Friday, December 8, 2017

লেত্তি

The Tryst of Letti
- Chaiti Nath, Jan 2017



                                                                (১)

অফসাইডে চারজন ফিল্ডার। তারমধ্যে কভারে বাঘের মত ওঁত পেতে দাঁড়িয়ে আছে সুমিত। ফরওয়ার্ড শর্ট-লেগে সুমিতের ভাই ভিকি। বাবা-মা ইন্টারকাস্ট বলে দুই ভাই কে পাগড়ি দেননি। কলকাতায় মার্চের চামড়া জালানো গরম। রক্ষে করেছেন।
আলমদের ছোটছেলে বল করবে। লুঙ্গি আর নকল অ্যাডিডাসের ছাইরঙা টিশার্ট। খালি পা। চুইং-গাম চেবাতে চেবাতে সোজা হয়ে দাঁড়াল। কোমরের নিচে অদৃশ্য হাতের কব্জি থেকে সাপের ছোবলের গতিতে ছিটকে দুশ গ্রামের প্লাস্টিক-বল স্পেস-টাইম ডিস্টরট করতে করতে ড্রপ খেলো গুড-লেংথে। আমার কানের পেছনে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম, আগের দুটো বল এত জোরে ছিল না। আগের দুটোই লেগ স্পিন ছিল, একটা ক্যাচ হতে হতে চার হয়ে গ্যাছে, আরেকটা ফ্লাইট মিস করে উইকেট-কীপারের হাতে গ্যাছে। ঠ্যাং বাড়িয়ে কভার আর সোজা সটের মাঝখানের স্পেস টা নেব ইতিমধ্যেই বল সম্পূর্ণ উল্টো দিকে ঘুরে আমার মিডল স্টাম্প ছিটকে দিয়েছে। ইসস, বোঝা উচিত ছিল। আরহান খুবই আনপ্রেডিক্টেব্ল। চারিদিকে সবার পাশবিক উল্লাস, ম্যাচ ওদের হাতের মুঠোয়। রানার্স এন্ডে সানি। যে কিনা এখনো দুধভাত পর্যায়ের। লাস্ট ম্যানের ব্যাটিং আছে। সে আউট হলেই শেষ। বাকি চার বলে বারো রান। জেতার আশা প্রায় নেই।
জগুন চিৎকার করে বললে, 'বোলা থা না, ইশকো উপার ভেজ, উসকো সেট হনে মে টাইম লাগতা হ্যাঁয়!'
কথাটা সত্যি। আমি অত্যন্ত নার্ভাস জাতীয় প্লেয়ার। আর আজ আমার মনে হচ্ছিল, লিফটের অ্যাটিক থেকে দেওয়াল ভেদ করে লেত্তি আমায় দেখছে। কেউ আমায় দেখলে আমার আরও হাঁটু কাঁপে।
লেত্তির চোখগুলো আমি কক্ষনও দেখিনি। মানে, ওর কপাল থেকে ঠোঁট অব্দি কিরকম একটা নিঝুম অন্ধকারে ঘেরা।

বয়েস চোদ্দ, পড়াশোনায় ভালই। আর পাঁচজনের মত গিটার বাজাতে, ছবি আঁকতে পারতাম।
কয়েক সপ্তাহ আগেই বার দুয়েক জন্ডিস হয়েছে, বিলিরুবিন ভীষণ বেড়ে বিছানার চাদর অব্দি হলুদ হয়ে যাচ্ছিল। শরীর এখনো দরের হয়নি। দিনের পর দিন পেঁপে আর মাগুরমাছ খেয়ে মানসিক ভাবেও অত্যন্ত দৈন্যে ভুগেছি।
মাঝখানে আবার আলমদের বড়ছেলের বিয়ে ছিল। বেলিয়াসোর থেকে তিনখানা ডাইনোসরের সাইজের দুম্বো ওদের বারান্দায় রাখা ছিল। ওদেরকেই হালাল করে, ম্যারিনেট করে বিরাট ডেকচিতে বিরিয়ানি হয়েছিল। লখনউ থেকে বাবুর্চি এসেছিল।অজস্র কাবাব আর সরের ময়ান দেওয়া লাচ্ছা পরটা। চাল-ক্ষীরের ফিরনি। মেওয়া দেওয়া সীমাই। মিঠা ভাত। আমাদের ফ্লাটের উলটোদিকেই। গন্ধে মনে হচ্ছিল এইসব না খেতে পাওয়ার থেকে মরে যাওয়াই অনেক ভাল। আলমরা আবার প্র্যাক্টিকাল জোক করেছিল আমার সাথে। বলেছিল দাওয়াত পে আইয়ে, পেপে-কা বিরিয়ানি বানায়েঙ্গে আপ কে লিয়ে!
                                                               (২)

দু মাস বিছানায় শুয়ে কিছু করার থাকত না। ছোটমামা আর তার বান্ধবী আমাকে প্রতি সপ্তাহে বই এনে দিত। তখনই জুলভারনের অমনিবাসটাও পরেছিলাম। শুরুতে অসম্ভব ভাললাগছিল। কিন্তু বাধসাধল প্যাসিফিকের কোন
এক নাম-না-জানা দ্বীপে বন-শুয়োর শিকার করে এনে আগুনের মশলা দিয়ে ঝলসে খাবার ডেস্ক্রিপ্সান পড়েই (টয়েন্টি থাউস্যান্ড লীগস আন্ডার দ্য সী)। তখন একটু শরীর সেরে আসছিল, একঘেয়ে খাবার খেয়ে খেয়ে হঠাৎ একদিন মনে হল, আর না!
মনে পরল বাবা বলেছিল, সর্বহারারাই বিপ্লব করতে পারে। আমি এখন প্রকৃত অর্থে সর্বহারা। আলমদের বিয়েবাড়িটা মিস করাটাই থ্রেশহোল্ড ছিল।

ওঠা বারণ, পা টিপে টিপে উঠলাম। শীতের রাত। ফ্রিজে নলেন গুড়ের টিন। গুছিয়ে পাউরুটি নিয়ে সোফায় বসে কম ভল্যুমে টিভি চালালাম। পোকেমনের রিপিট টেলিকাস্ট। খাবার শেষ হতেই কেবল কেটে গ্যাল। জানলায় গিয়ে বসলাম। ঠাণ্ডা হাওয়া। পাঁচতলার জানলা দিয়ে পুরো এলাকাটাই দেখা যায়। নস্করপাড়া, একটু দুরে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের গেট পেরিয়ে জংগুলে মত জায়গা, বন বাদাড় পেরিয়ে গঙ্গা, গঙ্গায় আবছা কিছু আলো কুয়াশা কেটে ভীষণ মন্থর গতিতে এদিক অদিক  করছে, কারখানার ধোঁয়ায় আকাশ শ্যাওলাটে।
আমাদের এপার্টমেন্ট টপ-ফ্লোরে , ছাদ থেকে হঠাৎ একটা শব্দে চমকে উঠলাম। একবার মনে হল কাটিয়ে দি, দেখলাম বাবা-মা অঘোরে ঘুমাচ্ছে। নিনজা মোডে কল্যাপ্সিবল খুললাম, পালকের হাতে ছাদের গেট,
সামনেই দিগন্ত বিস্তৃত ছাদ, যেখানে অসুখ হওয়ার আগে অব্দিও রোজ বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে বল পেটাই।
ছাদে উঠতেই সেই একনাগাড়ে দুমদাম শব্দ। আসছে লিফটের যন্ত্রের একফালি ঘরটা থেকে। একবার আগে একটা শকুন এসে আটকে পরেছিল এইখানে। দরজা খুলে বের করতে গেলে রাগী রাগী চোখে তাকাচ্ছিল আর ভিকি বলেই যাচ্ছিল ঠুকরে চোখ খুবলে নেবে।
দরজা খুলেই হাঁহাঁ করা অন্ধকার, আর হাই-ভোল্টেজ ইলেক্ট্রিসিটির একটানা শব্দ। লিফটের আসা যাওয়া এত রাতে হয়না বললেই চলে। হলেও এরকম দরজা ধাক্কানোর মত শব্দ হয়না। ভেতরে ঢুকে কোনরকম শব্দের কারণ খুঁজে না পেয়ে পেছন ফিরতেই হঠাৎ 'দুম' করে খুব কাছেই যেন কোন ভারী বাক্স দোতলার বারান্দা দিয়ে মাটিতে এসে পরল। হঠাৎ খুব ঠাণ্ডা লাগল। হয়ত আবার জ্বর আসছে। ভয়ে গলাটা শুকিয়ে গ্যাছে। কোনরকমে থুতু গিলে পেছন ঘুরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়েও কিছু দেখতে পেলাম না।
দরজা বন্ধ করে কোনরকমে তাড়াহুড়ো করে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় মনে হল দেওয়াল দিয়ে যেন চাপা গুমগুম শব্দ আমার পিছুপিছু নামছে, সেই সঙ্গে মিশকালো ঠাণ্ডা এক ঝলক বাতাস। অজানা এক আতঙ্কে আমি ঝড়ের বেগে সিঁড়ি দিয়ে নেমে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করতেই শব্দ পিছু নেওয়া বন্ধ হল। সারারাত ঘরের আলো জ্বালিয়ে মরার মত পড়ে থাকলাম, ভাল ঘুম এলো না।

                                                             (৩)

পরদিন দুপুরে টুমনা এলো সাপ্তাহিক স্কুলের কাজ আর সিলেবাস নিয়ে। মা ওকে গরম গরম কপির সিঙ্গারা ভেজে দিল, আমায় দিল মশলা ছাড়া অল্প তেলের চিঁড়ে ভাজা। ওকে আগের দিনের ঘটনা জানালাম সংক্ষেপে,ও হাঁ করে শুনল। বলল একদিন রাতে এসে থাকবে যদি এমনি চলতে থাকে। দুজন মিলে অবসারভ করব। টুমনা এমনিতে খুবি ডাকাবুকো, ফুটবল খ্যালে তাই লম্বা বিনুনিটা গত বছর ত্যাগ করেছে। বড় বড় চোখ।
পর পর আরো দুরাত রোজই শব্দ শুনতে পেতাম, আর কেউ পায়েনি। মা-বাবা না, খেলার বন্ধুরাও না। আমিও ঘর থেকে বেরইনি।
তৃতীয় দিন কষ্ট করে স্কুলে গেছিলাম সাজেশান আনতে। হাঁটলে পেটে লাগত।
আমাদের এক বহু বছর আগের পাস-আউট  সিনিয়ার ছিল, স্কুল ছাড়ার আগে আগে সে নাকি স্কুলের পেছনের জঙ্গলে একটা নীল গোসাপ দেখতে পেয়েছিল। তারপর তাকে ধরতে গিয়ে গঙ্গায় পড়ে যায়, সেই থেকে পাগল হয়ে স্কুলের মাঠেই পড়ে থাকে। একেবারেই ভায়লেন্ট না। বরং ছেলেদের সাথে ফুটবল খ্যালে, টিফিন ভাগ দিলে খায়। আমার সাথে ভাল করেই কথা হত তার। আমাকে একবার বলেছিল গঙ্গার তলে সে নাকি পানিমুড়া দেখেছে। যারা অভিশপ্ত জলে ডুবে মরে তারা পানির মধ্যে পানিমুড়া হয়ে থাকে, তাদের মাছের মত কানকো আর পাখনা গজায়।
বিষ্টু পাগলা আমার গল্প শুনে বলল, 'যদি ভয় না পাস তাহলে, যে তোকে শব্দ করে ডেকেছে তাকে তুইও আওয়াজ করেই সাড়া দে। '

সেদিন রাতে যেন বাঁধনহারা শব্দ, মনে হল দুনিয়া সুদ্ধু সবাই এখুনি জেগে যাবে। আসে পাশে কেউ যেন হাতুড়ি মেরে মেরে দেওয়াল ভাংছে। উঁকি মেরে দেখলাম মা-বাবা ঘুমে অচেতন, যেন ঘরের মধ্যে কুয়াশা। মন হল পৃথিবীতে এমন কিছু আছে যেগুলোর ভাগ আর কেউ নেবে না। উপলব্দি গুলো আমারই। একার। দরজা খুলে লিফটের ঘরের সামনে এলাম। দরজা যেন শব্দে ফেতে পড়তে চায়। অসম্ভব ভয়ে হাত পা হিম হয়ে যাচ্ছে। সাহসে ভর করে অত্যন্ত আস্তেআস্তে দরজায় টোকা দিলাম। হঠাৎ নৈশব্দ। প্রতিটা মিনিট কাটতে লাগল ভীষণ আস্তেআস্তে। চাঁদের আলোয় চারিদিক সাদা। প্রতি মুহূর্তে যেনও ঠাণ্ডা বেড়েই চলেছে।
হঠাৎ সবকিছু তোলপাড় করে দেখলাম কার্নিশ থেকে উল্টো হয়ে একটি সবুজ সালওয়ার পরা মেয়ে আমার দিকে দেখছে। মাথার চুল লম্বা হয়ে মাটিতে এসে ঠেকেছে। ভয় হাত-পা কাঁপছে, স্নায়বিক চাপে হয়ত অজ্ঞানই হয়ে যাব।
মেয়েটি হাওয়ায় ভেসে ভেসে শম্বুকগতিতে আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। ঠাহর করে দেখলাম লিকলিকে হাত-পা, খুবি পুরনো সালওয়ার, চোয়ালের হাড়গুলো উঁচু উঁচু, চোখ দুটো দেখা যায়না, কপালের নিচে যেন নির্নিমেষ অন্ধকার। মেয়েটি যেন ঘষা কাঁচে তৈরি।
 

                                                            (8)

যখন চোখ খুললাম তখন সকাল সাড়ে দশটা । তারপর থেকেই লেত্তি প্রায়েই গভীর রাতে ঘরে আসত, ওইরকম ভাবেই, উল্টো হয়ে জানলা দিয়ে। মাথার কাছে এসে বসত। কখনো কথার উত্তর দিত, কখনো  দিতনা।  বাংলায় কথা বলত।
বলেছিল আগে নাকি ফ্ল্যাটের পাশের খবরখানা টা আসে পাশের আধ কিলোমিটারেরও বড় রেডিয়াস ধরে ছিল। পরে মাটি ফেলে কারখানা, ফ্ল্যাট বাড়ি আর রাস্তা  হয়। আগে যখন আসে পাশে মুসলমানদের গ্রাম ছিল, সব উজাড় হয়ে যায় কলেরায়। তখন কবর খানা বাড়তে বাড়তে এদিকে ছাপিয়ে চলে আসে। হিসেব মত লেত্তির কবর আমাদের ফ্ল্যাটের লিফটের গর্তের নিচে। গ্রাউন্ড ফ্লোরেরও নিচে, বেস্মেন্টের গ্যারাজেরও নিচে। লিফটের ছোট্ট গর্তের নিচে। লেত্তি কিন্তু কলেরায় মরেনি, গ্রামের পারে, কবর পেরিয়ে বেঁটে বেঁটে গাছের জঙ্গলে আদিবাসীরা ফাঁদ পেতেছিল শজারু ধরার জন্যে, একটা নীল গোসাপ কে তাড়া করতে করতে ফাঁদে পড়ে অত্যধিক রক্তপাতের কারণে তার মৃত্যু হয়।
পরে বড় হয়ে ভেবেছি তাকে নামাজের সময় দেখা যায়নি কক্ষন। টিভির ঘরের জানলার বাইরে গোধূলির আলোয় ওকে কার্নিশে ঝুলতে দেখেছি। ও বলত ওর দুনিয়টা আমাদের মতই দেখতে, কিন্তু উল্টো। আমার কোনদিন ক্ষতি করেনি, সপ্তাহে এক দুবার আসত। ভয়টা কেটে গেছিল।
 

ক্লাস টেনের পরে আমরা সপরিবারে দিল্লী চলে যাই। দিল্লীতে কক্ষন লেত্তিকে দেখিনি। খালি নিজামুদ্দিনের দরগায় একটা ফকির আমার মাকে বলেছিল আমার মাথায় জীনের ছায়া আছে।





















Tuesday, November 28, 2017

মুসল্লাহ

একটা প্রজেক্টের শুরু থেকে মাঝপথ অব্দি এই নিয়ে তিনবার ওডিসি চেঞ্জ হল। এমনিতে কোনো অসুবিধা নেই। এনএসএস লোকেরা এসে রাতের বেলা সিপিউ তুলে নিয়ে নতুন সিটে লাগিয়ে দ্যায়, সোমবার সকালে গিয়ে প্রথম কাজ হয় গোলকধাঁধার মত অফিস ফ্লোর ঘুরে নতুন সিটটা আবিষ্কার করা।
রেফ্রিজারেটেড আবহাওয়ায়, আর্টিফিশিয়াল সিলিঙের নিচে সবই একরকম লাগে। ছোটবেলায় স্কুলের গেট থেকে গঙ্গার পাড়ের ঝোপঝাপড়া অব্দি একা একা ভাঙ্গা ডাল নিয়ে গোসাপ খুঁজে বেড়াতাম, আই গেট লিটল ফাজি ইন মাই হেড ইন আ ফর্মাল অ্যাটমস্ফিয়ার। 

টেবিলটা নোংরা করে রেখেছিলাম একগাদা অ্যাকশান ফিগার, ববলহেড, বই আর সফটবোর্ডে গোছা
গোছা পপকালচারের পোস্টার ইত্যাদিতে। মাঝে মাঝে ছিঁড়ে ফেলে দিতে ইচ্ছে হত। ইচ্ছে হত ম্যানেজারের গালে ঠাশ করে একটা উল্টো হাতের চড় মেরে বলি 'ইয়ার্কি হচ্ছে গুদ্মারানির ব্যাটা?', কিন্তু পারতাম না। মাস গেলে তিরিশ হাজার বাংলা অনার্স পরলে পেতাম কি? হয়ত না, কারণ আমার সেরকম যোগ্যতা ছিলনা।    
সময় নিয়ে বাক্সে ঢোকালাম, কফি বানালাম। সপ্তাহের সবচেয়ে কড়া কাপ। তারপর খাঁচায় বন্দি বাঘের মত অ্যাঙ্গজাইটি অ্যাটাক খেতে খেতে নতুন ওডিসি খুঁজতে বেরলাম। অবশ্যই হেডফোন লাগিয়ে, কারণ সোমবার সকালে সাড়ে দশটার সময় কেউ খেজুর করতে এলে তাকে খারাপ ভাবে খুন করে দিতেও আমি দুবার ভাবব না। সিয়াচেনে বাঙ্কারের বাইরে যেমনি কেউ বুলেটপ্রুফ না পরে মুততেও যায়না, তেমনি হেডফোন না লাগিয়ে আমি এমনি কোথাও যাইনা যেখানে আমাকে মাথার মধ্যেকার যুদ্ধ ছাপিয়ে কারুর সাথে স্মলটক করতে হবে। দিনের পর দিন দু-একটা সিলেবেল বাক্যালাপ করে কাটিয়ে দিতে পারি। কিন্তু মাল্টিভেন্ডার মেল-কমিউনিকেশান করার সময় আমি রাজা। চ্যাটবক্সে আমি সাতাশের গ্রেগরি করসো। সামনাসামনি মুখ ফুটে কথা বলার সময় আমার থেকে বেশী অসহায় বোধহয় আর কেউ নেই এই পৃথিবীতে।  
নতুন ওডিসিটা কাছেই আর রাস্তাঘাটে কারুর সাথে কথা বলতে হয়নি দেখে খুশিই হলাম। সিটের আশেপাশে চেনাশোনা কেউ নেই। ডেস্কের ড্রয়ারটা খুলে দেখলাম সিটটি অনতিপূর্বে অন্য কারুর ছিল এবং সে ইচ্ছা বা অনিচ্ছা সহকারে অধিকাংশ জিনিস ফেলে রেখেই চলে গ্যাছে।
কোম্পানির প্রোটকল অনুসারে আমাকে অ্যাডমিনে ফোন করে ডেস্ক ক্লিয়ারেন্সের ডিপার্টমেন্টে যোগাযোগ করতে হত কিন্তু অফিসের কাজে মন ছিলনা আর হাতে সবসময়ই আমার অনেক অনেক সময়। অতলস্পর্শী ডেস্ক থেকে সমস্ত জিনিস বের করে কোলে রাখলাম। আলপটকা ক্ল্যারিক্যাল জিনিস ছাড়া আর ছিল একটি মুরাকামির নভেল আর একটি মুসল্লাহ। 

তারপর, যেটা আমি গত দুই বছরে করিনি সেটাই করে ফেললাম। কিউবিকলের পাঁচিল টপকে অচেনা লোকটিকে জিজ্ঞেস করে ফেললাম এখানে আগে কে বসত।
- অ্যাম নট শিওর, মোস্ট প্রবাবলী শিরিন। লাস্ট নেম মনে নেই। ক্যান? কিছু দরকার?
বোকা খেজুরের গন্ধ পেয়ে ভায়লেন্টলী এরালাম কথাবার্তা।
তারপর আউটলুকে খুঁজতে বসলাম। অফিসে সবমিলিয়ে সাতান্নটি শিরিন, তারমধ্যে কলকাতায় আটটি। সবার কন্ট্যাক্ট কার্ড বের করলাম, তারপর ভেসে গেলাম। তিনজনকে ইন্সটিঙ্কটিভলী বাছাই করে কমুনিকেটারে লিখতে গিয়ে দেখি কিছুই কাজ করছে না। লাঞ্চে নিউজ চ্যানেলে দেখলাম চেন্নাই ভেসে গ্যাছে বন্যায়। সব মিলিয়ে সতেরোটা বিল্ডিং চেন্নাইতে কোম্পানির, মেজর সার্ভারস গুলো ওখানেই। তাই হয়ত দেশজুড়ে টেকনিক্যাল ইস্যু।
অফিস থেকে বেরলাম অসম্ভব জ্বালা নিয়ে সারা শরীরে। যেন জীবনই ব্যর্থ শিরিনকে খুঁজে না পেলে। রাতে ঘুম এল না। জেগে জেগে ভাবলাম কাল যদি আউটলুকের সমস্যা মেটে তাহলে কালই রহস্যের পর্দা উত্তোলন। সকালে উঠে জীবনে প্রথমবার অফিস যাওয়ার জন্যে পেটের কাছে হাল্কা উত্তেজনা অনুভব করলাম। 
অফিসে গিয়ে দেখি চেন্নাইয়ের অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে চব্বিশ ঘণ্টায়। মেল সার্ভারস মায়ের ভোগে। অর্থাৎ আমার কোন কাজই হল না। পুরো দিনটি কাটল কপালের উপরে একটা কালো ছায়া নিয়ে।
হঠাৎ মাথায় এল, মেয়েটি যদি মুসলিমই হয় তাহলে সে রিলিজিয়াস। নাহলে অফিসে নামাজ পরার কাপড় আনত না। তারপর থেকে প্রতি নামাজের সময় যোহর থেকে ঈশা অব্দি মেয়েদের প্রেয়ার রুমের সামনে ঘুরঘুর করতাম। গোটা চারেক মহিলা সবথেকে বেশী ফ্রিকয়েন্ট ছিল। তিনদিনের মাথায় বুঝলাম আমার দ্বারা নিজে থেকে গিয়ে কথা বলা সম্ভব না। তারপরই ভাবলাম যদি সে রিলিজিয়াস হয় তাহলে মুসল্লাহ ফেলে যাবেই বা ক্যান? হয়ত এটি তাকে পরিবারের কোন শুভাকাঙ্ক্ষী দিয়েছিল, সে নির্মম আনগ্রেটফুল , তার তাতে কিছু যায় আসে না।
রাতে অসম্ভব মদ গিলে বাড়ি ঢুকলাম। ফ্ল্যাটমেট পাশের ঘরে মেহেদি হাসান চালিয়েছিল।

जैसे तुम्हें आते हैं ना आने के बहाने
ऐसे ही किसी रोज़ न जाने के लिए आ
খুব কান্না পেল। সিঙ্কের সামনে দাঁড়িয়ে অনেক কাঁদলাম। সাত বছরে অমন কাঁদিনি। হাল্কা লাগল। ঘুমালাম শিশুর মত।

পরদিন বৃষ্টি ঠেলে অফিস এসে দেখলাম মেল, কমিউনিকেটার সব দাঁড়িয়েছে। পরমানন্দে খুঁজে বের করলাম সেই তিনজন কে। দুজন ম্যানেজার লেভেলের, নরম্যাল কিউবিকলে বসবে না। পড়ে রইল ওই এক। দেখলাম
কমিউনিকেটারে তার উপস্থিতি আননোন। মানে সে বিদেশে বা চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। ধুক করে বুকের ঘোড়াদৌড় বন্ধ হয়ে গ্যাল। আশার মুখে পেচ্ছাপ।
শুরু করলাম সোশ্যাল নেটওয়ার্কিঙে খোঁজা। শুধুমাত্র একটি ভীষণ কমন নাম নিয়ে খুঁজে পাওয়ার আশা প্রায় নেই বললেই চলে। দিন দুয়েক সারাদিন ইন্টারনেটে বসে বসে অবসাদে প্রায় না খেয়ে না স্নান করে অসুস্থ হয়ে পরার উপক্রম হল।
আজ অফিসে গেলাম, পাশের ডেস্কের দাসবাবু বললেন একটি বুরখা পরা মেয়ে এসে আমার ডেস্কে ওর জিনিস খুঁজছিল,ডেস্কে চাবি আর ডেস্কে আমায় না পেয়ে বলে গ্যাছে লাঞ্চে আবার আসবে।
কোমরে তীক্ষ্ণ ব্যথা হতে লাগল, হাঁটু দুটো একে ওপরের সাথে ঠোকা লাগছিল, কানের কাছটা গরম লাগছিল। কাঁপা কাঁপা হাতে শিরিনের বাক্সটি দাসবাবুর জিম্মায় দিয়ে বললাম 'দিয়ে দেবেন'।
- একি, কোথায় চললে?
- শরীর ভাল নেই।
সোজা হেঁটে বাইরে এলাম। সিগারেট ধরালাম। বাস স্ট্যান্ডে এসে দক্ষিনের বাসে উঠলাম। ঈশ্বর পেয়ে গেলে মানুষ নির্লিপ্ত হয়ে যায়। নির্লিপ্ততাই বরং থাক। ঈশ্বরের সাথে কথা বলার সোশ্যাল স্কিল আর যাই হোক আমার নেই।

 
















Monday, November 20, 2017

কতগুলি দরজা-জানলা মিলে একখান লাহোর শহর হয়?

ওয়াকাড়ের বাস স্ট্যান্ড থেকে একটু এগিয়ে বিপজ্জনক ভাবে শিবনেড়ি বাসের গা ঘেঁষে স্টেশনগামী সাটলটা দাঁড়াল। বৃষ্টি প্রায় ধরে এসেছে। শ্বেতার গায়ে ভারি রেইনকোট। শীতের আরামে প্রায় ঘুমন্ত, গলা অব্দি মদ্যপ। চোখের পাশে কান্না শুকিয়ে লেগে আছে। এলোমেলো চুল। সরোজিনী, পালিকা বাজারের কলেজের বন্ধুরা তাকে হয়ত আজ অব্দি কক্ষনও এত ডি-গ্ল্যাম দ্যাখেনি।
- 'ম্যাডাম কাঁহা উতরনা হ্যাঁয়?'
- 'হাঁ...?'
সম্বিত ফিরে পেয়ে খেয়াল হল, চক পার হয়ে প্রায় দেড় কিলোমিটার চলে এসেছে। পার্সে এক-দুশ টাকা আছে। আর এক সপ্তাহ অফিস করলে পর মাইনে আবার। তদ্দিন চালাতে হবে।
একটা কুড়ির মারলবোরো অ্যাডভান্সডের থেকে দু তিনটে ছাড়া বাকিটা ব্যাগে আছে। একটা ওল্ড মঙ্কের পাঁচশর টু-থার্ড পড়ে আছে। একটা আধখাওয়া খাখরার প্যাকেট, একটা কার্ল ব্রাশ, ব্লুটুথ স্পিকার আর পঁচিশরকম হাবিজাবি জিনিস সরিয়ে কুড়ি টাকা বের করার পর দেখা গ্যাল, খুচরোর খাপে এক সেট ডোর-কি।

সাটলটা বেরিয়ে যেতেই চাবিটা রাস্তার উপর থেকে খান্দালার পাহাড়ের দিকে লক্ষ করে সে সর্বশক্তিতে ছুঁড়ে মারল, সেই সঙ্গে গাড় পাঞ্জাবী অ্যাক্সেন্টে কিছু অস্ফুটে গালি। তারপর কিছুক্ষণ কসরত করে, ঢাউস সাইডব্যাগ, চল্লিশ লিটারের রাক্স্যাক আর প্রকাণ্ড ট্রলি টেনে বৃষ্টি মেপে হিঞ্জেওারি সেজের দিকে হাঁটা দিল। বেশ খানিকটা পথ। কিন্তু অটোরিক্সা রাত দুটোয় দুশ হেঁকে দেবে। তার চেয়ে টলতে টলতে হাঁটা ভাল। 

পশ্চিমদিক থেকে ঠাণ্ডা হাওয়া সেপ্টেম্বরেও হাড়ে কনকনানি লাগিয়ে দিচ্ছে। নক্ষত্রবেগে ভুসোকালি মাখা ট্রলার বেরিয়ে যাচ্ছে পাশ দিয়ে। কয়েকটা চা-সিগারেট-বড়াপাওয়ের টপরি খোলা আছে। আশেপাশের কয়েকটা অফিস খোলা এখনো। মাইন্ডট্রির সামনে থেকে বাঁদিক নিতেই দুটো বাইকওয়ালা পিছন দিয়ে এসে অতর্কিতে গাড়ি থামিয়ে, 'ম্যাডাম হেল্প? ম্যাডাম লিফট চাহিয়ে?...'  
কয়েক সেকেন্ডের জন্যে ভীষণ অসহায় লাগার পর শ্বেতা হঠাৎই লক্ষ করল তার পেটের মধ্যে কোনো আন্সটেবল তরল কয়েক হাজার ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে ফুটছে। এপিডারমিস দিয়ে ধোঁওয়া বেরচ্ছে,  কানের পেছনদিকটা লাল। বৃষ্টিতে, ঘামে চুল জড়িয়ে আছে কপালে। জেগিন্সের পেছনে নাড়া থেকে খাটো কৃপাণটা বের করে লাল চোখে প্রথম বাইকওয়ালার সামনে নাচিয়ে উচ্চস্বরে বলল,
-'ইয়ে দেখা হ্যাঁয়? পিছওয়াড়ে মে ঘুসা দেঙ্গে বায়েঞ্চ...' 

টাওয়ারের তলায় যখন পৌঁছলাম তখন প্রায় তিনটে বাজছে। প্রডাকশান উইকে লেট-নাইটস খুবই নরম্যাল।
ফোনটা শেষবার দেখেছিলাম যখন, তখন সাড়ে আটটা, শ্বেতার প্রায় পঁচিশটা মিসড কল ছিল। আজকাল এরকম প্রায়েই হয়। নোংরা ব্রেকআপ আর ভিন্ডিক্টিভ রুমমেট, দুটো নিয়ে সারাদিন কুস্তি করে, সূর্য ডুবলেই রাম নিয়ে বারান্দায় বসে যায়। নাহলে শহরে কোন নাম না জানা পাবে। তখন সে অন্যই মানুষ। ধীরে ধীরে নেশা বাড়লে সে মাঝে মধ্যে আমাকে ফোন করে। হিন্দি-পাঞ্জাবি-ইংরিজি গুলিয়ে যায়, হাহা করে হাসতে থাকে সে এবং তারপরে ফোন ধরেই পাস আউট করে যায়। 


ঘরে ঢুকতেই দেখলাম রোহন ডাইনিং থেকে দুটো ব্যাগ টেনে সরাচ্ছে। আমাকে দেখে স্ট্রেট ফেস করে বলল, 
-'শ্বেতা এসেছে। অনেক মদ খেয়ে আছে। আর কান্নাকাটি করে বিচ্ছিরি অবস্থা। শিবাঙ্গি ছাদে নিয়ে গ্যাছে। ' 
বাইরের ঘরের কোনায় ভিজে সপসপে রেইনকোট, লাগেজ। কিচেনসিঙ্কে এঁটো গ্লাস।  
-'মহিলা বলছে এখানে থাকবে এক মাস, আর কিসব বলল বুঝতে পারছিলাম না। তোর ফোন বন্ধ ক্যান বাঁড়া?'
সেই যেবার উইকেন্ডার থেকে ফিরে রাতে আমাদের বাড়িতে সবাই ঘুমিয়েছিল সেইবার আমার গিটারটা বাজিয়ে অনেক র‍্যান্ডম গান শুনিয়েছিল শ্বেতা। সেলফ ডাউট কাটিয়ে কথাই বলতে পারিনি ভাল করে ওর সাথে তখনও।
'দাল দস খাঁ শেহর লাহোর-এ অন্দর
বাই কিন্নে ব্যূহে তাই কিন্নিয়া ওয়ারিয়ান?' 

ছাদে কাউকে না পেয়ে শিবাঙ্গিদের ঘরে বেল বাজাতে বৈভব দরজা খুলল। 
-'ডুড,ইওর ক্রাশ হ্যাজ পাসড আউট অন আওার ফ্লোর।'
দেখলাম চিত হয়ে মেঝেতে সংজ্ঞাহীন শ্বেতা। হাতে নিভে যাওয়া সিগারেট। তিন মনি পাঠানকোঠিকে বেঁটেখাটো শিবাঙ্গি কাউচ অব্দি তুলতে পারেনি।
তিনজন মিলে টেনে তুললাম, সারা মেঝে জুড়ে খয়েরি বমি করে ভাসাল শ্বেতা। কষ্ট করে হেসে বলল সকাল থেকে খাখরা আর ওল্ড মঙ্ক ছাড়া কিছু খায়েনি। জল খাইয়ে, ঘুম পারিয়ে ফোন অন করে দেখি মহিলা টেক্সট করেছে,
' please let me stay here for a couple of days? i'm extremely broken. fucked up with almost every contact i have in this city. can't stay home. i need you.'
আর,
'btw, i found a whiskey in your wardrobe. if i finish i'll buy you another by the end of the week.
and you gotta WASH your clothes.'

তিনজনে আর খানিকক্ষণ হেজিয়ে, সিগারেট টেনে নিচে যাওয়ার উপক্রম করছি এমন সময় শ্বেতা খাটে উঠে বসে বলল,
-'ক্যা ম্যায় তেরে অ্যাপারট্মেন্ট মে আভি নহা সাকতি হু? নহালুঙ্গি তো ঠিক হো জাউঙ্গি।'
এই বলে সে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে মোক্ষম টাস্কি খেল এবং টিভি টেবিল ধরে, হেসে নিজেকে সামলাবার চেষ্টা করল। 
আমি বললাম ফ্রিজে চিকেন আছে। চল তোর পেটে খাবার দি কিছু।
















Tuesday, November 14, 2017

তিস্তায় তাকিয়ে

ডানদিকে ইউ-টার্ন নেওয়ার সময়ই পরদার ফাঁক দিয়ে চোখে পরেছিল পেট্রোল পাম্প! মানে টয়লেট। সতের বছর আগে এটি এখানে ছিলনা।
প্রায় ৬ ঘণ্টা একবারের তরেও বাস দাঁড়ায়নি। তার আগে যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেটি বিহার বর্ডার। সেখানে নামার কথা ভাবলে বুক কাঁপছিল ইন্দিরার। তারপর মনে হল ফাক ইট! গটগট করে নেমে, পেচ্ছাপ করে, এক ভাঁড় ঘন দুধের চা খেয়ে সিগারেটখোর কো-ড্রাইভারের সাথে মিনিট তিনেক আড্ডা মেরে বাসে উঠে মনে হচ্ছিল তার শরীরের ওজন অর্ধেক হয়ে গ্যাছে। কিন্তু শিলিগুড়ি আসার আগেই যে তার ডায়াবেটিস তাকে এইভাবে ডিসাপয়েন্ট করবে সেটা ভাবেনি। 
মালদা থেকে ডালখোলা অব্দি রাস্তার ভয়ঙ্কর অবস্থা। এবারের বন্যায়। নাহলে গ্রিনলাইন সাড়ে আটটা বাজায় না। গত পনেরদিন ধরে ইন্টারনেট ঘেঁটে ঘেঁটে এই তথ্যটা রিভিউতে পড়ে পড়ে তারপর পরশুদিন টিকেট। 

ইন্দিরার স্বামী দুবছর হল গত হয়েছেন, ইসোফেগাস ক্যান্সারে। তাঁরা চল্লিশ বছরের বেশী সময় ধরে বিবাহিত ছিলেন। দীলিপ রেলের সিভিলবাবু ছিলেন, বদলির চাকরি। দেশের বহু কোনায় সারাজীবন ধরে ঘুরে ঘুরে সংসার করেছেন। বেড়াবার নেশা শিরায় শিরায়। গত পাঁচবছর হল জীবন্মৃত দীলিপের এক্সপনেন্সিয়াল রেটে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া দেখতে দেখতে ডিপ্রেশানে বেশ কিছু অস্বাভাবিক কোপিং মেকানিজম ধরে নিয়েছিলেন। গুড়াখু, ঘুমের ওষুধ খেয়ে স্লিপ রেজিস্ট করে টাল খাওয়া, খাবারের অসম্ভব নোলা এই আর কি।
ষষ্ঠী থেকেই পেটের মধ্যে গুড়গুড়ানি হচ্ছিল। ছেলে মেয়েরা নাটি নাতনি নিয়ে বাড়ি এসেছে, সেই কদিন আর নতুন করে রিসার্চ করা হয়ে ওঠেনি। অষ্টমী তে সবাই সেজেগুজে বেরলেই তিনি লুকিয়ে টানা ট্রলিব্যাগ নিয়ে, সালওয়ার কামিজ পরে মেট্রো ধরে সোজা এসপ্ল্যানেড, বাসে উঠে মেয়েকে ফোনে মেসেজ করে জানালেন,
"Ami kodiner jonye baire jachhi. Amar khnoj nite hobe na.
Ami-i phone kore nebo tomader.
Bhalo katuk pujo."

পাঠিয়েই ফোন ফ্লাইট মোড।
জীবনে কোনদিনই চলন্ত ট্রেনে ঘুম আসেনি, বাসেও এলনা। জেগে থাকলে বেশীই পেচ্ছাপ পায়। পেট্রোল পাম্পের টয়লেটটা এতটাই নোংরা যে লোকে সেখানে কুত্তাও হাগাতে আনবেনা, সেখানে পেচ্ছাপ করে বেরিয়ে ইন্দিরার মনে হল পনের বছর আগে করা শেষ সেক্সের থেকে বেশী ভাল ক্লাইম্যাক্স। 
লাল চা খেয়ে জাঙ্কশান থেকেই শেয়ার গাড়ি তে সামনের সিটে বসে সাড়ে তিন ঘণ্টায় গ্যাংটক।
এমজি মার্গে এসে মন মেজাজ ভাল হয়ে গেছিল। কতরকমের লোক সুন্দর সেজে অত্যন্ত সুন্দর ও পরিষ্কার রাস্তায় হেতে বেড়াচ্ছে, গোর্খাল্যান্ড মুভমেন্টের জন্যে আর সিকিমের সাথে মিলিট্যান্টসদের অসহযোগিতার কারণে পাহাড়ে গা ঘিনঘিনে টুরিস্ট কমই। সামনে দুটি লোক নেপালি সারেঙ্গী বাজিয়ে মিঠে গান ধরেছে, চারপাশে নানা রকম পসরা। 

একটা হস্টেল ঠিক করেছিলেন সেই রাতের জন্যে, অত্যন্ত কম টাকায় বিদেশিরা সিকিম এলে ওখানে থাকে। বাঙ্কবেডের নিচের তলায় ট্রলি রেখে বললেন, 
'আয়ম ফর কলকাতা, ট্রাভেলিং সোলো। আই গেস সিক্সটিন্থ টাইম ইন সিকিম। ইউ?'
ইজরায়েলী ভাঙ্গা ইংরাজিতে জানায় নাম লিয়া। তার আর্মি ভলান্তিয়ারিং শেষ হয়েছে গত মাসে, বিয়ে-প্রেম করার কাউকে পায়েনি। গ্রাফিক ডিজাইনিং পড়তে চায়। টার্ম এন্ডের টাকা নিয়ে ব্যাগ গুছিয়ে সোজা ভারতবর্ষ। দুমাস ধরে হিল্লি-দিল্লী ঘুরছে। এরপর এখান থেকে নেপাল হয়ে দেশে ফিরবে।
লিয়ার দেশের থেকে আনা কেক খেয়ে চোখ লেগে যাওয়ার পড়েও, ঠিক সকাল চারটেতে অ্যালার্মের শব্দে উঠলেন, জিনস আর পারকা গায়ে দিয়ে শীত শীত হাওয়ার মধ্যে হেঁটে সোজা বজ্র বাসস্ট্যান্ড। শেয়ার গাড়ির সামনে লিয়া আর ইন্দিরা। তিনি জানতেন না জঙ্গু যেতে পারমিট লাগে, তারপর যখন শুনলেন তখন মনে মনে ভাবলেন যা হওয়ার হবে।
লিয়া মনের আনন্দে পাহাড়ী বাচ্চা চটকাচ্ছে। 

মঙ্গান পোঁছে লিয়া আর তার বন্ধুদের সাথে আরেকটা লোকাল জিপে আপার জঙ্গু। তাঁকে সিনিয়ার সিটিজেন পেয়ে খাতির, যত্নের কোন সীমাই নেই। হ্যাঁ, পাহাড়ে আসার পর থেকেই বাথরুমের সমস্যাটা মিটেছে। ড্রাইভারেরা চোখ লাল করে না। স্থানীয়দের বাথরুম অসচ্ছল হলেও পরিষ্কার। আর হাসি মুখ প্রায় সবাই। অপ্রাচুর্য আর ক্ষমাহীন প্রকৃতি হাসি বা জীবনীশক্তি ম্লান করে দেয়নি এখনো। 

তাশি এইবার ভোটে দাঁড়াচ্চে সিকিম ক্রান্তিকারী পার্টির হয়ে যেখানে চামলিঙ্গ প্রায় এক দশক হারেনি। প্রত্যন্ত গ্রামে মেয়েরাই পঞ্চায়েতে দাঁড়ায়। বাড়ির তলায় মণিপুরি কিমোনো পরে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন, ইন্দিরা কে জড়িয়ে ধরলেন।
লিয়ারা ব্যাগ রেখেই ছুটতে গ্যালো চাষের জায়গা গুলোতে, এলাচের গন্ধে চারদিক মম। একটু নিচ দিয়ে প্রবল স্রোতে গর্জন করতে করতে পাহাড় কেটে এগিয়ে যাচ্ছে তিস্তা।


গরম জলে স্নান করতে করতে তিনি ভাবলেন যে ছেলে মেয়েরা কি কি রকম ভাবে টেনশান করছে, কিন্তু তার পরেই ভাবলেন সবে তো দেড় দিন হল। কাল সকালে না হয় ফোন করবেন। 
জার্নির ক্লান্তি আর পালিয়ে আসার স্ট্রেস কেটেই গেছিল স্নান করে বেরিয়ে। বুকের কাছ টা একটু চিনচিন করছিল বটে। 
পাশের কটেজে জার্মানরা চেট বেকারের  'আই ফল ইন লাভ টু ইজিলি' চালিয়েছে। জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলেন তিস্তার অপারের জঙ্গল টা ইমপেনেট্রেবল। কোনই আলো বা রাস্তা নেই।
তাশি এসে বলে গ্যালো কিচেনে তম্বা আর ঝাল শুয়োরের মাংস দেওয়া আছে। সবাই তাঁকে ডাকছে।
মুখ ফিরিয়ে ইন্দিরা তিস্তায় তাকিয়ে দেখলেন কলকাতার বাড়ি টা তিনি মনে করতে পারছেন না। ফোনে এক ফোঁটাও সিগনাল নেই।
কি আনন্দ!



 

Sunday, November 5, 2017

বিয়েবাড়ি

(১)
কলিং বেলের শব্দে মুহূর্তের মধ্যে দরজা খুলেই মা জিজ্ঞেস করল, 'কি হল বলত মেয়েটার?' 
বাবা নক্ষত্রবেগে জুতো মোজা খুলতে খুলতে বলল, 'সাস্পেক্টেড ইলোপ। সেজদি কান্নাকাটি করে অজ্ঞান হয়ে গ্যাছে।'
দাদা তখন স্কুলে, আমার ইররেগুলার পিরিয়ড চলছিল বলে স্কুল যাইনি। হাঁ করে দেখলাম বাবা একটা চুরুট ধরিয়ে বলল, 'জলধর কে ফোন করে দিয়েছি, ও দুদিন বাড়ি পাহারা দেবে।'
এই জলধর আমার বাবার পিওন, মাঝে মাঝে বাড়ির কাজ করে দিত। বাবার সুব্যাবহার আর উপরি মাইনের জন্যে। পরিবারেরই অংশ হয়ে গেছিল। নদীয়ার গ্রাম থেকে আমাদের জন্যে থোড়টা, পেঁপেটা, ধেনো চিংড়ীটা এনে দিত। বাবা রেলের সিভিলবাবু, অফিস মেট্রোভবনে, সন্ধেবেলা ডেকারস লেনে চিত্তদার দোকানে দু ঘণ্টা আড্ডা মেরে ফেরার মানুষটি দুপুর তিনটেয় বাড়িতে, আমি ঘটনার গ্র্যাভিটিটা বোঝার চেষ্টা করতে করতেই, মা শাড়ি পড়ে এলো। মা বলত চিত্তদা খাবারে আফিম মেশায়, নাহলে এত আঠা কিসের?!

                                                                                (২) 
কুড়ি মিনিটের মধ্যে আমরা ট্যাক্সিতে, দাদাকে সাউথ পয়েন্ট স্কুল থেকে উঠিয়ে সোজা দেশপ্রিয় পার্ক। সেজপিসির বাড়ি।
বাড়িতে তখন প্যান্ডিমনিয়াম।
বড়পিসি বাল বিধবা, উচ্চশিক্ষিত কিন্তু গোঁড়া ব্রাহ্মণ। হিটলারের মত মেজাজ।
সেজপিসেমশাই আর তার পরিবারের বাকি ছেলেরা বৈঠকখানায় চায়ের কাপের পাহাড় আর
চুরুট, সিগারেটের ধোঁয়ায় ঘর অন্ধকার করে দিয়েছে।
বড়রা কর্তব্যপরায়ণ হয়ে পুলিশে খবর দিয়েছে, থানার লোক এসে ছবি নিয়ে গ্যাছে।
সবাই এই আলোচনাই করছে যে ছেলেটিকে পেলে কি কি রকম বিচিত্র পদ্ধতিতে শাস্তি দেওয়া যায় আর কার কত রকম পলিটিকাল কানেকশান আছে।
বাড়ির বউরা হিস্টেরিকালি ক্রন্দনরত সেজপিসিকে যত্নআত্তি করার চেষ্টা করছে।
ছুঁড়িরা মুখ টিপে হাসছে, আর কেউ এলেই গম্ভীর হয়ে বলছে, আহারে দেবযানী কতই না কষ্ট পাচ্ছে এখন।
আর, আমরা বাচ্চারা অনেকদিন বাদে, স্কুল-আফিস-নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির ব্যাস্ততা কাটিয়ে সব দাদাদিদিরা একসাথে হয়ে পরমানন্দে ক্যালব্যালানির অলিম্পিক লাগিয়ে দিয়েছি।
আমার মায়ের শ্বশুরবাড়ির দিক, তিনি ভীষণ ব্যাস্ততায় কার কি লাগবে তার ফেসিলিটেটর হয়ে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছেন, দাদারা কি-খাব কি-খাব করছে, আমি বারান্দা দিয়ে দেখলাম ছোটপিসির গাড়ি বাড়ির লাগোয়া ফুটপাতে এসে দাঁড়াল। 

                                                                                  

(৩) 
ছোটপিসি জাঁদরেল মহিলা, ইকনমিক্সের টিচার, এসেই ঘোষণা করল, 'বাচ্চাগুলোকে বিকেলবেলা কিছু খেতে দিসনি? তোরা ক্যামন মানুষ?' বলেই আমাদের লাইন করে নিয়ে গিয়ে চিকেনরোলএর হরিরলুট চলল। শেষ বিকেলে থানার বড়বাবু এসে বললেন, 
- 'দেখুন এরা তো অ্যাডাল্ট, আমাদের বিশেষ এক্তিয়ার নেই স্বেচ্ছায় পালিয়ে গেলে।'
বাড়িতে চাপা গর্জন উঠল। 
- 'ভদ্রবাড়িতে মেয়ে পালায়?! হ্যাঁ?! জানেন আমাদের কত লোকে চেনে? আমার ছোটোছেলে সলিলদার সাথে সুর করে বোম্বাই তে, এইতো সেদিন শ্যামল (মিত্র, গায়ক) আর দিনেন (দাস, সিপিএমের হুব্বা জননেতা, ইন্টেলেকচুয়াল) এসে চা খেয়ে গ্যাল!' 
মা-বাবারা তখন হয়ত বোঝেননি, পার্টির প্রথম দিনগুলতে এঁরা বেশিরভাগ-ই ছিলেন অত্যন্ত গরিব, এবং পার্টির কালচারালের সাথে হেড ব্যুরোর সদ্ভাব ছিলনা একেবারেই। 
বড়পিসি ধমকে উঠে বললেন, 'আপনার মেয়ে পালিয়ে গেলে?!'
বড়বাবু ঢোঁক গিলে বললেন, 'দেখুন, আমি রুটিন কাজগুলো সেরে রাখি, আপনারা যখন জানতেনই যে এরকম ঘটার প্রপেন্সিটি আছে তো প্রিকশাস হতে পারতেন, এখন দুজনে পালিয়ে গেলে আমাদের হাত-পা বাঁধা।'
ইতিমধ্যে বাড়ির সামনে একটি বড় অস্টিন গাড়ি এসে দাঁড়াল। ভেতর থেকে নামলেন জিনস শার্ট পরিহিত শ্বশুর, ছিমছাম শাড়ি পরা শাশুড়ি আর দেবযানী ও তার দেবকুমার। 
বাড়ির ছেলেরা তড়বড় করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গাজোয়ারির প্রসঙ্গ উত্থাপন করার আগের মুহূর্তে শ্বশুরমশাই আত্মপরিচয় দিতে শুরু করলেন, তিনি জানতেন চিন-যুদ্ধ অপেক্ষা করে আছে ওখানে তার জন্যে।
দেবকুমারের সাথে আলাপ স্কুলের সামনেই, একটু একটু করে অনেকদিন ধরে, দেবকুমার তখন পরা শেষ করে ওয়েল করপরেশানে চাকরিতে ঢুকেছে। নেহাতই কোন কারণ ছিল না পালাবার, শুধুমাত্র পেরেন্টাল ইগো অ্যাভএড করা ছাড়া।
দেবযানী জানত ও অঙ্ক পরীক্ষা ভাল দেয়নি। এটাও জানত যে আজ ও যেটা করতে চলেছ তাতে পরিবারের বৃক্ষতন্তুতে অ্যাটমবম্ব পরবে। লেখাপড়ায় ব্রিলিয়ান্ট, লক্ষ্মী ঠাকুরের মুখ কেটে বসান এইটুকুন মেয়ে টুয়েলভের বোর্ডস দিয়েই বাথরুমে গিয়ে শাড়ি পরবে, অশোকা হলের বাইরেই গাড়িতে দেবকুমারের বাবা-মা বসে আছেন, এখান থেকে সোজা দক্ষিণেশ্বর, তারপর মালাবদল। তারপর সন্ধেবেলা সদলবলে বাড়ি গিয়ে মা-বাবার পায়ে ডাইভ। 

(৪)
ভিড় ঠেলে বড়পিসি বেরিয়ে এলেন, এসেই বললেন,' কুটুম বাড়ি এসেছে কিছু মিষ্টি আন, এখানে আর গোল করিসনে, যা ভেতরে যা।'
বড়পিসির ওপরে কথা বলে এমন লোক সেই মুহূর্তে আমাদের পরিবারে কেউ বেঁছে ছিলনা। তিনি মুখ লুকিয়ে বললেন, 'ছেমড়ি পালিয়ে বে করেছে, বেশ করেছে, আমার মত অ্যাট-বছরে বে হবার থেকে অনেক ভাল।'
দেখলাম, পরিবারের অনেক মহিলার মুখে একটা অন্যরকম আলো। যেই আলোটার নাম 'হুরররররে...!'
বাবা এতক্ষণ কথা বলেননি, বললেন, 'তাহলে বিয়েবাড়িটা...'
- 'হ্যাঁ হ্যাঁ! সেই নিয়েই তো কথা বলার! একটু যদি চা হত...'
গোটা তিরিশেক লোক চুপচাপ সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গ্যাল। শুরু হল চায়ের ঝর্না আর দেখা গ্যাল চুরুটের মেঘ।

Tuesday, August 22, 2017

হেয়ার ড্রায়ার

বৃহস্পতিবার সন্ধেয় অফিস পাড়ার ডিমারটে এত ভীড় হওয়ার কথা ছিল না। ভেতরে ঢুকে বুঝলাম স্পেশাল সেল চলছে খাদ্যদ্রব্যের।
জুলাইয়ের হাল্কা বৃষ্টিতে ঠাণ্ডা ভাব সত্ত্বেও আমার সাউথ বম্বের কন্সুমারিস্ট বলিউডি টিনেজারের মত জামার উপর শার্ট পড়ে আশার কোন কারণ ছিল না। কিন্তু আমার উদ্দেশ্যই অন্য আজ।
আজ - আমি শিকারে এসেছি।
মাসকাবারি বাজারের সাথে আমি আজ চুরি করব।
ধরা পরার কোন প্রশ্নই নেই কারণ
ডিমারটের টেকনোলজির দৌড় কদ্দুর সেটা আমার গত মাসেই রিসার্চ করা হয়ে গ্যাছে। ছোট জিনিসের বারকোড ঘসে দেব। বড় জিনিস বাজারের সিল করা ব্যাগে শিল্পীর দক্ষতায় ঢোকাব। নতুন জুতো ট্যাগ ছিঁড়ে পড়ে নেব।
এনিমি-লাইন্সের পারে কোন ধুরন্ধর-ই একা যায়না। আজকের মিশানে আমার তিন কমরেড আমার সাথে। অনুব্রত, ইঞ্জিনিয়ারিঙের সহপাঠী, ফেসবুকের চারহাজারি ফটোগ্রাফি পেজের মালিক, সাউথ পয়েন্টের বেয়াড়া রাম ঠ্যাঙ্গানে ছেলেদের মধ্যে নামকরা। শিবাঙ্গি, আগ্রার আধ-বানিয়া আধ-পাঞ্জাবি, তীক্ষ্ণ-বুদ্ধি, ম্যানিক ডিপ্রেশিভ আর দিল্লী-ইউপির দূরপাল্লার ট্রাকড্রাইভারের মত অ্যালকোহল টলারেন্স। আর মহুল, ইঞ্জিনিয়ারিঙের জুনিয়র, অপূর্ব সুন্দরী, খুবই প্রশংসিত নৃত্যশিল্পী আর দিবারাত্র ইমোস্যানালি আন্সটেবল।  
সকলেই অফিস থেকে ফিরে একসাথে জড়ো হয়ে কয়েকটা ভডকা সটস নিয়ে নিজদের মধ্যবিত্ত ইনহিবিশান কাটিয়েছি। আমি আর মহুল একটা আখাম্বা আইফেল টাওয়ারের মত বড় জয়েন্ট ফুঁকে স্থান-কাল-পাত্র জ্ঞান টা হারিয়েছি। তারপর বৃষ্টি কাটিয়ে অটো নিয়ে হিঞ্জেওারি এসেছি শুধুমাত্র মাসকাবারি করতে নয়। নিজেদের ডিসগাস্টিংলি বোরিং, অপ্রাপ্তি ও অপ্রাচুর্য সম্পন্ন মিডিওকার জীবনে একটু অ্যাডভেঞ্চার আনতে। অ্যাটলিস্ট, আমার অজুহাত তাই ছিল, বাকিদের আমি জিজ্ঞেস করিনি তাদের অধঃপতনের কারণ সম্পর্কে।
ডিমারটে ঢুকেই সবাই অচেনা মত করে এনিমি টেরেনে ছড়িয়ে পরলাম।
প্রত্যেকের কিছু নিজস্বতা ছিল চুরির।

শিবাঙ্গি, অসংখ্য জামাকাপড়ের লেয়ার পড়ে ঢুকে পড়ত বাথ, সানিটাইজেশান আর কস্মেটিক্স সেকশানে। প্রত্যেকের প্রয়োজন ও সাজুস্য অনুসারে সাবান, লোশান, শ্যাম্পু, লুফা, সেভিং কিট, হেয়ার রিমুভিং ইউটিলিটি, মেকাপ্স, তোয়ালে এমনকি রাজকাপুর বাথরোব অব্দি সে চুরি করেছে অনায়াসে।

অনুব্রত, একটু ভারি চেহারার, বেশি জিনিস তুলতে পারতনা, তাই সে স্পেলালাইজ করত ছোট আর দামি জিনিসে, একবার সে আমাদের কমইউনাল সংসারের জন্যে বিভিন্ন ফ্লেভারের কুড়ি টা স্যুপের প্যাকেট, ডজন খানেক কনডমের প্যাকেট আর সাত টা পেনড্রাইভ এনেছিল।
একমাত্র মহুল ছিল আনপ্রেডিক্টেবল।  ছোটবেলায় জেইল্ড অ্যাব্রডে দেখেছিলাম ড্রাগ-স্মাগলারেরা নিজেদের শরীরে গুপ্ত স্কিন-পকেট তৈরি করে আমরা ভাবতাম মহুলও বোধহয় অমনিই। আমাদের মধ্যে একমাত্র ওই ধরা পরেছিল, ব্যাঙ্গালরে, কারণ অত্যন্ত বেশি জিনিস জামাকাপড়ে লুকিয়ে, হাপুস-নয়নে, হাত-পা ছুঁড়ে ফোনে বয়ফ্রেন্ডের সাথে ঝগড়া করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়ে। ক্ষতিপূরণ দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে আনায় তার বন্ধুরা। এখন অবশ্য ব্যাঙ্গালর আর সেই বয়ফ্রেন্ড দুজনকেই কাটিয়ে পুনেতে চাকরি করছে। একা একা থাকে, শহরের মধ্যে থেরাপিস্ট দেখিয়ে আসে প্রতি শুক্রবার আর এসেই বলে, 'দ্বইপা মদ ঢালো'।
এরা প্রত্যেকেই নিজেদের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত চোরাগোপ্তা কাউন্টার অ্যাটাক চালায় বলেই আমি ডিফেন্সিভ লাইনে একা দাঁড়িয়ে থাকি, প্রত্যেককে সাবধান করি কারুর কোন অসাবধানতা কোন মলকর্মীর সন্দেহের কারণ ঘটছে কিনা, কোন জিনিসটা তোলা সহজ আর প্রয়োজনীয় আর শেষবধি, সবার জন্যে নজরে-না-পরা, নাম-না-জানা খাবারের উপকরণ, স্কেচবুক, রোলার স্কেটিং স্যু, ওডিকলোন, দামি ডিও, আণুবীক্ষণিক মদের বোতল ইত্যাদি তুলি।

প্রথম আধ ঘণ্টাই খুব ক্রুসিয়াল। ওই সময়েই বোঝা যায়, ভিড়ে আজ সুবিধা হবে কিনা, কর্মীরা রিলাকট্যান্ট কিনা, কোন অংশ র‍্যাক থেকে জিনিস নিশ্চিহ্ন করে লুকিয়ে ফেলতে সেফ। আজ দেখলাম ডিমারটে আর সপ্তমীর দিন এগদালিয়ার মধ্যে বিশেষ তফাত নেই। ক্রিস্টমাস! 

ইলেক্ট্রনিক্সের র‍্যাকের সামনে ঘুরঘুর করছিলাম। দেখলাম একটি মেয়ে, আমাদেরই বয়েসি, একদৃষ্টে হেয়ার ড্রায়ারের দিকে তাকিয়ে আছে। আমার তৎপরতাকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিয়ে দেখলাম নিমেষের মধ্যে বাক্স খুলে চার্জার টিকে লাইটের স্পিডে ঢোলা পাজামার মধ্যে অদৃশ্য করে দিল।  
হঠাৎ মনে পরল, একে আমি আগেই দেখেছি। হিঞ্জেওারির অফিস পাড়ার আরবানাইযেশানের সাথেই এখানকার পাহাড়, জঙ্গল কেটে আকাশছোঁয়া রেসিডেন্সিয়াল টাওয়ার্স বানান শুরু হয় আর্লি টুথাউসান্ড থেকে। সেরকমই পাহাড় কেটে বানান তিনটে ৩৪-তলা টাওয়ার্সের একটিতে আমরা যেখানে ২৪ তলায় থাকি মেয়েটিও তারই তিন তলায় থাকে। সম্ভবত মালায়ালি। স্কুটি চেপে অফিস যেতে প্রায়েই দেখা যায়, গম্ভীর চাহনি।
আরও একবার দেখেছিলাম, আমরা সদলবলে সেদিন টাওয়ারের সামনের উঠনে বারবিকিউ করছিলাম, উত্তাল মদ, অজস্র ম্যারিনেটেড পাখী। উঠান পেরিয়ে মুলা নদীর বাঁক, তারপরেই মুলসির ঘন জঙ্গল আর অজস্র ছোটবড় হিলক্স।

রাত হলেই
হিঞ্জেওারির মানুষ জেগে ওঠে,এদিক অদিকে হাঁটতে বেরতে দেখা যায়, চতুর্দিকে চা-পোহা-বড়াপাও-এর টপ্রি, আমাদের, যাদের বলে ইয়ং আইটি প্রফেশানালস। ভীতু সাবধানী এক জেনারেশানের হাতে বড় হয়ে, ঘর-বার ছেড়ে, বিভিন্ন শহরে, বেকার না থাকার জন্যে শিক্ষা, ক্রিয়েটিভিটি আর সামাজিক দায়বদ্ধতা এড়িয়ে মাঝারি মাইনের চাকরি নিয়ে, প্রতি পদে পদে কন্স্যুমারিসম , মদ্যপ সাইকেডেলিয়া আর বর্ডারলাইন পারসোনালিটির মধ্যে নক্ষত্রবেগে চক্রাকারে ঘুরছি এই শহর গুলোতে, যেগুলি আপাদমস্তক শপিং মল। বড় দোকান, ছোট দোকান, মাঝরি দোকান, ফুটের দোকান আর সর্বোপরি খাবারের দোকান। যেখানে শপিং করে ফেরার পথে আমরা ডাবল চিজ, বেকন, বীফ প্যাটি বার্গার আর ক্রাফট বিয়ার খেতে পারি। এবং প্রতিনিয়ত আমরা বাড়ছি। নোংরার স্তূপে ভয়ঙ্কর ব্যাটেরিয়ার মত।
সেই রাত্রে এই মেয়েটির দলবল আমাদের কাণ্ডকারখানা দেখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েছিল। ইউকুলেলের শব্দে, সে জিজ্ঞেস করেছিল কি ভাষা? আমরা জানিয়েছিলাম উত্তর বাংলার ডাইলেক্ট। কয়েকজনকে আমাদের মধ্যের ওভার-ফ্রেন্ডলি ছেলেরা ডেকেছিল, তারা আসেনি। 


মল থেকে বেরিয়ে অটোয় আমরা সেদিনকার চুরির হিসেব মেটাতে ব্যাস্ত হলে আমার নজর গেল তার উপর। পোশাক আশাকে মনে হয় সদ্য ঘুম থেকে উঠেছে, ঢোলা আলিবাবা আর শ্যাবি টপ, হলটার নেক ব্রা। মনে হয়, নাইট শিফট করে।
আমি ভাবলাম, সেদিনকার কথা যেদিন সৌম্য নোটিস করে বলেছিল, মেয়েটা আমার খটমট নাম পরার চেষ্টা করছে লিফটে, গলার আই-কার্ড দেখে।

খটমট বলেই হয়ত সময় লাগছিল।
বলতে ভুলে গেছি, হেয়ার ড্রায়ারটা আমি উঠিয়ে নিয়েছি, যেটির
চার্জারটি তার কাছে। রোবটদের অনুভূতিই তো বিপ্লব, যেখানে গাছ কেটে দিকচক্রবাল বানান হয় সেখানে প্রেমই তো আমার যুদ্ধ, মাই রেভলিউশান। 








 

Tuesday, June 20, 2017

কোই আতা হ্যায়

আপ্পা চোখ গোলগোল করে একগাল হেসে বলল 'বম্বাই কা বারীশ দেখনেকো মিলেগা স্যারজী, অচ্ছে অচ্ছে লোোগ সায়ার বন জাতে হ্যাঁয়। '
কিছুক্ষণ তাকিয়ে বললাম, 'আপ্পা আজ ভি?'
আপ্পা গাড়ির ওয়াইপার চালিয়ে ওয়াকারের দিকে টার্ন নিয়ে বলল, 'হাপ্তে মে একবার গুল্লে লেতে হ্যাঁয়, আজ মৌসম জী বড়িয়া থা।'
ফোনের স্ক্রিনে দেখলাম এগারোটা মিসড কল। কয়েকটা বাবা-মার, বেশিরভাগ গুলো রাইয়ের। আজ প্রায় বিশদিন হতে চলল আমাদের লং-ডিস্টান্স প্রেমের শেষ হয়েছে। ভরা বর্ষাশেষের প্রবল বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পরও কয়েক পশলার রেস থেকে যাওয়ার মত কথা হয় এখনো আমাদের। মোস্টলীী ঝগড়াই। কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি। কান্নাকাটি, পুরনো কথা, একই কথা। প্রেসিডেন্সির হ্যাপেনিং লাইফ রাইকে আর মহারাস্ট্রর পাহার, জঙ্গল, পুনে- বম্বে, সমুদ্র-বস্তি-নাইটলাইফ, ডেটা-অ্যানালিসিসের চাকরি, অনিশ্চয়তা আর বছর পঁচিশের ইনসিকিওরিটিস আমাকে গিলে নিয়েছে। 
আমি এমনিতেই ভীষণ বৃষ্টি ভালবাসি। সকাল-বিকেল হাঁ করে বৃষ্টি দেখি। 
এমনিতেই শুক্রবার, তার উপর উথাল পাতাল বৃষ্টি, আজ উল্লাট পার্টি হবে ২২ তলায়। নতুন বং এসেছে সিনে একটা। আমার স্পিকারটা এখনো শিবাঙ্গি-দের বাড়িতেই।
মুম্বাই তে এক সপ্তাহের ডেপুটেশান। এইটা সেই সময় যখন আমার টেলেভিশানের স্ট্রাগলার বন্ধুরা ক্ষান্তি দিয়ে এমবিএ করে নিচ্ছে। বিশাল বম্বে শহরে একটাও বন্ধু নেই।
হিঞ্জেওয়াড়ির পাহাড়, জঙ্গল, হাইরাইজ, অফিস-চত্বর কাঁপিয়ে যখন বৃষ্টি নামল তখন প্রায় শেষ দুপুর। অপিস যাইনি, সোমবার থেকে মুম্বাই হিরানান্দানি তে রিপোর্ট করতে হবে। তার-ই প্রস্তুতি। 
গাড়ি এক্সপ্রেস-ওয়েতে ঢোোকার মুখে দেখলাম, মুলসির জঙ্গলের দিক থেকে দৈত্যাকার ঈগল মেঘটা আরও পূর্বদিকে সরে যাচ্ছে। বৃষ্টি নিয়ে যাচ্ছি বম্বেতে। বৃষ্টি, উদাসীনতা আর একরাশ মন খারাপ। 

সন্ধে সাড়ে ছটায় জানা গ্যাল, লোনাভালার আগে এক্সপ্রেসওয়েতে ধ্বস নেমে রাস্তা বন্ধ।
- "স্যারজী, আর্মি আতে আতে তো টাইম লাগেঙ্গা। ওল্ড রুট লেলু?"
- "কুছ ভি কারো, কিস্কো অচ্ছা লগতা হাঁয় ফ্রাইডে কো ট্রাফিক মে টাইমপাস করনা!"

আপ্পা খান্দালা মেনল্যান্ডের দিকে গাড়ি ঘোরাতেই সঙ্কোচ কাটিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'হাইওয়ে মে দারু মিলেগা আভি আপ্পা?'
- ''মিলেগা না স্যারজী, দারু, চারাস, কোকেন, গুল্লে, সুইয়া সাব মিলেগা, মেরা জান পহেচান হ্যাঁয়।
আপ্পা আমার অফিস ক্যাব ড্রাইভার হলেও লোকটি অশিক্ষিত নয়, ওদের বাড়ির পঞ্চাশ-ষাট টা বড়াপাও, দাবেলির টাপ্রি আর ঠেলা আছে, গ্রাজুয়েশন অব্দি পরেছে, কিভাবে জানি ব্রাউন-সুগারের নেশায় পড়ে যায়, নেশার সঙ্গে টাকা ধার এবং নয়ছয়েে জড়িয়ে পড়ে, তারপর একদিন বাড়িতে গুন্ডা আসে, কট্টরপন্থী বাবা ছেলেকে বের করে দেন। এই ধরনের মারাঠিরা ইললিটারেট হলেও ন্যায়-অন্যায়, ধর্ম-অধর্ম, নিরামিষ, ঈশ্বর বোধ প্রবল, মেয়েদের সম্মান করতে জানে, মারাঠি কোলিি-দলিত বস্তিতে আমি যা জেন্ডার ইকুয়ালিটি দেখেছি, ব্যাঙ্গালর-দিল্লীর স্ট্র্যাটস্ফিয়ার পরিবারেও তা দেখিনি। 
আপ্পা এখন একটা উবার আর আমাদের অফিসের মুম্বাই রুটের গাড়ি চালায়, বাড়িতে লুকিয়ে খেতে যায় রাতে, ধার শোধ করে আর ক্লেম করে নেশা কমিয়ে দিয়েছে। যে ঠেলাটায় ও মাঝে মাঝে বসত গোটা ঠ্যালা টা জুড়ে নব্বইয়ের দশকের হেরোইনে চুর, কথা জড়িয়ে যাওয়া সঞ্জয় দত্তর অসংখ্য ছবি। সারাদিন ফোনের লাউড স্পিকারে খলনায়কের গান বেজেই চলে। 
- 'পতা হ্যাঁয় আজ কিয়া হ্যাঁয়?'
- 'কিয়া?'
- 'আজ সঞ্জু-বাবা ছুটনেওয়ালে হ্যাঁয় ইয়ের্বাড়া সে, হাম তো আভি টাপরি বন্ধ কারকে মিলনে জায়েঙ্গে উন্সে। এক ফটো তো টাপরিকে লিয়ে মাংতা হ্যাঁয় না স্যার?' 
বলিউডের সর্বগ্রাসী প্রেস্নেস মহারাষ্ট্রে না থাকলে বোঝাই যায় না

পানভেলের কিছু আগে, বাঁদিকে পাহার আর ডানদিকে টিমটিমে বম্বের আলো ফেলে রেখে যে বারের কার-পারকিঙ্গে আমরা ঢুকলাম তার প্রাক্টিক্যালি কোন নাম/হোরডিং কিছু নেই, একটা ব্ল্যাকের খুপরি তার পাশে এলাহি দরজার এন্ট্রি। দরজা খুলতেই সিগারেট, মদের বাষ্প আর মেয়েলি পারফিউমের গন্ধ মাখা লম্বা আলোো-অন্ধকার করিডর।  করিডরের দরজায় ছাপ দিতেই দেখলাম, সারিি সারিি মদের টেবিল, সামনে তিনফুটের নাম-কা-ওয়াস্তে রেলিং, তার পেছনে স্টেজ। বারের মালিকের সাথে হাসি আদান প্রদান করে আপ্পা আমাকে কোনার টেবিলে বসাল। কনকনে ঠাণ্ডা এসি। 
তাওড়েজী ধুপ-ধুনোো হাতে ক্যাশ কাউন্টারের আইল দিয়ে সন্তর্পণে ঢুকলেন, যেন আশেপাশের সবকিছুই অসীম ক্লেদাক্ততা নিয়ে তার পবিত্র সাদা অরা ভেদ করে দেওয়ার চেষ্টা করছে। দু মিনিট ভক্তি ভরে পূজোো করলেন। তার পর সাবেক খাতা খুলে, নাকে চশমা লাগিয়ে হেড ওয়েটারকে ডাকলেন, ম্যাজিকের মত কোনার ছোট্ট স্টেজে আলো জ্বলে উঠল।
মধ্যবয়স্ক এক মারাঠি ভদ্রলোক স্টেজে উঠে লাগোয়া কী-বোর্ড, ইলেক্ট্রনিক-পারকাশান আর অক্টপ্যাড প্লেয়ার কে ইশারা করতেই সুরের ঠেকা শোনা গ্যাল, স্থূলকায়, হিমেশ-টুপি পরিহিত, কাঁধ ছাপিয়ে ছুল্কুমার গায়ক চোখ বুজে গান ধরলেন,
                                  "ধূপ মে নিকলা না করো রূপ-কি-রানী, গোরা রঙ্গ কালা না পড় যায়ে "   

ধীরে ধীরে গুমটি গ্রিন রুম থেকে চারটি নর্তকী স্টেজের গায়ে প্রণাম করে গায়কের পিছনে গদি আঁটা কার্নিশে বসল।অল্পই লোকজন ছিল বারেমালের প্রাথমিক খোঁয়াড়ি কাটিয়ে তারা তাকাল স্টেজের দিকে, কেউ কেউ একশ-দুশো টাকার নোট বাড়িয়ে দিল, অনেকে একসাথে গানের কলি ধরল। 
বারের অনেকেই রেগুলারের, কাজ শেষের স্যানেটরিয়াম, আমার অফিস ক্যাবের ড্রাইভার'ও তাই।
ওরা আসতেই অনেকের মধ্যে আঁখমিচোলি শুরু হল। আপ্পা আমার হাতে হাল্কা চাপ দিয়ে একটি এলবিডি পরা নর্তকীর দিকে চোখ দিয়ে দেখিয়ে বলল, 'স্যারজী ইয়ে হি হ্যাঁয় ও'। 

আপ্পা ভাসাভাসা একবার বলেছিল, এই ওড়িয়া নর্তকীটির প্রেমে ও পড়েছে। কোশলরাজ্য সম্বলপুরের প্রত্যন্ত্য গ্রামে মধ্য নব্বই দশকে শহুরে চাকুরীরত রাজে পট্টনায়কের সাথে বইয়ে হয়, তখন ও মাইনর। রাজে বম্বে আনে ওকে, এনে নিজের বারে নাচাতে লাগায়। রাজের পাঞ্জাবী পার্টনার ধোঁকা দিয়ে বারের মালিকানা ছিনিয়ে নিলে রাজে নেশার মাত্রা বারিয়ে ওকে মারধর করা শুরু করে। ঘরে লোক ঢোকায় সামান্য টাকার বিনিময়। তারপর কালের নিয়মে, ওর দুটি ছেলে হয়, তাদের কে সম্বলপুরেই পাঠান হল।  
রাজের নেশা আর অকর্মণ্যতার সুযোগ নিয়ে ও পালায় মুম্বাই থেকে, তখন ডান্স বারগুলি গভর্নমেন্টের ধাক্কায় সেভেন আইল্যান্ড থেকে ক্রমশও শহরতলির দিকে চরিয়ে যাচ্ছে। পুনেতে মলে কাজ আর টাকার অভাবে নাচ চালিয়ে যায়। 

বারের লক্ষ্মী হলও নর্তকীরা, মালিকরা বুকের খুন দিয়ে তাদের বাঁচায় এমনি একটা ধারনা এদের। এই বারেও রাজে হানা দিলে, পুলিশ কাস্টমার আর বাউন্সারদের শাসানি তে পালিয়ে বাঁচে, রাস্তাঘাটে অতর্কিতে ধেয়ে আসে প্রায়েই, আপ্পা দুবার বাঁচিয়েছে। দুবার রাস্তার অত্যুৎসাহিিরা। 

আপ্পার ইশারায় একটি ডিজেনারেট টাইপের লোক আমার সীটের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, 'হ্যাশ, কোকেন?'
 হ্যাশ শুনে লোভ হল, বম্বেতে যদিও ভাল হ্যাশ সহজে পাওয়া যায় না। গেলাম পেছনে পেছনে। আপ্পা উদগ্রীব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে, ভেতরে তখন
'মেরে লচকে কমর, তুনে পহেলি নজর যব নজর সে মিলাই মজা আ গয়া'

বাইরে এসে দাম রফা করে সিগারেট বের করতে যাচ্ছি ঠিক তখনইএলবিডি কান্নাভেজা চোখে ছিটকে বেরিয়ে এলো, পেছনে আপ্পা, হাতে আধখাওয়া কিংফিশার স্ট্রং। 
- 'পাঁচশ কা নোট ভেজা কিউ মাদারচোোদ? পতা নেহি পইসা আভি ভি বহুত দেনা হ্যাঁয় তুঝে? '
- 'কুছ ভি বল, কুছ ভি কর, মুঝসে শাদি কারকে নাসিক চললে?'
- 'কিত্নি বার বোোলা হ্যাঁয় তুঝে? মেরে দোো বচ্চে হ্যাঁয়।'
- 'হাঁ তো বুলা লেঙ্গে না উনহে , আম্মি সে থোড়া পইসা লেকে টাপ্রি খোল লেঙ্গে।'
- 'টাপ্রি সে কিয়া চলেগা হামারা? কিয়া হর টাইম নশেরি মাফিক বাত কারতা হ্যাঁয়?'
-'আরে হোটেল ভি তো খোোলেঙ্গে, বানিয়া আইসে তো নহি হ্যাঁয় না?'
ঠিক তখনই একটি লোক পেছন থেকে এসে আপ্পা কে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিল।
আপ্পা ধুলোো ঝেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, 'দেখ রাজে তেরা টাইম আভি খতমতুনে ইস্কা দিল দুখায়া হ্যাঁয়।'
রাজে ওর দিকে ছুটে আসতেই বলিউডি কায়দায় একটা টাস্কিি মেরে ঘুরিয়ে বিয়ারের বোতল তা মারল মেডালা অব্লাঙ্গাটার উপরে, রাজে মাটিতে, বিয়ারের ফ্যানা, কানের পেছনে রক্ত
-' চল রেশমি, আইয়ে স্যারজী। মুঝে মাফ করনা।
-'লেকিন মেরা নাম রেশমি নহি হ্যাঁয়!' পেছনে দৌড়াচ্ছি। আরও পেছনে বারের গহ্বর থেকে কারা যেন চেঁচাচ্ছে। 
-'কুছ ভি হোো।'

এরপর মনে আছে আমরা তিনজন গাড়িতে, অঝরধারায় বৃষ্টি। নক্ষত্রবেগে গাড়ি চলছে সায়ন হয়ে চেম্বুর। আমাকে নামিয়ে গাড়ি জমা দিয়ে ওরা সরকারি বাস ধরে যাবে পুনেতেই, আম্মির হাতেপায়ে ধরে টাকা নিয়ে ফেরার হবে এক বছর।  চারদিক শান্ত হয়ে এলে সংসার। গাড়ির রেডিও তে বাজছিল,

'ধীরে ধীরে মচল অ্যায় দিল--বেকরার
কোই আতা হ্যায় 
ইয়ু তড়পকে না তড়পা মুঝে বার বার,
কোই আতা হ্যায়... '