাস্তার উপর দিয়ে একটা আধ ভাঙ্গা দেজ মেডিকালের মিনি বাস তিন বার শূন্যে ঘুরপাক খেয়ে গাল্ভানাইজড রাবারের বলের মত দুবার ভীষণ শব্দে পিচ রাস্তায় ড্রপ খেয়ে তিনকোনা পার্কটার মধ্যে রেলিং ভেঙ্গে ঢুকে গেল। চারদিকে লোহার আর ভাঙ্গা মেসিনারিসের চুরমুরি ছড়িয়ে, ভাঙ্গা কাঠ, গাছপালা, অ্যাসবেস্টাসের টুকরো, রাস্তা প্রায় জনশূন্য। ভোরের কাক ডাকার আগেই রাষ্ট্রশক্তির রাত-ডোমেরা এসে আগের দিনের ঝড়ের তাণ্ডবে ঝরে পড়া মৃতদেহ গুলি কে হাপিশ করে দেয়। রাস্তা ধুয়ে মুছে নিশ্চিহ্ন করে দেয় মৃত্যুর নামগন্ধ। নাগরিক ক্ষয়ক্ষতিগুলোর সাথে বাঙ্গালীরা বেশ আপোষ-ই করে নিয়েছে।পড়ে থাকে ভাঙ্গাচোরা ইতিহাস, আশি-নব্বই-এর বাঙালি মধ্যবিত্ত ঘরবাড়ীর একরকমের ছাপ ছিল, ঝড়ে ক্রমাগত ভেঙ্গে পড়া আর মেরামতি চক্রাকার আবর্তে পড়ে আজ তাদের বাড়িঘর আফগানিস্তানের মত।
রোজকারের এই ঝড়, দিনে দুবার আসে, উড়িয়ে নিয়ে যায় সামনে যাই পায়। বঙ্গোপসাগরের উপকূল পেরিয়ে মাত্র দুশো কিলোমিটার গেলে এই ঝড়ের উৎসস্থল। প্রবল নিম্নচাপ, এক প্রকাণ্ড জায়গা প্রায় বাতাসহীন। দেশবিদেশের তাবৎ বিজ্ঞানীরা এর কারন জানতে পারেননি এখনও। তাই দেশ এনেছে প্রীভেন্টিভ মেজারস। ইন্সট্রাক্সান মানলে অ্যাক্সিডেন্ট এরানো যায় বটে। কিন্তু ভাঙ্গাচোরা রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, হঠাৎ থমকে যাওয়া জীবনযাত্রা, তার-ই মাঝে কাকে ঠুকরে খাচ্ছে রাতজাগা মাতালের ডেদবডি, চাকালাগানো পশরা সাজিয়ে দোকানী দের বিক্রিবাটা, অফিসের বাস, শেয়ারের গাড়ির ক্যাঁকক্যাঁক, ভয়ের ঘুন যেন চারিদিকে নাছোড় হয়ে লেগে আছেই। বাদামী রঙের ধুলো দেখা যায় উঁচু বিল্ডিং গুলোর পেছন দিয়ে, তারপরেই আর্তনাদের মত ভেসে আসে সাইরেন। রাতারাতি যেন সব বদলে যায়, নিশ্চিত মৃত্যু এড়াতে পাল পাল মানুষ দৌড়ে আশ্রয় খোঁজে যাতে ঝড়ের ডিরেক্ট ঝাপটা আড়াল করা যায়। গাড়িঘোড়া গলিঘুচি খুঁজে নিয়ে নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে ওজন বাড়িয়ে নেয় যাতে হাওয়ায় উড়ে না যায়। পুরোটাই যদিও এখনও পরীক্ষানিরীক্ষার স্তরে আছে। তাই আচমকাই ঘটে যায় অঘটন। প্রকৃতি অযাচিত ভাবে নেয় তার প্রতিশোধ। ছেলেটির চোখের সামনে যে বাসটি পাল্টি খেল সেটাও সেইরকমই একটা ঘটনা। ছোট্ট অসাবধানতা।
ঠিক যেমন সেইদিন মেয়েটির দিকে ভীষণ কড়া
সাবধানতা নিয়ে পেছন ঘুরে তাকাতেই চোখে চোখ পরে যায়। মেয়েটি ভীষণ ঠাণ্ডা চোখে তাকায়, করাতচেরা ইস্পাতকঠিন চোখ। ঠিক
তখনই বোধহয় ঝড় এসেছিলো। কোন কোন দিন ঝড়েরও সময়-অসময় আসে।
স্কুলে-টিউশানে আসার সেরকম প্রয়োজন পড়েনা আজকাল আর, ইন্টারনেটেই স্কুল গুলি কিছু না কিছু ব্যাবস্থা নিয়ে নিয়েছে। পরীক্ষা দিতে আসতে হয় যদিও। আর মাঝে মধ্যে কেউ কেউ ঝড় অগ্রাঝ্য করে পড়াশোনা বাদ দিয়ে বাকি কিছুর টানে স্কুলে আসে।
স্কুলে-টিউশানে আসার সেরকম প্রয়োজন পড়েনা আজকাল আর, ইন্টারনেটেই স্কুল গুলি কিছু না কিছু ব্যাবস্থা নিয়ে নিয়েছে। পরীক্ষা দিতে আসতে হয় যদিও। আর মাঝে মধ্যে কেউ কেউ ঝড় অগ্রাঝ্য করে পড়াশোনা বাদ দিয়ে বাকি কিছুর টানে স্কুলে আসে।
আজও তেমনি একদিন।
মায়ের বারণ, খুন্তি, চোখ-রাঙ্গানি উপেক্ষা করেও স্কুলে
এসেছিল, আজ সেকেন্ডারির
শেষ দিন খাতায় কলমে। এরপর হয়ত সে এবং হয়ত মেয়েটিও আরও লাখ লাখ পরিবারের মত শহর
ছেড়ে পশ্চিমে চলে যাবে। কলকাতায় বড় বেশি মৃত্যুভয়। হয়ত দুটি আলাদা আলাদা শহরে, হয়ত ভিড়ের মধ্যে আর কক্ষণও সে
দেখতে পাবে না : ছেঁড়া ক্যানভাসের ব্যাগ, সবুজ হেয়ার-ব্যান্ড, চুরো করে বাঁধা চুলে 'পিস-সাইন' হেয়ার-ক্লিপ, লম্বা সাদা মোজা গুটিয়ে
ব্যালেরিনার বাকলের কাছে থমকে, হাঁটুর ঠিক উপরে বাদামী জরুল, খুব মন দিয়ে না দেখলে বঝা যায় না, কপালের কাছে ঘামে আটকে থাকা
কয়েকটি চুল আর ওই করাতপানা চোখ। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ-ই ফ্যাস করে দেওালের গা
থেকে ছিঁড়ে নিল সৃজিত মুখার্জির নতুন ছবির পোষ্টার, তারপরেই হিহি করে পাগল-পাগল হাসি, আত্মহারা হাসি, ওই হাসি দেখলে যেন নিমেষে পৃথিবীর
তিনশোটি মেজর যুদ্ধে সীজ-ফায়ার ঘোষণা করা হত, স্কুল-বাস থেকে লুকিয়ে
জানলা দিয়ে দেখছিল ছেলেটি, যতক্ষণ না
বাস বালিগঞ্জ-ফাঁড়ির জ্যাম থেকে বেরয়, চোখে চোখ পরতেই সেই অদ্ভুত অজানা
দুঃখ মেশানো অনুভূতি যেটি এখনও তার কাছে আনএক্সপ্লেনেবল।
সেলিমপুরের রেল-গেটের কাছে তার এক চেনা পাগল পাতাখোর থাকে, তাকে একদিন কেক খাইয়েছিল এবং তার পরিবর্তে পাগলটি তাকে অগ্নিপুত্র-অভয়ের কমিক্স দিয়েছিলো, 'এসব এখন আর পাবিনে, ঝড়-যুদ্ধের বাজারে তো আরই না।' এখন তাকে আর অত ভয় পায় না সে। পাগলটি পর্যন্ত আজ সকালে তাকে দেখে পাড়ামাত করে চেঁচিয়ে বলেছে, 'তোর গা' দিয়ে মম করছে বাছুর-প্রেমের গন্ধ, যা বাপ, জলদি যা, আহারে কাঁদালি আমায়, যতক্ষণ না ঝড় আসে ততক্ষণ এই গন্ধ আমায় পাগল করবে রে!'
সেলিমপুরের রেল-গেটের কাছে তার এক চেনা পাগল পাতাখোর থাকে, তাকে একদিন কেক খাইয়েছিল এবং তার পরিবর্তে পাগলটি তাকে অগ্নিপুত্র-অভয়ের কমিক্স দিয়েছিলো, 'এসব এখন আর পাবিনে, ঝড়-যুদ্ধের বাজারে তো আরই না।' এখন তাকে আর অত ভয় পায় না সে। পাগলটি পর্যন্ত আজ সকালে তাকে দেখে পাড়ামাত করে চেঁচিয়ে বলেছে, 'তোর গা' দিয়ে মম করছে বাছুর-প্রেমের গন্ধ, যা বাপ, জলদি যা, আহারে কাঁদালি আমায়, যতক্ষণ না ঝড় আসে ততক্ষণ এই গন্ধ আমায় পাগল করবে রে!'
গলিটা থেকে বেরতেই সে দেখল ঠিক উল্টো
দিকের গাড়ি গলিতে মেয়েটি লুকিয়েছিল, সে তাকে ডেকে বললে,
'জানতাম না আজ কেউ আসবে বলে, সকালে দেখিস নি আজ নাকি যখন তখন ঝড় আসবে, বৃষ্টিও থামবেনা শুরু হলে একবার।'
-'না খুব তাড়াহুড়োয় বেড়িয়েছি, ওই ল্যাব-ম্যানুয়াল গুলো...'
'জানতাম না আজ কেউ আসবে বলে, সকালে দেখিস নি আজ নাকি যখন তখন ঝড় আসবে, বৃষ্টিও থামবেনা শুরু হলে একবার।'
-'না খুব তাড়াহুড়োয় বেড়িয়েছি, ওই ল্যাব-ম্যানুয়াল গুলো...'
তখন দূর থেকে টুয়েলভ-বার ব্লুজ শোনা
যাচ্ছিল, সম্ভবত
অর্গান। টাটকা ঝড়ের সদ্য আঘাত সংক্রান্ত কিছু অস্ফুট আর্তনাদও। দিগন্তের বাদামী
ধুলোর শামিয়ানা তখন ছিল। দূর থেকে স্কুলের ঘণ্টার ঘর টা দেখা যাচ্ছিলো।
:)
ReplyDelete